সুলতান আইউবী বললেন–আপনি ঠিকই বলেছেন, নাসের! তরবারী আমার খাপের মধ্যে-ই তড়পাচ্ছে! স্বদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে বেরুতে চাইছে না আমার শাণিত অসি। দেশের শাসকবর্গ জনগণের মর্যাদার প্রতীক। শাসকমণ্ডলীকে আমি বরাবরই শ্রদ্ধার চোখে দেখি কিন্তু ভেবে দেখুন, তারা সেই মর্যাদা রক্ষা করছে কতটুকু? শুধু খলীফা আল-আজেদে্র কথাই বলছি না। আলী বিন সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করুন। তার গোয়েন্দা বিভাগ মসুল, হাল্ব, দামেশ্ক ও মক্কা-মদীনা থেকে যে রিপোর্ট নিয়ে এসেছে, তা হলো বিলাসপ্রিয়তার কারণে যে যেখানকার গভর্নর বা শাসক; সে-ই সেখানকার সার্বভৌম ক্ষমতাধর হয়ে বসেছে। সালতানাতে ইসলামিয়া খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। খেলাফত এতই দুর্বল যে শাসক-গভর্নর এখন ব্যক্তিগত রাজনীতি চর্চার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আমি জানি, জাতির এই বিক্ষিপ্ত শক্তিগুলোকে যদি আমরা একত্রিত করতে যাই, তাহলে তা আরো বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে। আমাদের সামনে সমস্যার পাহাড় এসে দাঁড়াবে। কিন্তু নির্ভয়ে আমি কাজ করতে চাই। আশা করি আপনারাও সাহসিকতার সঙ্গে আমাকে সহযোগিতা দিয়ে যাবেন। সালতানাতে ইসলামিয়ার এই ধস আমাদের ঠেকাতেই হবে। আপনারা যে যা পরামর্শ দিয়েছেন, আমি তার মূল্যায়ন করবো। তবে এখন থেকে আমি খলীফার ডাকে তখন-ই সাড়া দেবো, যখন জরুরী কোন কাজ থাকবে। কি কাজে ডেকে পাঠালেন, খলীফাকে আগেই আমাকে তা অবহিত করতে হবে। অন্যথায় তার ডাকে একটি মুহূর্তও আমি নষ্ট করতে চাই না। আর আপাতত আমি জুমার খুতবা থেকে খলীফা্র নাম তুলে দিচ্ছি।
উপস্থিত সকলে সুলতান আইউবীর এ সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং তার বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতা ও সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি দেন।
***
খলীফা আল-আজেদ তার খাস কামরায় উপবিষ্ট। দূত ফিরে এসে জানায়, সুলতান আইউবী বলেছেন, কোন জরুরী কাজ থাকলে তিনি আসতে পারবেন। অন্যথায় তিনি বেজায় ব্যস্ত।
শুনে খলীফা অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। দূতকে বললেন, রজবুকে আসতে বলো।
রজব খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীর কমাণ্ডার। নায়েব সালারের সমান তার মর্যাদা। এক সময় ছিলো মিসরের সেনাবাহিনীর অফিসার। খলীফার বডিগার্ড-এর কমাণ্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্তির পর সে কসরে খেলাফত ও খলীফার নিরাপত্তা বাহিনীতে দেখে দেখে সুদানী হাবশীদের নিয়োগ দান করে। রজব আইউবী বিরোধী এবং খলীফার চাটুকারদের অন্যতম।
খলীফার খাস কামরায় উম্মে আরারাও উপস্থিত। দূতের রিপোর্ট শুনে সে বলে ওঠলো, সালাহুদ্দীন আইউবী আপনার একজন নওকর বৈ নয়। অথচ আপনি তাকে মাথায় তুলে রেখেছেন। লোকটাকে আপনি বরখাস্ত করছেন না কেন?
কারণ, তার ফল ভাল হবে না। সেনাবাহিনীর কমাণ্ড তার হাতে। ইচ্ছে করলে এ বাহিনীকে সে আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। কম্পিত কণ্ঠে বললেন খলীফা।
ইত্যবসরে এসে উপস্থিত হয় রজব। মাথা ঝুঁকিয়ে খলীফাকে সালাম করে। রাগে কাঁপছেন খলীফা। ক্রুদ্ধ ও কম্পিত কণ্ঠে বললেন, আমি পূর্ব থেকেই জানতাম, কমবখত একটা অহংকারী ও অবাধ্য লোক। সালাহুদ্দীন আইউবীর কথা বলছি …….। দূত মারফত লোকটাকে আমি ডেকে পাঠিয়েছিলাম। সে এই বলে আমার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলো যে, কোন জরুরী কাজ থাকলে আসব; অন্যথায় আপনার আহ্বান আমার নিকট অর্থহীন। কারণ, আমার সামনে জরুরী কাজ পড়ে আছে।
রাগের মাথায় বলতে বলতে হেঁচকি উঠে যায় খলীফার । তারপর প্রবল বেগে কাশি। দু হাতে বুক চেপে ধরেন তিনি। চেহারার রং যেন হলুদ হয়ে গেছে তাঁর। এমনি অবস্থায় তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন বদমাশটা এতটুকুও বুঝলো না যে, আমি একে তো বৃদ্ধ, তার উপর হৃদরোগের রুগী; অপ্রীতিকর সংবাদ আমাকে ক্ষতি করতে পারে। আমি এখানে শরীর-স্বাস্থ্যের চিন্তায় অস্থির আর ও কিনা দেখাচ্ছে তার কাজের গরজ!
তাকে আপনি কেন ডেকেছিলেন? আমাকে আদেশ করুন। বললো রজব।
ডেকেছিলাম তাকে একথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য যে, তার মাথার উপর একজন শাসকও আছেন। তুমি-ই তো বোধ হয় আমাকে বলেছিলে, সালাহুদ্দীন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হতে যাচ্ছে। আমি বার বার তাকে এখানে ডেকে আনতে চাই, তাকে আদেশ করতে চাই, যেন সে আমার অনুগত থাকে। ডেকে পাঠাতে হলে জরুরী কোন কাজ থাকতে হবে, এমন তো কথা নেই! বুকের উপর হাত রেখে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন খলীফা।
উম্মে আরারাহ খলীফার ঠোঁটের সঙ্গে মদের পেয়ালা ধরে বললো–আপনাকে শতবার বলেছি, মাথায় রাগ তুলবেন না। কতবার বলেছি, গোৰা আপনার জন্য ক্ষতিকর!
মদের পেয়ালা শূন্য হয়ে গেলে মেয়েটি একটি সোনার কৌটা থেকে এক চিমটি তামাকচূর্ণ নিয়ে খলীফার মুখে দেয় এবং পানি পান করিয়ে দেয়। খলীফা মেয়েটির বিক্ষিপ্ত রেশমী চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে বিলি কাটতে কাটতে বললেন–তুমি না হলে, আমার উপায় কি হতো, বলো তো? সকলের দৃষ্টি এখন আমার সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি। আমার ব্যক্তিসত্ত্বার উপর কারো এক বিন্দু নজর নেই। আমার একজন স্ত্রীর পর্যন্ত আমার প্রতি এতটুকু আন্তরিকতা নেই। এ মুহূর্তে তুমি। আমার একমাত্র ভরসা। তুমি না হলে আমার উপায় ছিলো না। খলীফা উম্মে আরারাহকে টেনে কাছে এনে গা ঘেঁষে বসিয়ে তার সরু কটি বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরেন।
