গ্রেফতারকৃত খৃষ্টান গুপ্তচররা আরো জানায়, সুলতান আইউবীর বাহিনীর মধ্যে তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকদেরও ঢুকিয়ে দিয়েছে। তারা সৈন্যদের মধ্যে জুয়াবাজীর অভ্যাস ছড়িয়ে দিয়েছে। এই জুয়া খেলার জন্য এখন একে অপরের অর্থ-সম্পদ চুরি করা শুরু করেছে আইউবীর সৈন্যরা। শহরে তারা ছড়িয়ে দিয়েছে পাঁচ শরও অধিক বেশ্যা নারী। তারা ফাঁদে ফেলে ফেলে মুসলিম যুব সমাজকে বিলাসিতা ও বিণথগামীতার অন্ধকার পথে নিয়ে যাচ্ছে। চালু করা হয়েছে গোপন জুয়ার আসর।
গুপ্তচররা আরো জানায়, তারা-ই অপসারিত সুদানীদেরকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে উস্কানী দিয়ে চলেছে। তাদের দেয়া সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সুলতান আইউবী সরকারের উচ্চপদস্থ ছয়জন অফিসার তলে তলে আইউবীর বিরুদ্ধে কাজ করছে।
আসেফা খৃষ্টান মেয়ে। প্রাপ্ত তথ্যমতে তার নাম ফেলিমঙ্গো। বাড়ি গ্রীস। তের বছর বয়স থেকে তাকে এ কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাকে মিসরের ভাষাও শেখানো হয়েছে। মুসলমানদের ঈমান-আমান, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও চরিত্র ধ্বংস করার জন্য খৃষ্টানরা তার মতো এমন আরো কয়েক হাজার রূপসী মেয়েকে ট্রেনিং দিয়েছে। এখন তারা সুলতান আইউবীর মিসরে কর্তব্য পালন করছে।
মেয়েটিও কোন কথা গোপন রাখেনি। পনের দিনের মাথায় তার জখম শুকিয়ে গেছে। তাকে যখন বলা হলো, তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হচ্ছে, তখন সে বললো–আমি আনন্দের সাথে এই শাস্তি বরণ করে নিচ্ছি। আমি ক্রুশের মিশন সম্পন্ন করেছি।
এক সময়ে জল্লাদের হাতে তুলে দেয়া হয় মেয়েটিকে।
ফেলিমঙ্গোর সঙ্গীদের প্রয়োজন রয়ে গেছে এখনো।তদের চিহ্নিত করে আরো কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলো। তাদের মধ্যে মুসলমানও ছিলো কয়েকজন। মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো তাদের প্রত্যেককে। একশত বেত্রাঘাতের দণ্ড দেয়া হলো আল-বার্ককে। কিন্তু এ শাস্তি সহ্য করতে না পেরে মরে গেলো সে-ও। তার সন্তানদেরকে রাষ্ট্রের দায়িত্বে নিয়ে এলেন সুলতান আইউবী। সরকারী খরচে চাকরানী ও গৃহশিক্ষক নিয়োগ করে দেয়া হলো পিতৃ-মাতৃহারা এই ছেলে-মেয়েগুলো জন্য। আমরা তাদেরকে ঈমান বিক্রেতা আল-বারকের সন্তাম বলবো না– বলবো,এরা এক বীরাঙ্গনা, শহীদ জননীর সন্তান।
১.৫ অপহরণ
অপহরণ
১১৭১ সালের জুন মাস। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিজ কক্ষে উপবিষ্ট. অনুমতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে খলীফা আল-আজেদের দূত। সালাম দিয়ে বলে, খলীফা আপনাকে স্মরণ করেছেন। বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠে সুলতান আইউবীর চেহারায়। ভ্রূ কুঞ্চিত করে দূতকে বললেন–খলীফাকে আমার সালাম দিয়ে বলবে, জরুরী কোন কাজ থাকলে যেন তিনি আমাকে ডেকে পাঠান; অন্যথায় নয়। এ মুহূর্তে আমার এতটুকু অবসর নেই। তাঁকে আরো বলবে, আমার সামনে যে কাজ পড়ে আছে, তা হুজুরের দরবারে হাজেরী দেয়া অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
দূত ফিরে যায়। মাথা নুইয়ে কক্ষে পায়চারী করতে শুরু করেন সুলতান আইউবী।
ফাতেমী খেলাফতের যুগ। আল-আজেদ মিসরে এ খেলাফতের খলীফা। সে যুগের খলীফারা হতেন রাজা। জুমার খুতবায় আল্লাহ ও রাসূলের নামের পরে খলীফার নামও উচ্চারণ করতে হতো। বিলাসিতা ছাড়া তাদের আর কোন কাজ ছিলো না। নুরুদ্দীন জঙ্গী আর সুলতান আইউবী যদি না থাকতেন, কিংবা তারাও যদি অপরাপর আমীর-উজীরদের ন্যায় আয়েশী ও ঈমান-বিক্রেতা হতেন, তাহলে সে যুগের খলীফারা ইসলামী সাম্রাজ্যকে বিক্রি করে খেয়ে-ই ফেলেছিলেন।
আল-আজেদও তেমনি এক খলীফা। মিসরের গভর্নর হয়ে আগমন করার পর তিনি সুলতান আইউবীকে প্রথম প্রথম বেশ কবার দরবারে ডেকে নিয়েছিলেন। সুলতান আইউবী বুঝে ফেলেছিলেন, খলীফা তাঁকে অযথা বারবার তলব করার উদ্দেশ্য, তাকে এ কথা বুঝানো যে, মিসরের সম্রাট, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আইউবী নয় তিনি।
খলীফা সুলতান আইউবীকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন। তাকে ডেকে নিয়ে নিজের কাছে বসাতেন। কিন্তু ভাবগতিক ছিলো রাজকীয়। কথা বলার ভঙ্গি ছিলো তার শাসক-সুলভ। সুলতান আইউবীকে তিনি যতবার ডেকে পাঠিয়েছিলেন ডেকে পাঠিয়েছিলেন সম্পূর্ণ অকারণে এবং অনর্থক খোশগল্প করে কোন কাজ ছাড়াই বিদায় দিয়েছেন। এ কারণে নোম উপসাগরে ক্রসেডারদের পরাজিত করে এবং সুদানী সৈন্যদের বিদ্রোহ দমন করে সুলতান আইউবী খলীফাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।
খলীফার মহলের জাঁকজমক আগুন ধরিয়ে রেখেছিলো সুলতানের বুকে। সোনার তৈরি পাত্রে পানাহার করেন তিনি। মদের পিপা-পেয়ালা তাঁর হীরা-খচিত। সুন্দরী মেয়েদের দ্বারা পরিপূর্ণ তাঁর হেরেম। আরবী, মিসরী, মারাকেশী, সুদানী ও তুর্কী ছাড়াও ইহুদী-খৃষ্টান মেয়েও আছে তাঁর রংমহলে। এ সেই জাতির খলীফা, যে জাতির দায়িত্ব ছিলো বিশ্বময় আল্লাহর বাণী প্রচার করা, যে জাতি বিশ্ব কুফরী শক্তির ভয়াবহ সামরিক প্রতিরোধের মুখোমুখি।
খলীফার আরো কয়েকটি বিষয় শূলের ন্যায় বিদ্ধ করছিলো সুলতানকে। প্রথমত খলীফার ব্যক্তিগত রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ছিলো সুদানী, হাবশী ও কাবায়েলী। তাদের আনুগত্য ছিলো সংশয়পূর্ণ । দ্বিতীয়ত বিদ্রোহী ও ক্ষমতাচ্যুত সুদানী ফৌজের কমাণ্ডার ও নায়েব সালার ছিলো দরবারে খেলাফতের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি–খলীফার ডান হাত।
