আসেফা মাটিতে পড়ে যায়। বসে পড়ে আল-বার্কের প্রথমা স্ত্রীও। দুজন-ই আহত, রক্তাক্ত। কাতরাচ্ছে তারা। ক্ষণিক পর লোকটি এগিয়ে এসে আসেফাকে তুলে নিয়ে চলে যায়।
আলী বিন সুফিয়ানের দু গুপ্তচর ওমর ও আজর ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করছিলো চুপি চুপি। অপর মহিলাটি কে, তা তাদের জানা ছিলো না। য়ে লোকটি আসেফাকে তুলে নিয়ে গেলো, ওমর পিছু নেয় তার—দেখবে লোকটি য়ায় কোথায়। আসেফা বরাবর যে ভবনটিতে যাওয়া-আসা-করতো সেখানেই নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। তৎক্ষণাৎ আলী বিন সুফিয়ানকে সংবাদ দেয়ার জন্য ছুটে যায় ওমর। আজর বসে থাকে সেখানে-ই। আল-বারকের আহত প্রথমা স্ত্রী পড়ে আছেন ঘটনাস্থলে। অন্য কেউ নেই সেখানে। আজর পা টিপে টিপে মহিলার নিকট গিয়ে এসে বসে পড়ে একস্থানে। কিন্তু হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন খঞ্জরের আঘাত হানে তার উপর। একে একে তিনটি আঘাত হেনে পালিয়ে যায় লোকটি। আজর চৈতন্য হারিয়ে পড়ে থাকে সেখানে।
সন্ধ্যা নাগাদ অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে আল-বারকের প্রথমা স্ত্রী ও আজরের। প্রাণপণ চেষ্টা করলেন ডাক্তার-কবিরাজগণ। কিন্তু বাঁচিয়ে রাখা গেলো না একজনকেও। আল-বার্কের স্ত্রী আলী বিন সুফিয়ানকে বলেছিলেন–আমি আমার স্বামীকে কোরবান করতে পারি, কিন্তু জাতি ও দেশের ইজ্জত কোরবান হতে দিতে পারি না।
অবশেষে দেশ ও জাতির জন্য নিজের জীবনটা কোরবাম করে তিনি জান্নাতে চলে গেলেন।
সুলতান আইউবীর কারাগারে বন্দী করে রাখা হলো খাদেমুদ্দীন আল-বারককে। আল-বারক শতভাবে বুঝাবার চেষ্টা করে, এ অপরাধ সে জেনে-শুনে করেনি। সে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে বোকা বনে গিয়েছিলো। কিন্তু ইতিমধ্যে সে মদ ও সুন্দরী নারীর নেশায় পড়ে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর অনেক তথ্য-পরিকল্পনী দুশমনের হাতে তুলে দিয়েছে। সুলতান আইউবী হত্যার শাস্তি ক্ষমা করতে পারেন; কিন্তু মদপান, বিলাসিতা এবং দুশমনকে গোপন তথ্য দেয়ার অপরাধ তিনি মার্জনা করতে পারেন না।
সেদিন আসেফার নিকট থেকে কোন জবানবন্দী নেয়া হলো না। জখম অপেক্ষা পরিণাম-চিন্তায়-ই সে বেশী শঙ্কিত। মেয়েটি সৈনিক নয়–গুপ্তচর। সে শাহজাদীর রূপ ধারণ করে শাহজাদাদের তথ্য নেয়ার প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এমন একটি পরিণতি তাকে বরণ করতে হবে, তা ভাবেনি কখনো। মেয়েটির সবচেয়ে বড় ভয়, সে মুসলমানের কয়েদী; আর তার জানামতে মুসলমানেই হিংস্র, জংলী, বর্বর। এখন যে তার সব শেষ হয়ে যাবে, সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত।
একটি আশঙ্কা তার এ-ও ছিলো যে, মুসলমানরা তার জখমের চিকিৎসা করাবে না। কক্ষে বসে বসে ভয়-পাওয়া শিশুটির ন্যায় অঝোরে কাঁদছে মেয়েটি। আলী বিন সুফিয়ান তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন, তোমার সঙ্গে আমরা সেই আচরণ-ই করবো, যা আমরা একজন আহত মুসলমান নারীর সঙ্গে করে থাকি। কিন্তু তবু তার ভয় কাটছে না। সে বার বার সুলতান আইউবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করছে। বিষয়টি অবহিত করা হয় সুলতান আইউবীকে।
সুলতান আইউবী মেয়েটির কাছে যান। তার মাথায় হাত রেখে বললেন–এ মুহূর্তে আমি তোমাকে নিজের কন্যা মনে করি।
আমি শুনেছি, সুলতান আইউবী তরবারীম নয়–হৃদয়ের রাজা। আপনি এভো-ই শক্তিধর বাদশাহ যে, আপনাকে পরাজিত করার জন্য খৃষ্টানদের সব রাজা একজোট হয়েছে। সেই খৃষ্টানদের হয়ে আজ আমি আপনার হাতে বন্দী। দুশমনকে কেউ কখনো ক্ষমা করে না। আপনিও আমাকে ক্ষমা করবেন না জানি। তবে আমি ধুকে ধুকে মরতে চাই না। আপনার লোকদের বলুন, এক্ষুনি যেনো তারা আমাকে একটু বিষ এনে দেন; আপনি আমাকে শান্তিতে মরতে দিন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো আসো।
তুমি বললে সারাক্ষণ আমি তোমার কাছে বসে থাকবো। আমি তোমার সঙ্গে কোন প্রতারণা করবো না। তুমি আরো সুস্থ হও। ডাক্তার বলেছে, তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। আমার যদি তোমাকে নির্যাতন করার ইচ্ছা থাকতো, তাহলে সে অবস্থায়-ই তোমাকে বন্দীশালার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ফেলে রাখতাম; তোমার কাটা ঘায়ে লবণের ছিটা দিতাম। চীৎকার করে করে তুমি সব অপরাধের কথা স্বীকার করত, একজন একজন করে সঙ্গীদের নাম-ঠিকানা বলে দিতে। কিন্তু কোন নারীর সঙ্গে আমরা এমন আচরণ করি না। তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। বললেন সুলতান আইউবী।
সুস্থ হয়ে গেলে আমার সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন? জিজ্ঞেস করে আসো ।
তুমি যেসবের আশঙ্কা করছে, তার কিছু-ই ঘটবে না। তুমি একটি যুবতী-রূপসী–এখানকার কেউ এ দৃষ্টিতে তোমার প্রতি তাকাবে না। এমন অমূলক আশঙ্কা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও। মুসলমান নারীর অসম্মান করতে জানে না। তোমার সঙ্গে আমরা সেই আচরণ-ই করবো, যা ইসলামী বিধানে লেখা আছে। বললেন সুলতান আইউবী।
আসেফা যে ভবনে যাওয়া-আসা করতো, আহত হওয়ার পর যে ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, সে ঘরে তল্লাশী নেয়া হলো। ভবনটির কোন মালিক নেই। গুপ্তচরদের আখড়া এটি। ভিতরেই ঘোড়ার আস্তাবল। অনুসন্ধান করে ভেতরে পাঁচজন লোক পাওয়া গেলো। তাদের গ্রেফতার করা হলো। এই পাঁচজন এবং ধাওয়া করে যে চারজনকে ধরে আনা হয়েছিলো, জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো তাদেরকেও। কিন্তু তারা অপরাধের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলো। অবশেষে তাদেরকে এমন একটি পাতাল কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো, যেখানে গেলে পাথরেরও জবান খুলে যায়। বৃদ্ধ স্বীকার করলো, মেয়েটিকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে সে আল-বার্ককে ঘায়েল করেছিলো। নাটকটি আনুপূর্বিক বিবৃত করলো বুড়ো। অন্যরাও ফাস করে দেয় অনেক তথ্য। সেই ভবনটির রহস্যও উন্মোচিত হয়ে যায়, যাকে শহরের মানুষ শ্রদ্ধার চোখে দেখতো। অনেকগুলো সুন্দরী মেয়েও রাখা ছিলো সে ঘরে, যাদেরকে তারা দুটি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতো। এক. গুপ্তচরবৃত্তির জন্য, দুই. শাসক শ্রেণীর উচ্চ পরিবারের মুসলিম যুবকদের চরিত্র ধ্বংস করার জন্য। গুপ্তচর ও সন্ত্রাসীদের আখড়া সে ভবনটি।
