সালাহুদ্দীন আইউবীর পরামর্শে আলী বিন সুফিয়ান চাকর-চাকরানী ও অন্যান্য দায়িত্বশীলদের বেশে খলীফার মহলে গুপ্তচর ঢুকিয়ে দেন। হেরেমের দুটি মেয়েকেও হাত করে তাদের উপর গুপ্তচরবৃত্তির দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাদের রিপোর্ট মোতাবেক খলীফা ছিলেন সুদানী কমাণ্ডারদের দ্বারা প্রভাবিত। . খলীফা ষাট-পয়ষট্টি বছর বয়সের বৃদ্ধ। তবুও সুন্দরী মেয়েদের নাচ-গান ছাড়া রাত কাটে না তার। তার এই চারিত্রিক দুর্বলতা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর প্রতিপক্ষের মোক্ষম সুযোগ। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে তারা। ***
১১৭১ সালের ফেব্রুয়ারী কি মার্চ মাস। খলীফা আল-আজেদের হেরেমে আগমন ঘটে নতুন একটি মেয়ের। অস্বাভাবিক সুন্দরী এক তরুণী। আরবী পোশাক পরিহিত জনাচারেক লোক এসে উপহার হিসেবে মেয়েটিকে খলীফার হাতে তুলে দিয়ে যায় । দিয়ে যায় আরো মূল্যবান বেশ কিছু উপঢৌকনও।
মেয়েটির নাম উম্মে আরারাহ। রূপের ফাঁদে ফেলে অল্প কদিনে-ই খলীফাকে বশ করে ফেলে নবাগতা এই মেয়েটি। মহলের মেয়ে গুপ্তচর মারফত ঘটনা সম্পর্কে অবগত হন আলী বিন সুফিয়ান।
কসরে খেলাফতের এই কাণ্ড-কীর্তি সবই সুলতান আইউবীর জানা। কিন্তু খলীফার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার শক্তি তাঁর এখনো হয়নি। পূর্বেকার গভর্নর ও আমীরগণ চলতেন খলীফার সামনে মাথা নত করে। তাদের সেই চাটুকারিতার ফলে মিসর আজ বিদ্রোহের অগ্নিগর্ভ। তাদের আমলে খেলাফত ছিলো বটে, তবে ইসলামের পতাকা ছিলো অবনমিত। সেনাবাহিনী ছিলো ইসলামী সাম্রাজ্যের। কিন্তু সুদানী সেনাপতি রাজ্য শাসনের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন নিজের হাতে । তার সম্পর্ক ছিলো খৃষ্টানদের সঙ্গে। তার-ই সক্রিয় সহযোগিতায় কায়রো ও ইস্কান্দারিয়ায় খৃষ্টানরা বসতি স্থাপন করতে শুরু করেছিলো। এই বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে ছিলো অসংখ্য গুপ্তচর।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সুদানী সৈন্যদের দমন করেছিলেন ঠিক; কিন্তু বেশ কজন সেনাপতি রয়ে গেছে এখনো। যে কোন সময় তারা বিপদ হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কসরে খেলাফতে তাদের বেশ প্রভাব।
খেলাফতের বিলাসপূর্ণ এই গদির উপর এখনই হাত দিতে চাইছেন না সুলতান। কারণ, কিছু লোক এখনো খেলাফতের ব্যাপারে আবেগপ্রবণ। কতিপয় তো খলীফার সক্রিয় সহযোগী। তন্মধ্যে চাটুকারদের সংখ্যাই অধিক। এই চাটুকারদের মধ্যে উচ্চপদস্থ এমন কর্মকর্তাও আছেন, যাদের স্বপ্ন ছিলো মিসরের গভর্ণর হওয়া। কিন্তু সেই মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত এখন সুলতান আইউবী।
খৃষ্টান গুপ্তচর ও বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা পরিপূর্ণ দেশ। গাদ্দারদের বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিলে খৃষ্টানদের পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কা প্রবল। তাই সুলতান আইউবী খেলাফতের মদদপুষ্ট শাসকবর্গকে এখন-ই শত্রুতে পরিণত করতে চাইছেন না।
কিন্তু ১৯৭১ সালের জুনের একদিন খলীফা তাকে ডেকে পাঠালে তিনি যেতে পারবেন না বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন। সুলতান কক্ষে পায়চারী করছেন। দারোয়ানকে ডেকে বললেন–আলী বিন সুফিয়ান, বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ, ঈসা এলাহকারী ফকীহ ও আন-নাসেরকে এক্ষুনি আমার কাছে আসতে বলো।
***
এই ব্যক্তিগণ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর খাস উপদেষ্টা ও বিশ্বস্ত। সুলতান আইউবী তাদের উদ্দেশে বললেন–এইমাত্র খলীফার দূত আমাকে নিতে এসে গেলো। আমি যেতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছি। খেলাফতের ব্যাপারে আমি কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাই। এর প্রথম ধাপে আমিজুমার ধুতরা থেকে খলীফার নাম তুলে দিতে চাই। এ ব্যাপারে আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।
এ পদক্ষেপ নেয়ার সময় এখনো আসেনি। খলীফাকে মানুষ এখনো পয়গম্বর মনে করে, এতে জনমত আমাদের বিপক্ষে চলে যাবে। বললেন বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ।
এখনোর মানুষ তাকে পয়গম্বরু মনে করে। কদিন পর খোদা ভাবতে শুরু করবে। খুতবায় আল্লাহ-রাসূলের নামের পাশে তার নাম উচ্চারণ করে আমক্কা-ই অে তাকে পয়গম্বর ও খোদার আসনে বসিয়েছিঃ কি ঈসা ফকীহ। আপনার পরামর্শ বলুন। বললেন আইউবী।
আপনার মতের সঙ্গে আমিও একমত। কোন মুসলমান জুমার খুতবায় আলাহ-রাসূলের পাশাপাশি অন্য কোন মানুষের নাম সহ্য করতে পারে না। তা-ও আবার এমন মানুষ, যিনি মদ-নারীসহ সব রকম পাপে নিমজ্জিত। শত শত বছর ধরে খলীফাকে পয়গম্বরের মর্যাদা দিয়ে আনা হচ্ছে বলে চিরদিন তা বহাল রাখতে হবে এমন কোন কথা নেই। কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে আমি এমন-ই বুঝি। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে এ পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা আমি বলতে পারবো না। বললেন ঈসা এলাহকারী ফকীহ।
প্রতিক্রিয়া হবে অত্যন্ত তীব্র। আর হবে আমাদের বিপক্ষে। তথাপি আমার পরামর্শ, হয়তো এই কু-প্রথার অবসান ঘটাতে হবে কিংবা খলীফাকে খাঁটি মুসলমান বানিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত করতে হবে। তবে আমার দৃষ্টিতে দ্বিতীয়টি সম্ভব হবে না। বললেন বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ।
আলী বিন সুফিয়ান বললেন–জনমত সম্পর্কে আমার চেয়ে আর কে ভালো জানলে জনগণ খলীফা আল-আজেদু নামের সঙ্গে নয়–সালাহুদ্দীন আইউরী নামের সাথে পরিচিত আমার গোয়েন্দা বিভাগের নির্ভরযোগ্য রিপোর্টে আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, আপনার দু বছরের শাসনামলে জনগণ এখন বহু সমস্যার সমাধান পেয়েছে, যার কল্পনাও তারা কখনো করেনি। দেশে উন্নত কোন হাসপাতাল ছিলো না। চিকিৎসার অভাবে সাধারণ রোগেও মানুষ মারা যেতো। এখন উন্নতমানের সরকারী হাসপাতাল আছে। স্থানে স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। আগে চুরি-ডাকতি, হাইজ্যাক-ছিনতাইয়ের কারণে ব্যবসায়ীর নিরাপদে ব্যবসা করতে পারতো না। এখন তারও অবসান ঘটেছে। অপরাধ প্রবণতা আগের তুলনায় এখন অনেক কম। মানুষ এখনদের সমস্যার সমাধানের জন্য সরাসরি আপনার শরণাপন্ন হতে পারছে। জানাতে পারছে তাদের আর্জি-ফরিয়াদ। আপনার গভর্নর হয়ে মিসর আগমনের আগে মানুষ সরকারী কর্মকর্তা ও সেনারাহিনীর নামে সন্ত্রস্ত থাকতো সব সময়। আপনি তাদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছেন। মানুষ এখন নিজেদেরকে দেশ ও জাতির অংশ ভাবতে শিখেছে। খেলাফত থেকে তারা অবিচার আর নির্দয়তা ছাড়া আর কিছু-ই পায়নি। আপনি তাদেরকে সুবিচার উপহার দিয়েছেন, দিয়েছেন নাগরিক অধিকার। আমি প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পারি,–জাতি খেলাফতের নয়–ইমারাতের সিদ্ধান্তই মেনে নেবে।
