আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে পথে প্রতিহত করবো না- খৃস্টানদের কমান্ডার ইন চীফ বললেন তার বাহিনী সংখ্যায় আমাদের চেয়ে কম অবশ্যই। কিন্তু তার অস্ত্র ও রসদের কোন ভাবনা নেই। সাহায্য ব্যবস্থাপনা তার খুবই মজবুত ও বিশ্বস্ত। লোকটাকে বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধ করতে দাও। আমাদের কাছে দীর্ঘ সময়ের জন্য খাদ্য সামগ্রী ও অন্যান্য সরঞ্জামাদি মজুদ রয়েছে। অবরোধ দীর্ঘ হতে হতে যদি খাদ্য সামগ্রীর অভাব দেখা দেয়, তাহলে আমরা নগরীর মুসলমানদেরকে না খাইয়ে মারবো। তাতে আমাদের অনেক খাদ্য বেচে যাবে। আমার সবচে বেশি ভরসা নাইটদের উপর। তারা বাইরে বেরিয়ে আক্রমণ করবে এবং ফিরে আসবে। আমি আপনাদেরকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, আইউবীর অবরোধ ব্যর্থ হবে।
আপনি বাহিনীর অবস্থাকে বিবেচনায় আনেননি- এক সেনাপতি বললো- নগরীতে অবস্থানরত বাহিনীর অর্ধেক এমন যে, তারা হিত্তীন থেকে আসকালান পর্যন্ত সংঘটিত যুদ্ধগুলো থেকে পালিয়ে এসেছে এবং তাদের যুদ্ধ করার স্পৃহায় ভাটা পড়ে গেছে। বরং এ কথা বললেও ভুল হবে না, এদের উপর সালাহুদ্দীন আইউবীর ভীতি সঞ্চারিত হয়ে গেছে। যেসব সৈন্য বাইরের রণাঙ্গনগুলোতে যায়নি, তাদেরই শুধু মনোবল চাঙ্গা রয়েছে।…
আমরা এ সমস্যার সমাধান বের করে নিয়েছি- কমান্ডার ইন চীফ বললেন- মহামান্য পাদ্রী ফৌজের মাঝে ঘোরাফেরা করছেন। তিনি ইঞ্জিলের উদ্ধৃতি দিয়ে সৈন্যদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ইসলামী বাহিনীকে পরাজিত করা জরুরি। কেন জরুরি তারও ব্যাখ্যা প্রদান করছেন। এ-ও বোঝাচ্ছেন, এটা তোমাদের ধর্মীয় কর্তব্য। সেনাপতি ও অন্যান্য কমান্ডারগণ যদি একে ধর্মযুদ্ধ জ্ঞান করে লড়াই করে, তাহলে সাধারণ সৈন্যরা ধর্মীয় চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করবে। আমরা যদি বাইতুল মুকাদ্দাসের যুদ্ধে পরাজয়বরণ করি, তাহলে নোম উপসাগরও আমাদের আশ্রয় দিতে পারবে না। সালাহুদ্দীন আইউবী সফল হয়েছেন কেন? কারণ, তিনি পাকা ধার্মিক। আমরা তাকে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে ধ্বংস করার চেষ্টা করছি। কিন্তু তিনি সে যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন। যেসব মুসলিম শাসককে আমরা তার বিরোধি বানিয়ছিলাম, তারা তার অনুগত। হয়ে গেছে। আমরা আমাদের মেয়েদের দ্বারা তার সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্যকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের এই ত্যাগও বৃথা গেছে। এটা বোধ হয় আমাদের ভুলই ছিলো যে, আমরা মেয়েদের বহার করেছি এবং এই আশায় বসে ছিলাম যে, সালাহুদ্দীন আইউবী রে বসেই মরে যাক।…
আমাদের কোনো ত্যাগ ব্যর্থ যায়নি- সভায় উপস্থিত পোপ বললেন আপনার এই চিন্তা ভুল যে, দুটি ধর্মের যুদ্ধ শুধু সৈন্যরাই লড়ে থাকে। আপন ধর্মের বিজয়-প্রতিষ্ঠা এবং শত্রু ধর্মের ধ্বংসের জন্য তরবারী আবশ্যক বটে। কিন্তু শত্রুর চিন্তা-চেতনা বিনষ্টের জন্য সেই পদ্ধতিটি আবশ্যকীয় ছিলো, আপনি যার ব্যাপারে বলেছেন, আমাদের সেই ত্যাগ বৃথা গেছে। উঁচুমানের রূপের বদৌলতে আমাদের যে মেয়েদের পদস্থ শাসক-অফিসারদের স্ত্রী হয়ে, রাজকীয় জীবন-যাপন করার কথা ছিলো, তারা নিজেদেরকে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎকে ক্রুশের জন্য কুরবান করে মুসলমানদের হেরেমে অপদস্ত-লাঞ্ছিত হয়েছে। তারা মুসলমানদের মাঝে গৃহযুদ্ধ ঘটিয়েছে, মুসলিম শাসকদের ঈমান ক্রয় করে এনেছে। একই দেশের গুরুত্বপূর্ণ শাসকদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে একজনকেঅপরজনের শত্রুতে পরিণত করেছে। এসব কীর্তির জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।…
ক্রুশের সেনাপতিগণ! তোমরা ভুলে যেয়ো না, দুশমনকে খুন করার উত্তম পন্থা হচ্ছে তাদের মাঝে মানসিক বিলাসিতা ও যৌনতা সৃষ্টি করে দেয়া। তাদেরকে রাগ-রং ও কল্পনার সুখ-সমুদ্রে ডুবিয়ে দাও। তাদের শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতার মোহ ও বিত্তের গোলাম বানিয়ে তোলো। মুসলমান দুঃসাহসী সৈনিক। সামরিক চেতনা ও ধর্মযুদ্ধের (জিহাদের) উন্মাদনা মুসলমানদের মাঝে যতোটুকু আছে, ততোটুকু আমাদের মাঝে নেই। মুসলমান যে পরিমাণ সুদক্ষ সেনাপতি জন্ম দিয়েছে, আমরা তা. পারিনি। এটা তাদের ধারা। আমরা যদি তাদের চিন্তা-চেতনা পরিবর্তন করতে না পারি, তাহলে তাদের এই চেতনা ও ধর্মীয় উন্মাদনার এই ধারা অব্যাহত থাকবে। আর তা-ই যদি থাকে, তাহলে, ক্রুশের পতন ঘটবে। ইসলাম ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ভারতবর্ষ পার হয়ে চীন পর্যন্ত চলে গেছে। চীনের নৌ-বাহিনী প্রধান একজন মুসলমান। ওখানকার অনেক সেনাপতি এখনো মুসলমান। হিন্দুস্তানের পূর্বাঞ্চলে বড় বড় দ্বীপে গিয়ে দেখে আসো, সেখানেও আরব তথা মুসলমানদের শাসন দেখতে পাবে।…।
আপনি এই প্লাবন শুধু তরবারী দ্বারা রুখতে পারবেন না। এর জন্য আপনাকে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে। ইসলামের যে কেন্দ্রটাকে মুসলমানরা খানায়ে কাবা বলে থাকে, তাকে নিষ্প্রাণ করে দিতে হবে।
বাইতুল মুকাদ্দাসের দখল অটুট রাখতে হবে। মুসলমান শাসক ও রাজা বাদশাহগণ যে যেখানে থাকুন না কেন, সামরিক ও আর্থিক সাহায্য দিয়ে তাদেরকে অথর্ব করে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের হেরেমে আমাদের অভিজ্ঞ মেয়েদেরকে ঠিক সেভাবে ঢুকিয়ে দিতে হবে, যেভাবে আরবের রাজ্যগুলোতে ঢুকিয়ে রেখেছে। এই পন্থাটা আমরা ইহুদীদের নিকট থেকে শিখেছি। তারা মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংস ও ধর্মের মূলোৎপাটনে বেশ চমৎকার পরিকল্পনা তৈরি করে নিয়েছে এবং সে অনুপাতে কাজও করছে। তারা আমাদেরকে সাহায্য প্রদান করছে। আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, অনতিবিলম্বে বাইতুল মুকাদ্দাসের উপর আমাদের একক দখল প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তার আশপাশের দূর দূরান্তের অঞ্চলও আমাদের দখলে এসে যাবে। মুসলিম রাজ্যগুলো খণ্ডিত হয়ে হয়ে একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে। অন্তত তারা। নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকবে না। ইহুদীদের বিশেষজ্ঞরা ঠিকই বলেছেন যে, মুসলমান নিজেদেরকে রাজার আসনে আসীন ভাববে বটে; কিন্তু রাজত্ব ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বাগডোর আমাদের হাতে থাকবে। এ কাজটা আপনি আমাদের উপর ছেড়ে দিন। এই গোপন ও আন্ডারগ্রাউন্ড কাজ আঞ্জাম দেয়ার দায়িত্ব বিশেষজ্ঞজন ও ধর্মী নেতাদের। আপনি সৈনিক। যুদ্ধের ময়দানের কথা বলুন। আপনার অতিশয় ভয়ঙ্কর এক শত্রু বাইতুল মুকাদ্দাস আক্রমণ করতে আসছে। তাকে কীভাবে পরাজিত করবেন চিন্তা করুন।
