জাহাজে কখন ফিরবে? হাসান ইবনে আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করেন।
নামায পড়ে কিছুক্ষণ ঘুমাবো। অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছি- আল ফারেস বললেন- তারপর চলে যাবো। সন্ধ্যা নাগাদ জাহাজে গিয়ে পৌঁছবো।
***
আল-ফারেস থেকে বিদায় নিয়ে হাসান ইবনে আবদুল্লাহ সেই কক্ষে চলে যান, যেখানে তার বিভাগের লোকেরা থাকে। তাদের একজনকে বাইরে ডেকে এনে বললেন, আল-ফারেস বায়দারীনের জাহাজ অমুক জায়গায় নোঙ্গর ফেলে অবস্থান করছে। তুমি জাহাজে গিয়ে আল ফারেসের নায়েব রউফ কুর্দিকে বলবে, আমাকে হাসান ইবনে আবদুল্লাহ প্রেরণ করেছেন।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ রউফ কুর্দির নামে বার্তা প্রদান করেন। এই লোকটিকে কোনো কাজে জুড়িয়ে দাও। জাহাজে আশ্রিতা মেয়ে দুটো সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে হবে, জাহাজে ওদের কোনো গোপন তৎপরতা আছে কিনা। যদি থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি এ কাজে তোমার সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করছি।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ লোকটিকে জরুরি দিক-নির্দেশনা প্রদান করে একটি পালতোলা নৌকায় তুলে বিদায় করে দেন। বাতাসের গতি অনুকূল ও তীব্র ছিলো। নৌকা অল্প সময়ের মধ্যে জাহাজের সঙ্গে গিয়ে ভিড়ে। জাহাজ থেকে সিঁড়ি ফেলে তাকে উপরে তুলে নেয়া হলো। লোকটি রউফ কুর্দির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তাকে হাসান ইবনে আবদুল্লাহর বার্তা প্রদান করে এবং নিজেও মৌখিকভাবে উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করে। কিন্ত রউফ কুর্দির চেহারা বলছে, লোকটাকে তার ভালো লাগেনি। তবে বিপক্ষে কিছু বলাও তো সম্ভব নয়। তার জানা আছে, সুলতান আইউবীর অন্তরে একজন গুপ্তচরের ততোটুকু মর্যাদা আছে, যতোটুকু একজন সালারেরও নেই। একজন গোয়েন্দার রিপোর্ট একজন সালারকে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে। অগত্যা রউফ কুর্দি উপরে উপরে হাসান ইবনে আবদুল্লাহর এই গোয়েন্দা লোকটিকে বরণ করে নেয় এবং খাতির-যত্ন করতে শুরু করে।
আপনি মেয়ে দুটোকে প্রথম দিন থেকেই দেখে আসছেন- গোয়েন্দা রউফ কুর্দিকে বললো- তাদের ব্যাপারে আপনার সামান্যতম সন্দেহ থাকলে বলুন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমি তাদেরকে আসকালান নিয়ে যাবো।
না, এ যাবত তাদের মধ্যে সন্দেহজনক কোনো আচরণ দেখিনি- রউফ কুর্দি উত্তর দেয়। বেশিরভাগ সময় তারা আল-ফারেসের কক্ষেই থাকে।
সঙ্গে সঙ্গে রউফ কুর্দির ফ্লোরির কথা মনে পড়ে যায়। গোয়েন্দা লোকটা যদি একদিন আগেও আসতো, তাহলে রউফ কুর্দি বলতো, যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এদেরকে এখান থেকে নিয়ে যাও। কারণ, আমাদের কমান্ডার সারাক্ষণ এদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু এই গত রাতই ফ্লোরির সঙ্গে তার ভাব গড়ে ওঠেছে। রোজি তাদের এই গোপন সম্পর্কের সব জানে। রউফ কুর্দি এখন কোনো মূল্যে ফ্লোরিকে হারাতে চাচ্ছে না। তার অন্তরে আল-ফারেসের শত্রুতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিলো বটে; কিন্তু ফ্লোরির ভাবনায় এখন আসল কথা বলা যাচ্ছে না।
আমি আপনার সঙ্গে থাকবো- গোয়েন্দা বললো- আল-ফারেস যেনো জানতে না পারে আমি গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছি। আপনি আদেশনামা পাঠ করেছেন। আমি নিজ চোখে দেখবো, মেয়ে দুটো কেমন এবং কী করে। মেয়েগুলো শত্রুর গোয়েন্দা হতে পারে। নাও যদি হয়, যদি শুধু এটুকু প্রমাণ পাই যে, আল-ফারেস কাজের সময়েও এদের নিয়ে নিমগ্ন থাকে, আমি তাদেরকে এখানে থাকতে দেবো না। আল-ফারেস যদি টের পেয়ে যান আমি এখানে গোয়েন্দাগিরি করছি, তাহলে ধরে নেবো, তাকে বিষয়টা আপনি বলে দিয়েছেন। কারণ, আপনি ছাড়া আমার উদ্দেশ্য আর কেউ জানে না।
এটি যুদ্ধজাহাজ। জাহাজে আমলা-কর্মচারি আছে। আছে নৌযুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্থল বাহিনীও। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রান্না-বান্না ও অন্যান্য কাজের জন্য আছে অনেক কর্মচারি। কাজেই একজন লোকের পক্ষে নিজের আসল রূপ গোপন রেখে অবস্থান করা কঠিন নয়। আল-ফারেস কমান্ডার। প্রত্যেককে আলাদা ডেকে ডেকে বলে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় যে, ঐ লোকটি বহিরাগত। ওর সঙ্গে কথা বলবে না।
গোয়েন্দা সেদিনই মেয়ে দুটোকে দেখে রউফ কুর্দিকে জানিয়ে দেয় এরা যাযাবর মেয়ে নয়, বিপদগ্রস্তও নয়। আমার সন্দেহ জেগে গেছে।
ওরা অনেক দিন যাবত আমাদের সঙ্গে থাকছে- রউফ কুর্দি বললো আমরা তো সন্দেহ করার মতো কিছু দেখিনি।
আমার গোয়েন্দা চোখ যা দেখে, আপনার চোখ তা দেখে না গোয়েন্দা বললো- শীতল অঞ্চলের যাযাবর নারীর গায়ের রং এমনই হয়ে থাকে; কিন্তু তাদের চোখের রং এরূপ হয় না। তাছাড়া তাদের মধ্যে এমন সাজগোজ-পরিপাটিও থাকে না। মুহতারাম! আমরা এরূপ মেয়েদের সঙ্গেই যুদ্ধ করে থাকি। এই মেয়েগুলো এখানে থাকবে না।
ঠিক আছে, কিছুদিন দেখেন- রউফ কুর্দি বললো- পাছে এমন না হয়, মেয়েগুলো আসলেই বিপদগ্রস্ত আর আপনি তাদেরকে আরেক বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছেন।
হ্যাঁ- গোয়েন্দা বললো- আমি তাড়াহুড়া করবো না। কয়েক দিন দেখেই তবে সিদ্ধান্ত নেবো।
***
সুলতান আইউবী তাঁর সালাদের ঠিকই বলেছেন, বাইতুল মুকাদ্দাসে অবস্থানরত খৃস্টান সেনাপতিরা জানে, ইসলামী ফৌজ বাইতুল মুকাদ্দাস আক্রমণ করতে আসছে। এদিকে সুলতান আইউবী তাঁর সালারদেরকে সর্বশেষ দিক-নির্দেশনা প্রদান করছেন, ওদিকে বাইতুল মুকাদ্দাসে খৃস্টান হাইকমান্ড আপন সেনাপতিদেরকে অবরোধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত করছে।
