***
এক রবিবারের সকাল বেলা। ১১৮৭ সালের সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ। সুলতান আইউবী বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে বাইতুল মুকাদ্দাস পৌঁছে যান। হিজরী ক্যালেন্ডার মোতাবেক দিনটি ৫৮৩ হিজরীর ১৫ রজব। ক্রুসেডাররা সুলতান আইউবীর জন্য অপেক্ষমান ছিলো। কিন্তু সুলতান এতো দ্রুত এসে পড়বেন তারা ভাবেনি। তিনি পথে উঁচুতে অবস্থিত ক্রুসেডারদের দুর্গ ও পোস্টগুলোকে এড়িয়ে এগিয়ে যান। দুর্গগুলো থেকে বাইতুল মুকাদ্দাসে সময়ের আগে সংবাদ পৌঁছোনোর জন্য দূত প্রেরণ করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা একজনও গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। তার প্রমাণ, রাতভর পথ চলে ভোরবেলা সুলতান আইউবীর সম্মুখ ইউনিট যখন শহর গিয়ে পৌঁছে, তখন নগরীর প্রাচীরের উপর দু-চারজন সান্ত্রী দণ্ডায়মান ছিলো মাত্র। নগরীর ফটক বন্ধু ছিলো। ভেতর থেকে গীর্জার ঘন্টার শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।
নাকাড়া ও বিউগল বেজে ওঠে। প্রাচীরের উপর চতুর্দিকে একের পর এক মাথা উত্থিত হতে শুরু করে। লোহার টুপি পরিহিত মাথাগুলো। সকলের হাতে ধনুক। ধীরে ধীরে মাথার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মনে হলো, যেনো প্রাচীরের উপর মানবমুণ্ডের আরেক প্রাচীর দাঁড় করানো হয়েছে। নগরীর পশ্চিম দিকে খোলামেলা একটি অঞ্চল। সুলতান আইউবী তার বাহিনীকে সেখানে ছাউনি স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে নিজে দেখতে চলে গেছেন, প্রাচীর কোন্দিক থেকে দুর্বল, কোন্ স্থানে ছিদ্র করা যায় এবং কোথাও থেকে সুড়ঙ্গ খনন করা যায় কিনা। শত্রুর দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেঙে ছিদ্র করার জন্য সুলতান আইউবীর আছে একদল বিখ্যাত জানবাজ সৈনিক।
ইসলামী ফৌজ নগরীর চারদিকে অবস্থান করছে। বড় সমাবেশটা পশ্চিম প্রান্তে। সুলতান আইউবী নগরীর চারদিকে ঘুরে-ফিরে প্রাচীর পর্যবেক্ষণ করছেন। পশ্চিম দিকে অবস্থানরত বাহিনীর সালার আগুন ও পাথর নিক্ষেপকারী মিনজানিক স্থাপন করতে শুরু করেছে। ক্রুসেডাররা তাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা মোতাবেক নগরীর একটি ফটক খুলে দেয়। প্রথমে বর্মপরিহিত নাইটরা ঘোড়ায় চড়ে হাতে বর্শা তাক করে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে পড়ে এবং মিনজানিক স্থাপনরত মুসলিম সৈন্যদের উপর আক্রমণ করে বসে। তারা বেরিয়ে আসামাত্র ফটক বন্ধ হয়ে যায়।
বেশ প্রশস্ত জায়গা। ঘোড়ার ছুটে চলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নাইটরা বর্মপরিহিত। তীর তাদের গায়ে কোনো ক্রিয়া করতে পারছে না। তাছাড়া তাদের এই আক্রমণ এতোই আকস্মিক, তীব্র ও অপ্রত্যাশিত ছিলো যে, মুসলিম সৈন্যরা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। বেশ কজন মুসলিম সৈন্য নাইটদের বর্শার আঘাতে আহত ও শহীদ হয়ে যায়। অনেকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে কার্যসিদ্ধি করে উল্কার ন্যায় ছুটে আসা নাইটরা ঝড়ের ন্যায় কেটে পড়ে। ফটক খুলে যায়। তারা নগরীতে ঢুকে পড়ে। আবার ফটক বন্ধ হয়ে যায়।
ময়দানে আহত মুসলিম সৈন্যরা ছটফট করছে। অক্ষত সৈনিকরা তাদের তুলে আনতে ছুটে যায়। এমন সময় দু-তিনটি নারীকণ্ঠ ভেসে ওঠে- সরে যাও, এ কাজ আমাদের। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো মেয়ে ছুটে আসে। তারা গাছের ডালের তৈরি স্ট্রেচার নিয়ে আসে। কয়েকজনের কাঁধে পানির মশক। উপর থেকে খৃস্টানদের তীর ছুটে আসছে। সেই তীরের আঘাতে দু-তিনটি মেয়ে লুটিয়ে পড়ে। দেখে মুসলিম তীরন্দাজ সৈন্যরা এগিয়ে আসে। তারা পাল্টা তীর ছুঁড়তে শুরু করে। এবার নগরীর প্রাচীরের উপর থেকে আসা তীরবৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। উভয় দিকের তীরের ছায়ায় মেয়েরা জখমীদের তুলে পেছনে গাছের ছায়ায় নিয়ে যায়।
সে যুগের কাহিনীকার আসাদুল আসাদী তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন, সৈনিকরা যে কোনো যুদ্ধেই আহত হতো, তাদের তুলে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু এই সেবাটা করতো তাদেরই ন্যায় পুরুষ সৈনিকরা। এ কাজে তারা বিন্দুমাত্র ক্রটি করতো না। কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাসের এই অবরোধ যুদ্ধে এ কাজের জন্য কয়েকটি মেয়ে এগিয়ে আসে। তারা জখমীদের তুলে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যায়। নিজ হাতে ক্ষতস্থানে পট্টি বাধে এবং আহতদের মাথা কোলে তুলে নিয়ে পানি পান করায়। কয়েকজন জখমী উঠে দাঁড়িয়ে হুংকার ছেড়ে বলে ওঠে এই জখম আমাদেরকে যুদ্ধ করা থেকে বিরত রাখতে পারবে না। কেউ বলে- আমরা বাইতুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করেই তবে জখমে পট্টি বাঁধবো। আহতরা যখন দেখলো, তিন-চারটি মেয়েও তীরবিদ্ধ হয়েছে, তখন তাদেরকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মেয়েরা সৈনিকদের জোশ-জযবায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
***
উক্ত স্থানেই মিনজানিক স্থাপন করার জন্য আরেকটি বিশেষজ্ঞ সেনাদল এগিয়ে আসে। তীরন্দাজি তীব্র করে দেয়া হয়। মিনজানিক স্থাপিত হয়ে যায়। সেগুলোর সাহায্যে ভারি পাথর ও আগুনের গোলা নিক্ষেপ শুরু হয়ে যায়। পাথর-গোলা প্রাচীরের উপর এবং প্রাচীর অতিক্রম করে ভেতরেও নিক্ষিপ্ত হতে থাকে।
ফটক আরেকবার খুলে যায়। নাইটদের ঘোড়াগুলো মিনজানিকের দিকে বাতাসের গতিতে ধেয়ে আসে। এবার এক পার্শ্ব থেকে মুসলিম অশ্বারোহী দল শকুনের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। পেছন থেকে আরেকটি দল তাদের পলায়নের পথ বন্ধ করার জন্য এগিয়ে আসে। মুসলমানরা বর্শা ও তরবারীর সাহায্যে নাইটদের ঘোড়াগুলোকে আহত করতে শুরু করে। কিন্তু লোহার বর্ম-শিরস্ত্রাণ নাইটদেরকে অক্ষত ও নিরাপদ রাখে।
