সকলে চলে গেলে সুলতান আইউবী নৌবাহিনীর কমান্ডার আল ফারেস বায়দারীনকে ডেকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন, সমুদ্রের খবর কী? আল-ফারেস জানান, আমার জাহাজ টহল দিয়ে ফিরছে এবং আমি আলেকজান্দ্রিয়া থেকে যথারীতি বার্তা পেয়ে আসছি, যা থেকে প্রমাণিত হচ্ছে ক্রুসেডারদের নৌবহরের কোনো চিহ্ন নেই। টায়েরের বন্দর এলাকায় আমার রণতরী অবস্থান করছে এবং ছোট ছোট পালতোলা ডিঙিতে করে মৎস্যজীবির বেশে আমার গোয়েন্দারা সেখানে যাওয়া-আসা করছে। টায়ের এবং তার আগে ক্রুসেডারদের বহরে কোনো সংযোজন হয়নি। যে তরীগুলো বিদ্যমান আছে, সেগুলো প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। তারা জাহাজে এমন অগ্নিগোলার ব্যবস্থা করে রেখেছে, যেগুলো দূর থেকে উড়ে এসে পালে আগুন ধরিয়ে দিতে সক্ষম।
এই গোলা এতো দূর থেকে আসতে পারে, যতোটুকু দূর পর্যন্ত তোমাদের প্রজ্বলমান সলিতাওয়ালা তীর যেতে পারে- সুলতান আইউবী বললেন- ভয় পাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।
আমাদের কারো অন্তরে কোন ভীতি নেই- আল-ফারেস বললেন নৌ-কমান্ডোরা এতোটুকু প্রস্তুত যে, নৌ-যুদ্ধের সময় তারা ছোট ছোট ডিঙিতে করে দুশমনের জাহাজের নিকটে গিয়ে তাতে ছিদ্র করে ফেলবে এবং তার উপর আগুনের গোলা নিক্ষেপ করবে।
যদি যুদ্ধটা রাতে হয়- সুলতান আইউবী বললেন- দিনের বেলা কোন কমান্ডো যেনো সমুদ্রে না নামে। আবেগতাড়িত হয়ে কাজ করলে জীবনই নষ্ট হবে। সাবধান থাকতে হবে আল-ফারেস! তোমরা যেমন মৎস্য শিকারীর বেশে টায়ের পর্যন্ত গোয়েন্দা প্রেরণ করো, তেমনি দুশমনের গোয়েন্দাও কোনো না কোনো ছদ্মবেশে তোমাদের জাহাজের নিকট এসে থাকবে। জাহাজগুলোকে একটি অপরটি থেকে দূরে রাখবে, যাতে হঠাৎ আক্রমণ হলে সবগুলো একসঙ্গে ঘেরাওয়ে পড়ে না যায়। এমনভাবে ছড়িয়ে রাখবে, যেনো প্রয়োজনে দুশমনকে ঘিরে ফেলতে পারো। দিনে পতাকা আর রাতে বাতির মাধ্যমে পরস্পর যোগাযোগ রক্ষা করবে।
আল-ফারেস যখন সুলতান আইউবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন, তখন রাতের শেষ প্রহর। সেখানেই তিনি ফজর নামায আদায় করেন।
আল-ফারেস!- আল-ফারেস সন্নিকটেই কারো ডাক শুনতে পান। মোড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখেন ইন্টেলিজেন্সর কমান্ডার হাসান ইবনে আবদুল্লাহ। হাসান এগিয়ে কাছে এসে আল-ফারেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জিজ্ঞেস করেন ধন্যবাদ ভাই। একই সঙ্গে দুটি মেয়েকে বিয়ে করেছে বুঝি? দুজনকেই সঙ্গে রেখেছো? নিজের সঙ্গে তাদেরও খুন করতে চাও নাকি?
উহ হাসান ভাই!- আল-ফারেস অন্ধকারে কণ্ঠে হাসানকে চিনতে পেরে বললেন- ওরা তো আশ্রিতা মেয়ে দোস্ত! কূলে একস্থানে লুকিয়ে ছিলো। বলছে যাবাবর। সমগ্র গোত্র নাকি যুদ্ধের কবলে পড়ে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে মরেছে।
আর ভাগ্যক্রমে শুধু তারা বেঁচে রয়েছে এবং সমুদ্রের তীর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- খৃস্টানরা অন্যসব যাবাবরদের ঘোড়র পায়ের নীচে পিষে মারলো আর এমন রূপসী দুটি মেয়েকে জীবিত ছেড়ে দিলো! তুমি বোধ হয় সমুদ্রে থেকে থেকে স্থলের মানুষগুলোর স্বভাব-চরিত্র ভুলে গেছো দোস্ত!
আল-ফারেস হেসে ওঠে বললেন- হাসান ভাই! গোয়েন্দাগিরি করতে করতে এখন তুমি কাক-চিলকেও ক্রুসেডারদের গোয়েন্দা ভাবতে শুরু করেছে। বলতে চাচ্ছো, এই মেয়ে দুটো দুশমনের গোয়েন্দা হতে পারে, তাই না?
হতে পারে- হাসান বললেন- তুমি খানিকটা বেশি প্রাণোচ্ছল মানুষ আল-ফারেস! ভালো হবে, তুমি মেয়ে দুটোকে টায়েরের নিকট কূলে রেখে আসো। অপরিচিত মেয়েদের জাহাজে রাখা ঠিক হবে না।
কেন, মিসর নিয়ে ওদের বিবাহ করে নেয়া কি পুণ্যের কাজ হবে না?- আল-ফারেস বললেন- কিংবা আমি তাদের একজনকে বিয়ে করে নেবো আর অপরজনকে অন্য কারো সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবো। এরা গরীব মেয়ে। এদেরকে কূলে কোথাও ফেলে আসলে জানো তো খৃস্টানরা এদের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করবে।
হতে পারে তারাও খৃস্টান- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন শোনো আল-ফারেস! তুমি অবুঝ শিশু নও। সাধারণ সৈনিকও নও। তুমি নৌ-বাহিনীর একজন অভিজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার। ভাবতে ও বুঝতে চেষ্টা করো। আমি রিপোর্ট পেয়েছি, অবসর সময়টা তুমি ওদের সঙ্গে হেসে-খেলে অতিবাহিত করে। এক হাজার কসম খেলেও আমি মেনে নেবো না, তুমি ওদেরকে পবিত্র মেয়ে বানিয়ে রেখেছে। তারা যদিও তোমাকে না দেয়, তুমি তো নিজেকে ধোঁকা দিতে পারো। সুন্দরী ও যুবতী মেয়েদের যাদু যে কোন পুরুষকে কর্তব্য থেকে বিচ্যুৎ করতে পারে। অনেক কিছু হতে পারে আল-ফারেস! বলছি, মেয়েগুলোকে তুমি কোথাও রেখে আসো।
যদি আমি তোমার পরামর্শ মান্য না করি, তাহলে?
তখন আমাকে দেখতে হবে মেয়েগুলো আসলে কারা ও কেমন হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- যদি সন্দেহভাজন বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে জাহাজ থেকে নামিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসতে বাধ্য হবো। কিন্তু বিষয়টা নিষ্পত্তির ভার আমি তোমারই উপর অর্পণ করতে চাই। তুমি আমার পুরনো বন্ধু। তুমি নিজেই সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হও, যাতে আমাকে কর্তব্য পালনে বন্ধুত্বকে বিসর্জন দিতে না হয়।
আমার দিক থেকে কোনো অন্যায় আচরণের আশংকা করো না হাসান!- আল-ফারেস বললেন- তুমি বন্ধুত্বের কথা বলছো। আমি তো কর্তব্য পালনে নিজের জীবনও কুরবান করে দিতে প্রস্তুত আছি। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, মেয়ে দুটো আমার কোনো ক্ষতি করবে না। তাদের প্রতি যদি আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ জাগ্রত হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমি তাদেরকে কূলে নিয়ে রেখে আসবো কিংবা সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলবো।
