দুশমনের উদ্দেশ্য কী ছিলো? আমাদের চরিত্র ও নৈতিকতা ধ্বংস করা, ধর্ম ও ঈমানকে দুর্বল করা এবং আমাদের নতুন প্রজন্মকে মানসিক বিলাসিতায় অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা। আমাদের মাঝে দুশমন গাদ্দার তৈরি করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিলো, প্রথম কেবলার দখল অটুট রেখে আমাদের ঈমান-বিক্রেতা ভাইদের সাহায্যে পবিত্র মক্কাও দখল করে নেবে। তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, পাঁচটি বছর আমি দক্ষিণাঞ্চলে দুশমনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ছিলাম। রেজিনাল্ড (প্রিন্স অর্নাত) পবিত্র মদীনার সামান্য দূর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো। আমার ভাই আল-মালিকুল আদিল ও নৌবাহিনী প্রধান হুসামুদ্দীনের কৃতিত্ব যে, তারা সময়মতো তৎপর হয়ে ওঠে এবং ঐ খৃস্টানটাকে পেছনে হটিয়ে দেয়। আমি লোকটাকে নিজ হাতে হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়েছি।…।
দুশমনের টার্গেট আমাদের উৎসগুলোকে বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে খৃস্টানদের উৎসে পরিণত করা। আমাদের লক্ষ্য দুশমনের এই টার্গেটকে বানচাল করা। যুদ্ধের এদিকটাকে তোমরা সবসময় স্মরণ রাখবে। এটি আমাদের নৈতিকতার যুদ্ধ। ইসলাম তরবারীর জোরে বিস্তার লাভ করেছিলো কিনা সে বিতর্ক ভিন্ন। কিন্তু আমি ইসলামের সুরক্ষার জন্য তরবারীকে জরুরি মনে করি। জাতি সেই তরবারী সৈনিকদের হাতে তুলে দিয়েছে। ইতিহাস আমাদের পানে তাকিয়ে আছে। মহান আল্লাহর দৃষ্টিও জাতির সৈনিকদের উপর নিবদ্ধ। আল্লাহর রাসূলের পবিত্র আত্মা আমাদের দেখছেন। ভেবে দেখো, আমাদের দায়িত্ব কতো মহান ও কতো পবিত্র। আল্লাহর সৈনিকরা শাসন করে না- আল্লাহর শাসন ও সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিধান করে মাত্র।…
বলতে বলতে সুলতান আইউবী আবেগময় হয়ে ওঠেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- আহ আমার বন্ধুগণ! ষোল হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের কথা স্মরণ করো। সেদিন হযরত উমর ইবনুল আস ও তার সঙ্গী সেনাপতিগণ বাইতুল মুকাদ্দাসকে কাফেরদের থেকে মুক্ত করেছিলেন। হযরত উমর (রা.) তখন খলীফা ছিলেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস গমন করেন। হযরত বিলাল (রা.) তাঁর সঙ্গে। তাঁরা সকলে মসজিদে আকসায় নামায আদায় করেন। সেই নামাযের আযান দীর্ঘ সময় পর হযরত বিলাল। (রা.) দিয়েছিলেন। হযরত বিলাল রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের পর এমন নীরব হয়ে গিয়েছিলেন যে, মানুষ তাঁর জ্বালাময়ী কণ্ঠ ভুলে গিয়েছিলো। তিনি আযান দেয়া ত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু মসজিদে আকসায় এসে হযরত উমর (রা.) তাকে বললেন, বিলাল! মসজিদে আকসা ও বাইতুল মুকাদ্দাসের দরজা-দেয়াল বহুদিন যাবত আযান শোনেনি। আযাদীর প্রথম আযানটা তুমিই দাও। রাসূলে মকবুল (সা.) এর ওফাতের পর হযরত বিলাল এ-ই প্রথম আযান দিলেন।…
আমার প্রিয় বন্ধুগণ! আমাদের আমলে মসজিদে আকসা পুনরায় আযানের সুর ভুলে গেছে। নব্বইটি বছর যাবত এই মহান মসজিদের দরজা-দেয়াল একজন মুয়াজ্জিনের পথপানে তাকিয়ে আছে। স্মরণ রেখো, মসজিদে আকসার আযান সমগ্র পৃথিবীতে শোনা হয়। খৃস্টানরা সেই আযানের গলা টিপে ধরে রেখেছে। এই পবিত্র লক্ষ্যটাকে সামনে রেখে অগ্রসর হও। আমরা সাধারণ কোনো যুদ্ধ লড়তে যাচ্ছি না। আমরা আপন রক্তের ইতিহাসের সেই অধ্যায়টি পুনরায় লিখতে যাচ্ছি, যা আমর ইবনুল আস ও তার সঙ্গীরা লিখেছিলেন। যদি কামনা করো, মাথায় আলো নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, যদি কামনা করো,অনাগত বংশধর তোমাদের কবরের উপর ফুল ছিটাক; তাহলে তোমাদেরকে সেই মিম্বরটি বাইতুল মুকাদ্দাসে স্থাপন করতে হবে, যেটি বিশ বছর আগে নুরুদ্দীন জঙ্গী মরহুম ওখানে স্থাপনের জন্য তৈরি করিয়েছিলেন।
সুলতান আইউবী মিম্বরটি সকলকে দেখালেন এবং বললেন- এই মিম্বর জঙ্গী মরহুমের বিধবা ও কন্যা বয়ে নিয়ে এসেছে। আমাদেরকে সেই নারীর লাজ রক্ষা করতে হবে, যে জাতির দুশ মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এখানে এসেছে। উদ্দেশ্য, আমাদের কেউ যেনো যুদ্ধের ময়দানে পিপাসার মারা না যাই, কেউ যাতে আহত হয়ে ব্যান্ডেজ-চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না থাকি। তোমরা জানো, আমি কখনো যুদ্ধের ময়দানে নারীর উপস্থিতির পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু এই মেয়েগুলোকে এ জন্য রেখে গিয়েছি, যেনো আত্মমর্যাদা ও জাতীয় মর্যাদার এই চিহ্নটা আমাদের সম্মুখে থাকে এবং আমাদের স্মরণ থাকে, আমাদের এদেরই ন্যায় কন্যারা বাইতুল মুকাদ্দাসে কাফেরদের হিংস্রতা ও পাশবিকতার শিকার হয়ে আছে। মনে রেখো আমার বন্ধুগণ! যে জাতি জাতির কন্যা ও শহীদদের কথা ভুলে যায়, আল্লাহও সে জাতিকে ভুলে যান এবং তাদের ভাগ্যে আজীবনের জন্য অভিশাপ লিখে দেয়া হয়। কিয়ামতের দিন তোমরা অভিশপ্তদের মাঝে উত্থিত হবে, নাকি আল্লাহর রহমত ও রাসূলের সুপারিশপ্রাপ্তদের মাঝে, সে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তোমাদের।
সুলতান আইউবী এরূপ আবেগময় কথা বলায় অভ্যস্ত ছিলেন না। কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাসের ব্যাপারে তিনি এতোই আবেগপ্রবণ ছিলেন যে, যখনই ইতিহাসের এ ভূখণ্ডটি আলোচনায় উঠে আসতো, তাঁর চোখে অশ্রু নেমে আসতো এবং তিনি অস্থির হয়ে উঠে পায়চারি করতে শুরু করতেন। এই শেষ বৈঠকে তিনি তাঁর সালার প্রমুখদের মাঝে এমন আবেগ জাগিয়ে তোলেন যে, তিনি এজলাস ত্যাগ করে বেরিয়ে যাওয়ার পরও কারো মুখ থেকে কোনো কথা ফোটেনি। তাদের গতি-প্রকৃতিই বদলে গেছে। তারা সোজা নিজ নিজ বাহিনীর নিকট চলে যায় এবং স্ব স্ব কমান্ডারদেরকেও অনুরূপ আবেগময় করে তোলে।
