রউফ কুর্দির অন্তরে নিজের ভালোবাসার প্রতারণা ও আল-ফারেসের প্রতি শত্রুতা সৃষ্টি করে ফ্লোরি তার কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। আল ফারেস যে তথ্য কখনো তাদের দেননি, রউফ তার সব উগরে দেয়।
সুলতান আইউবীর চোখে ঘুম নেই। গোটা রাত বৈঠকে কেটেছে। তিনি এমন কোনো ঝুঁকি মাথায় নিতে চাচ্ছেন না, যার ফলে বাইতুল মুকাদ্দাসের অবরোধ ব্যর্থ হতে পারে। তিনি মানচিত্রে সালার ও অন্যান্যদের বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তা দেখিয়ে দেন। যেসব স্থানে এই কদিন খৃস্টানদের চৌকি ছিলো আর এখন সেখানে তার গেরিলা কিংবা সম্মুখ বাহিনীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল অবস্থান করছে কিংবা ওখানে কিছুই ছিলো না, সেসব জায়গার উপর চিহ্ন দিয়ে রাখেন। এমন স্থানগুলোও চিহ্নিত করে রাখেন, যেখানে এখনো ক্রুসেডারদের চৌকি বহাল আছে এবং তাতে অনেক সৈন্য বিদ্যমান রয়েছে। সুলতান সকলকে অবহিত করেন, তিনি এসব চৌকি দখল করার চেষ্টা-ই করেননি। কারণ, তিনি বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত নিজের সামরিক শক্তি নষ্ট করতে চাচ্ছেন না। এই চৌকিগুলো সব উঁচুতে অবস্থিত। তাই এগুলো এড়িয়ে সামান্য দূর দিয়ে পথ অতিক্রম করার কৌশল অবলম্বন করেছেন তিনি। সেগুলোতে যে সৈন্য আছে, তারা বাইরে বেরিয়ে এসে আমাদের পথরোধ করার সাহস করবে না।
কিন্তু দূর থেকে আমাদেরকে দেখে তাদের দূত বাইতুল মুকাদ্দাস গিয়ে সংবাদ পৌঁছাবে- এক সালার বললেন- ফলে আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসকে অসতর্ক অবস্থায় ঝাঁপটে ধরতে ব্যর্থ হবো।
অসতর্ক অবস্থায় ঝাঁপটে ধরার আশা মন থেকে ফেলে দাও- সুলতান আইউবী বললেন- ক্রুসেডাররা ভালোভাবেই জানে, আমরা বাইতুল মুকাদ্দাস যাচ্ছি। তাদের গতিবিধি প্রমাণ করছে, তারা বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে আমাদের মোকাবেলায় আসবে না। একে তো নগরীতে এমন বাহিনী আছে, যারা কখনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তাদেরকে নগরীর নিরাপত্তার জন্য রিজার্ভ রাখা হয়েছে। সেখান থেকে গুপ্তচর রিপোর্ট নিয়ে এসেছে, এই বাহিনী দিনরাত অবরোধে লড়াই করার ও অবরোধ ভাঙার মহড়া দিচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা যেসব অঞ্চল জয় করেছি, সেখানকার পালিয়ে যাওয়া সৈন্যরাও বাইতুল মুকাদ্দাস চলে গেছে। তাদের মধ্যে বর্মপরিহিত নাইটও আছে। আমাদের গোয়েন্দারা জানিয়েছে, অবরোধ চলাকালে এই নাইটরা ফটকের বাইরে এসে আক্রমণ করবে এবং প্রতিটি আক্রমণের পর নগরীতে ঢুকে পড়বে। এই পদ্ধতি তারা আমাদের থেকে শিখেছে। আঘাত হানো আর অদৃশ্য হয়ে যাও। কাজেই দুশমনকে অসতর্ক অবস্থায় ঝাঁপটে ধরার আশা বাদ দাও। দুশমন তোমাদের অপেক্ষায় প্রস্তুত দাঁড়িয়ে আছে। তারপরও খৃস্টানদের কোনো চৌকি থেকে কোনো দূত যেনো বাইতুল মুকাদ্দাস পৌঁছতে না পারে, আমি সেই ব্যবস্থা করে রেখেছি। বাইতুল মুকাদ্দাস ও তাদের চৌকিগুলোর মাঝে আমাদের গেরিলাদের বসিয়ে রেখেছি। তারা কাউকে জীবিত যেতে দেবে না।
তাদের সেনাসংখ্যা সম্পর্কে গোয়েন্দারা বিভিন্ন তথ্য বলেছে। সে থেকে আমি অনুমান করেছি, বাইতুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে খৃস্টানদের নিয়মতান্ত্রিক সেনাসংখ্যা ষাট হাজারেরও কিছু বেশি হতে পারে। আমাদেরকে এ কথাটাও মাথায় রাখতে হবে যে, ওখানে মুসলমানরা কয়েদ ও নজরবন্দি অবস্থায় আছে। ফলে ভেতর থেকে তারা আমাদের কোনো সাহায্য করতে পারবে না। বিপরীতে খৃস্টান জনসাধারণ তাদের বাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। খৃস্টানরা তাদের। কিশোরদেরকেও তীরন্দাজির প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছে। নগরীর প্রাচীরের উপর থেকে আমাদের উপর তীর সঠিক অর্থেই মুষলধারার বৃষ্টির ন্যায় আসবে। তীর ছোঁড়ার জন্য খৃস্টানরা নতুন ধরনের একটি ধনুক নিয়ে এসেছে, যেটি দেখতে ক্রুশের ন্যায়। তা দ্বারা ছোঁড়া তীর বেশ দূরেও যায় এবং নিশানাও অব্যর্থ হয়।
সুলতান আইউবী নকশা ধরে ধরে উপস্থিত সকলকে প্রতিটি স্থান ও রাস্তা ইত্যাদি দেখিয়ে দেন। পরে অবরোধ সম্পর্কে জরুরি দিক-নির্দেশনা প্রদান করে বললেন, এটি শেষ বৈঠক। কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকলে দূর করে ফেলল। কোনো প্রশ্ন থাকলে তা যতো অর্থহীন হোক না কেন জিজ্ঞেস করে উত্তর জেনে নাও। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ- যিনি সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধাভিযানে সুলতান আইউবীর সঙ্গে ছিলেন তার রোজনামচায় সুলতান ইউসুফের উপর কী বিভীষিকা নেমে এসেছিলো শিরোনামে লিখেছেন- সুলতান আইউবী (উক্ত শেষ বৈঠকে) রাসূলে আকরাম (সা.)-এর একটি হাদীস শোনান- যার জন্য সফলতার দরজা খুলে যায়, তাতে তার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে যাওয়া উচিত। বলা যায় না, এই দরজা কখন বন্ধ হয়ে যায়। সুলতান আইউবী দ্রুত অধিকৃত অঞ্চল ও দুর্গ জয় করতে আসছিলেন। তাই তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস আক্রমণে বিলম্বের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেছেন- আল্লাহ আমাদের সফলতার দরজা খুলে দিয়েছেন। বন্ধ হওয়ার আগেই তাতে ঢুকে পড়ো।…।
আমার বন্ধুগণ!- সুলতান আইউবী নকশাটা একধারে সরিয়ে রাখতে রাখতে বললেন- হিত্তীন যুদ্ধের আগে আমি তোমাদেরকে কয়েকটি কথা বলেছিলাম। সে কথাগুলোই আবার বলছি। এরপর আর কথা বলার সুযোগ পাবো না। পরস্পর জীবিত সাক্ষাৎ হবে কিনা, তাও বলতে পারি না। ইতিপূর্বে আমরা শুধু যুদ্ধ লড়েছি। গৃহযুদ্ধে একে অপরের রক্ত ঝরিয়েছি আর শত্রুকে আমাদের অঞ্চলে দুর্গ সুসংহত করতে ও বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রতিরক্ষা শক্ত করতে সময় ও সুযোগ দিয়েছি। তারপর আমরা আন্ডারগ্রাউন্ড লড়াই লড়তে থাকি। খৃস্টানরা আপন রূপসী কন্যাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের আমীর-উজির ও সামরিক-বেসামরিক অফিসারদের নিকট প্রেরণ করতে থাকে। তারা আমাদের সারিতে বিশ্বাসঘাতক ও কুচক্রী ঢুকিয়ে দেয়। এই নারী আর গাদ্দাররা যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, সেসব তোমাদের কারুরই অজানা নয়। আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীস এবং তাদের বিভাগ বড় দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সঙ্গে সেই অদৃশ্য অঙ্গনে দুশমনের মোকাবেলা করেছে। বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে আমার হাতে আমার অভিজ্ঞ অনেক কর্মকর্তা ও সালার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়। একের পর এক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে আর আমরা সেগুলো দমন করি।…
