শোন ফ্লোরি!- রোজি উত্তর দেয়- এন্ড্রু এখান থেকে আমাদেরকে উদ্ধার করতে পারবে না। এটি যুদ্ধজাহাজ। দেখছো না, রাতে ছাদের। উপর বরং আরো উপরে মাস্তুলে মাচান পেতে এক সৈনিক দাঁড়িয়ে থাকে। পালাবার চেষ্টা করলে আমাদের সঙ্গে এরও ধরা পড়ার আশঙ্কা আছে। আমাদেরকে এতো তাড়াতাড়ি নিরাশ হওয়া ঠিক হবে না।
তাহলে কি অন্য কোনো অস্ত্র ব্যবহার করবে? ফ্লোরি জিজ্ঞেস করে।
করতে হবে- রোজি বললো- আল-ফারেসের নায়েব তো পূর্ব থেকেই আমাদেরকে কামনার চোখে দেখছে এবং মুচকি হাসছে। এই লোকগুলো দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সমুদ্রে অতিবাহিত করছে। মৃত্যু সব সময় এদের মাথার উপর অপেক্ষমান থাকে। খোদা পুরুষের মধ্যে নারীর যে দুর্বলতা সৃষ্টি করেছেন, তা এমনি পরিস্থিতিতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইঙ্গিত করতে দেরি, সাড়া আসতে দেরি হয় না। বলো, কাজটা আমি করবো, নাকি তুমি? আমার তুলনায় অবশ্য তোমার অভিজ্ঞতা ভালো।
আচ্ছা আমিই করি। ফ্লোরি বললো।
কিন্তু এ কাজের নিয়ম-নীতি মনে রাখতে হবে- রোজি বললো তথ্য নেবে; তবে তার মূল্যটা শুধু দেখাবে- পরিশোধ করবে না। লোকটার মধ্যে এমন পিপাসা সৃষ্টি করবে, যেনো সে আল-ফারেসকে, হত্যা করার ভাবনা ভাবতে বাধ্য হয়।
আল-ফারেসের নায়েবের নাম রউফ কুর্দি। আগে থেকেই লোকটি মেয়েগুলোর প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ করে আসছে। এদের প্রতি তাকাতো আর মিটি মিটি হাসতো। তার জানা ছিলো, এরা আল-ফারেসের স্ত্রী কিংবা গণিকা নয়- আশ্রিতা যাযাবর। আল-ফারেস এদেরকে নিজ জাহাজে আশ্রয়দান করেছেন। মেয়ে দুটো রউফ কুর্দির হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। সে রাতে যখন তারা ছাদে রেলিং ধরে কথা বলছিলো, রউফ কুর্দি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিলো। আল-ফারেস তত সুলতান আইউবীর বৈঠকে যোগ দিতে চলে গেছেন। জাহাজের কর্তৃত্ব এখন রউফ কুর্দির হাতে।
ফ্লোরি ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রোজি পায়চারি করার ভান ধরে সেখান থেকে সরে যায় এবং রউফ কুর্দির পাশ দিয়ে যেতে যেতে মুচকি একটা হাসি দেয়। রউফ কুর্দি শোন বলে তাকে কাছে ডেকে নেয় এবং কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে শুরু করে। দুচারটি কথার উত্তর দিয়ে। রোজি চলে যেতে উদ্যত হলে রউফ কুর্দি তাকে বসতে বলে।
আমি আপনার কাছে বসে থাকলে ও (ফ্লোরি) ক্ষেপে যাবে। রোজি বললো।
কেন? রউফ কুর্দি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে।
এ যার যার মনের ব্যাপার- রোজি বললো- আল-ফারেস একদিন নীচে ঘুমিয়ে ছিলেন। আমি উপরে এসে আপনার কাছে দাঁড়ালাম। ও দেখে ফেলে। পরে আমাকে বললো, আমার মালিকানায় ভাগ বসাতে চেষ্টা করো না। রউফ আমার। মিসর গিয়ে আমি তার সঙ্গে চলে যাবো। ও আবার আল-ফারেসকে পছন্দ করে না। কিন্তু পাছে আল-ফারেস অসন্তুষ্ট হন কিনা সে ভয়ে আপনার কাছে ঘেঁষে না।
রউফ কুর্দির আবেগের সমুদ্রে জোয়ার এসে যায়। পুরুষিত স্বভাবের দুর্বলতা তাকে কাবু করে ফেলে। ফ্লোরি-রোজি অপেক্ষা বেশি রূপসী মেয়েও রউফ দেখেছে। কিন্তু এদের রূপ ও অঙ্গভঙ্গিতে যে আকর্ষণ রয়েছে, তা অন্যদের মধ্যে দেখেনি। এখন যখন জানতে পারলো, এদের একজন তাকে কামনা করছে, তখন তার মস্তিষ্ক আবেগের উপর সেই পথে চলতে শুরু করে দিয়েছে, যে পথে একজন পুরুষের যাওয়া দেখা যায়; কিন্তু ফিরে আসা দেখা যায় না। রোজি তাকে আত্মহারা এক ঘরের মধ্যে ফেলে রেখে চলে যায়। কেবিনে অবতরণের জন্য সিঁড়িতে পা রেখে সে পেছন পানে তাকায়। দেখে, রউফ কুর্দি ধীরে ধীরে ফ্লোরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আজ রাত ঘুমাবে না জুয়াশি! ফ্লোরি আল-ফারেসকে নিজের যে নাম বলেছিলো, রউফ কুর্দি কাছে গিয়ে তাকে সেই নামে ডাকে।
রোজি নিজের নাম বলেছিলো আজমির। যাযাবরদের নাম এমন। অদ্ভূতই হয়ে থাকে।
রউফ কুর্দিকে পার্শ্বে দণ্ডায়মান দেখে ফ্লোরি প্রশিক্ষণ অনুযায়ী এমন ধারায় লজ্জা প্রকাশ করে, যেমনটি নববধূও করে না। রউফ কুর্দি মেয়েটির কাঁধে হাত রাখলে সে সলাজ নতমুখে একদিকে সরে যায়।
আজমির আমাকে তোমার সম্পর্কে কিছু কথা বলেছে- রউফ কুর্দি বললো- এসব কি সত্য?
ফ্লোরি রউফের প্রতি একবার মুখ তুলে তাকিয়েই অমনি ঘাড় ঘুরিয়ে সমুদ্রের দিকে দেখতে থাকে। রউফ কুর্দি প্রশ্নটা পুনর্ব্যক্ত করে ফ্লোরি যে হাতে রেলিং ধরেছিলো, সে হাতের উপর নিজের একটা হাত রাখে। ফ্লোরি ধীরে ধীরে নিজের হাত উল্টো করে আঙুলগুলো রউফ কুর্দির আঙুলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়।
অল্পক্ষণ পর। ফ্লোরি এখন রউফ কুর্দির সঙ্গে তার ডিউটির স্থলে উপবিষ্ট। জাহাজ নোঙ্গরকরা। গোটা চারেক বাতি সমুদ্রে সাঁতার কাটছে। এগুলো আল-ফারেসের জাহাজ, সমুদ্রে টহল দিয়ে ফিরছে।
মধ্যরাতে রউফ কুর্দির স্থলে তার এক অধীন অফিসার ডিউটিতে আসবার কথা। রউফ কুর্দি ফ্লোরিকে বললো, তুমি আমার কেবিনে চলে যাও, আমি আসছি।
ফ্লোরি চলে যায়।
জাহাজের ছাদ থেকে ফজরের আযান ভেসে আসলে ফ্লোরি, রউফ কুর্দির কেবিন থেকে বের হয়। মেয়েটি আল-ফারেসের নায়েবকে নিশ্চিত, করে, তাকে সে মনে-প্রাণে কামনা করছে এবং কোনো দিনই আল ফারেসকে স্বামী হিসেবে বরণ করবে না। সে রউফ কুর্দিকে জানালো, আল-ফারেস আমাকে বলেছিলেন, তুমি রউফের সঙ্গে কথা বলবে না। লোকটা বড় খারাপ মানুষ। আসলে তিনি নিজেই বদমাশ। আমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন বটে; কিন্তু আমাদের অসহায়ত্ব থেকে পুরোপুরিই সুযোগ নিচ্ছেন। আমরা যদি অসহায়-নিরাশ্রয় না হতাম, তাহলে এতো বেশি মূল্য কখনো দিতাম না।
