***
সুলতান আইউবী সালার ও নায়েব সালারদের সর্বশেষ বৈঠকের আয়োজন করেন। তাতে নৌ-বাহিনীর ক্যাপ্টেন আল-ফারেসকে তলব করা হয়। দূত যখন আল-ফারেসের নিকট পৌঁছে, তখন তার জাহাজ আসকালান থেকে বিশ মাইল দূর খোলা সমুদ্রে অবস্থান করছিলো। ডিঙি সে পর্যন্ত পৌঁছুতে আধা দিন সময় লেগে যায়। আল-ফারেস সেই ডিঙিতে করে রাতেই আসকালান পৌঁছে যান। দূত তাকে বলেছিলো, সুলতান সকল সালারকে তলব করেছেন। তাতেই তিনি বুঝে ফেলেন, বাইতুল মুকাদ্দাসের উপর আক্রমণ সম্পর্কে বৈঠক হবে। দূতের সঙ্গে জাহাজ থেকে। রওনার সময় মেয়ে দুটোকে বললেন- আমি আসকালান যাচ্ছি।
সুলতান ডেকেছেন? এক মেয়ে জিজ্ঞেস করে।
কেনো ডেকেছেন? অপরজন জানতে চায়।
আমার রাষ্ট্রীয় কাজে তোমরা এতো মাথা ঘামাচ্ছো কেনো?- আল ফারেস বিরক্তি প্রকাশ করেন- তোমাদের কয়েকবার বলেছি, আমার ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া অন্য কোনো ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করো না।
দুজনেই হেসে ওঠে। একজন বললো- যোগ্যতা থাকলে আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ করতাম এবং দুশমনরা আক্রমণ করলে মোকাবেলা করতাম।
তোমরা যার যোগ্য, আমি তোমাদের থেকে সে কাজই নেবো- আল ফারেস বললেন- আমার অবর্তমানে বেশিরভাগ সময় নীচে কাটাবে। উপরে গিয়ে মাল্লা ও সৈনিদের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না।
আপনি কবে ফিরবেন?
আজ রাতে বোধ হয় আসতে পারবো না- আল-ফারেস উত্তর দেন কাল সন্ধ্যা নাগাদ এসে পড়বে।
আল-ফারেস মেয়ে দুটির মাঝে পুরোপুরি একাকার হয়ে গেছেন। মেয়েরা তাকে সুলতান আইউবীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতো। জানতে চাইতো, রোম উপসাগরে মিসর ও সিরিয়ার নৌ-বহর বন্দরে আছে, নাকি সমুদ্রে। মোট জাহাজ কয়টি। এগুলোতে, কতোজন সৈন্য আছে। আল-ফারেস তাদের পরিষ্কার বলে দিতেন, আমাকে এসব ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করবে না। তথাপি তারা নিজেদের রূপ-লাবণ্য ও ভাবভঙ্গির যাদু প্রয়োগ করে তার নিকট এমন সব বিষয়ে। জিজ্ঞেস করে বসতো, যা একটি বাহিনীর গোপন সামরিক বিষয়। আল ফারেস আবেগময় অবস্থা থেকে সঙ্গে সঙ্গে সচেতন হয়ে যেতেন এবং তাদেরকে প্রীতির সাথে শাসিয়ে দিতেন।
নেশার অবস্থায় মানুষ হৃদয়ে লুকায়িত গোপন তথ্য উগরে দিয়ে থাকে। চাই নেশাটা মদের হোক কিংবা অন্য কোন ওষুধের। কিন্তু আল ফারেস মদপান করতেন না। না জাহাজে মদ কিংবা অন্য কোনো নেশাকর দ্ৰব্য রাখার অনুমতি ছিলো। তিনি চরিত্রহীন মানুষও নন। কিন্তু এখন দুটি মেয়ের নেশা তাকে জেঁকে ধরেছে, যাদের সাহায্যে তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় এবং তিনি চাঙ্গা হয়ে ওঠেন। এই মেয়ে দুটো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা দেখলো, আল-ফারেসের মধ্যে না মদের অভ্যাস আছে, না তার চরিত্রে কোনো কলুষতা আছে। তারা তার উপর প্রেম ভালোবাসার নেশা জাগিয়ে তুলতে শুরু করে। কিন্তু আল-ফারেস নিজ কর্তব্যে এতোই পরিপক্ক যে, আবেগের উপর মাদকতা ছেয়ে গেলেও তিনি কর্তব্যে একবিন্দু ত্রুটি করছেন না।
***
এক রাত। আল-ফারেস গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন। মেয়ে দুটো কেবিন থেকে বেরিয়ে উপরে চলে যায় এবং ছাদের রেলিং ধরে জোৎস্না রাতের হিমেল হাওয়া উপভোগ করতে শুরু করে।
রোজি!- এক মেয়ে অপরজনকে বললো- আমি সামনে অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। আল-ফারেস দেখতে মোম। কিন্তু এটা-ওটা জিজ্ঞেস করলে পাথর হয়ে যান। আমার মনে হচ্ছে, এখানে আমরা কোনো কাজ করতে পারবো না। এন্ড্রু আসলে বলবো, সম্ভব হলে তুমি আমাদেরকে এখান থেকে কোথাও নিয়ে যাও। কী বলো, ভালো হবে না?
ক্ষুদ্র ডিঙিতে করে জাহাজের নিকট এসে জাহাজের মাল্লা ও সৈনিকদের নিকট এটা-ওটা বিক্রি করতে যে বৃদ্ধ, আসলে মেয়ে দুটো যাকে জাহাজে তুলে নিয়ে কেনা-কাটার ভান ধরে কথা বলতো, এন্ড্রু সেই ব্যক্তি। লোকটার সঙ্গে মেয়ে দুটোর ঘটনাক্রমে সাক্ষাৎ হয়েছিলো। লোকটি গরীব হকারের বেশে নিজের ডিঙিতে করে আল-ফারেসের জাহাজের নিকট পণ্য বিক্রয় করতে এসেছিলো। সে মেয়ে দুটোকে এবং মেয়ে দুটো তাকে চিনে ফেলে। মেয়েরা পণ্য ক্রয়ের কথা বলে তাকে জাহাজে তুলে নিয়েছিলো। সে মেয়েদের বলেছিলো, তারা আল ফারেসের এই ছয়টি জাহাজের সঙ্গে ছায়ার ন্যায় লেগে আছে এবং সুযোগ পেলেই জাহাজগুলোকে ধ্বংস করে দেবে। মেয়েরা তাকে বলেছিলো, আশ্রয়ের বাহানায় আমরা তোমাদের জন্য গোয়েন্দাগিরি করব।
এন্ড্রু একজন নাশকতাকারী গোয়েন্দা। প্রথম সাক্ষাতের পর সে দুবার আপন বেশে এসেছিলো এবং মেয়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলো। মেয়েরা তাকে জানায়, আল-ফারেস তাদের জালে আসছেন না এবং কোনো তথ্যও দিচ্ছেন না। এডুর জানবার প্রয়োজন ছিলো, জাহাজগুলো কতদিন এই ডিউটিতে থাকবে এবং টায়েরের দিকে যাবে কিনা? সে। মেয়েদের বললো, মনে হচ্ছে তোমরা বিদ্যা ভুলে গেছে। এই জাহাজে তো আল-ফারেস একজনই লোক নয়। তার নায়েবও তো আছে এবং তার নীচে আরো একজন অফিসারও আছে। তোমরা তাদের একজনকে হাত করে নাও। তাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে দাও। আল-ফারেসের নায়েবকে তার শত্রু বানিয়ে দাও। যাদু প্রয়োগ করো। কী করতে হবে জানো না? সবই তো জানো।
সে রাতে এক মেয়ে অপরজনকে হতাশা ব্যক্ত করে বললো, রোজি! এন্ড্রু আসলে বলবো, আমাদেরকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও।
