বাইতুল মুকাদ্দাসের সম্রাট গাই অফ লুজিনান- যিনি হিত্তীনের যুদ্ধে বন্দি হয়েছেন এবং এখন দামেশকের কারাগারে আটক রয়েছেন যে বাহিনীটি সঙ্গে নিয়েছিলেন, তার কিছু অংশ মারা গেছে। কিছু বন্দিত্ববরণ করেছে। অবশিষ্টরা এমনভাবে পলায়ন করেছে যে, এখন তার অফিসার, সৈনিক ও বর্মপরিহিত নাইটরা আহত কিংবা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বাইতুল মুকাদ্দাসে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। নাইটদের মনোবলে কিছুটা প্রাণ আছে। কারণ, পদমর্যাদার লাজ তো রাখতে হবে। অন্যান্য সৈন্যরা শহরে ঢুকে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। সেনাপতিগণ নাইটদেরকে নতুন করে সংগঠিত করে নিয়েছে। এখন বাইতুল মুকাদ্দাসের ভেতরের সেনাসংখ্যা ষাট হাজারে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু নাগরিক সাধারণ জেনে ফেলেছে, সালাহুদ্দীন আইউবী নগরী জয় করতে আসছেন, তাই তারাও যুদ্ধ লড়া ও মৃত্যুবরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে। নগরীর প্রতিরক্ষাকে আরো বেশি শক্ত করা হয়েছে।
নগরীর এক-দুটি ফটক দিনের বেলা খোলা রাখতে হচ্ছে। কেননা, রণাঙ্গন থেকে পলাতক খৃস্টান সেনারা একজন-দুজন-চারজন করে এসে নগরীতে প্রবেশ করছে। সুলতান আইউবীর গোয়েন্দারা আগে থেকেই নগরীতে উপস্থিত। এবার পলায়নপর খৃস্টানদের বেশে আরো কিছু গুপ্তচর এসে নগরীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রাচীর ভালোভাবে দেখে বেরিয়েও গেছে। মুসলমানদের উপর কড়াকড়ির মাত্রা আগের চেয়ে বেশি কঠোর করে দেয়া হয়েছে।
বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে দশ-বারো মাইল দূরে আসকালানের দিকে খৃস্টানদের একটি চৌকি ছিলো। তাতে প্রায় একশ খৃস্টান সৈন্য অবস্থান করতো। তারা তাবু স্থাপন করে রেখেছিলো। ১১৮৭ সালের সেপ্টেম্বরের এক রাতে তাদের সেই চৌকির সন্নিকটে একটি বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটে। পরে অনুরূপ আরো দুতিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। পরক্ষণেই আগুন জ্বলে ওঠে এবং তিন-চারটি তাঁবু জ্বলতে শুরু করে। সৈনিকরা জাগ্রত হয়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়। যেইমাত্র সৈন্যদের মাঝে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যায়, অমনি তাদের উপর চতুর্দিক থেকে তীর আসতে শুরু করে। জ্বলন্ত তাঁবুগুলোর আলোতে এই তীরবৃষ্টি চোখে পড়তে শুরু করে। এ ছিলো দাহ্য পদার্থের সেসব পাতিলের কৃতিত্ব, যেগুলো সুলতান আইউবীর একটি কমান্ডো দল মিনজানিকের সাহায্যে নিক্ষেপ করেছিলো। পাতিলগুলো চৌকিগুলোতে এসে নিক্ষিপ্ত হয়ে বিস্ফোরিত হওয়ার পর পর সেখানে সলিতাওয়ালা অগ্নিতীর ছোঁড়া হয়। এই তীর এসে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাহ্য পদার্থে আগুন ধরে যায়।
খৃস্টানরা এদিক-ওদিক পালিয়ে যাওয়ার পর টের পায়, তারা শত্রুবাহিনীর ঘেরাওয়ে পড়ে গেছে এবং এই ঘেরাও থেকে জীবিত বের হওয়া সম্ভব নয়। কমান্ডোরা হুংকার ছাড়তে শুরু করে- যদি জীবনে রক্ষা পেতে চাও, তাহলে অস্ত্র ত্যাগ করে একদিকে সরে দাঁড়িয়ে যাও। আগুনের ধ্বংসলীলার পর সুলতান আইউবীর কমান্ডোদের এই হুংকার ক্রুসেডারদের অবশিষ্ট দমটুকুও নিঃশেষ করে দেয়। তারা অস্ত্র ত্যাগ করে কমান্ডোদের হাতে আত্মসমর্পণ করে। এখন তাদের সংখ্যা পঁচিশ থেকে ত্রিশজন। তাদের ঘোড়া ও অস্ত্র ইত্যাদি দখল করে পেছনে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
ভোর নাগাদ ভস্মিভূত চৌকিটিতে সুলতান আইউবীর সম্মুখ বাহিনীর একটি ইউনিট পৌঁছে যায়। এতে বাহিনীর অগ্রযাত্রা বেশ দূর অঞ্চল পর্যন্ত নিরাপদ হয়ে যায়। গেরিলাদের অবস্থা বনের হায়েনাদের ন্যায় হয়ে যায়। দুজন দুজন করে জানবাজ ঝোঁপ-ঝাড়, পাথরখণ্ড ও টিলার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকে। যেখানেই টহল অশ্বারোহী কিংবা পদাতিক সৈন্যদের শব্দ কানে আসছে, তারা চুপসে যাচ্ছে এবং যখনই খৃস্টানরা নিকটে এসে পৌঁছছে, অমনি তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। দুজন লোক যদি ছয় ব্যক্তির উপর আক্রমণ চালায়, তাহলে দুজনের পরিণতি কী হয় সহজেই বোঝা যায়। কাজেই এই অভিযানে কমান্ডোরা শহীদ এবং জখমীও হয়ে চলছে।
এ ছিলো তাদের এক স্বতন্ত্র যুদ্ধ। তাদের কোনো কমান্ডার নেই। এদিক-ওদিক কোথাও লুকিয়ে বসে থাকলে তাদের জিজ্ঞেস করার কেউ ছিলো না। কিন্তু দৈহিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের যে আত্মিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছিলো, তা তাদেরকে আগুনের ন্যায় উত্তপ্ত করে রেখেছিলো। হিত্তীনের জয়ের পর সুলতান আইউবী যে বড় শহরটি জয় করেছিলেন, সেখানকার মুসলমানদের করুণ অবস্থা ফৌজকে দেখানো হয়েছিলো। তাদেরকে মসজিদের অবমাননা ও ধ্বংসলীলা দেখানো হয়েছিলো। তাদের বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ কোনো রাজার রাজত্বের নিরাপত্তা বা পুনরুদ্ধারের জন্য লড়া হচ্ছে না, বরং এই যুদ্ধ লড়া হচ্ছে ইসলামের সুরক্ষা ও এই মহান ধর্মের দুশমনের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে। প্রশিক্ষণের পর এই যুদ্ধ তাদের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়ে গেছে।
আসকালানে সুলতান আইউবী রাতে ঘুমাবার তেমন সময় পাচ্ছেন না। গেরিলাদের পক্ষ থেকে দূতরা যাওয়া-আসা করছে ও সংবাদ আদান প্রদান করছে। বাইতুল মুকাদ্দাস থেকেও দূতরা আসছে-যাচ্ছে। এরা রাতেও আসছে। সুলতান আইউবী নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, কোথাও থেকে কোনো সংবাদ আসলে যখনই আসুক তৎক্ষণাৎ যেন তাকে অবহিত করা হয়। যদিও তিনি গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকেন। গেরিলারা রিপোর্ট নিয়ে আসছে, অমুক স্থানে খৃস্টানদের একটি চৌকির উপর আক্রমণ হয়েছে, এভোজন খৃস্টান সেনা মারা গেছে, এতোজন গেরিলা শহীদ ও এতোজন আহত হয়েছে। অমুক রাস্তাটি নিরাপদ করে ফেলা হয়েছে ইত্যাদি। সে মোতাবেক সুলতান আইউবী নকশায় অগ্রযাত্রার পথের চিহ্নে রদবদল করে নিচ্ছেন।
