লক্ষ্যহীন বেঁচে থাকার চেয়ে সময়ের আগে মরে যাওয়াই ভালো পুত্রদের সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে ফৌজে অন্তর্ভুক্ত করার সময় সুলতান আইউবী বললেন- এই উক্তি তোমাদের মরহুম দাদার। আমি যখন আমার চাচা শেরেকোহর সঙ্গে খৃস্টানদের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধে রওনা হয়েছিলাম, তখন আব্বাজান আমাকে কথাটা বলেছিলেন। তিনি বলেছেন, আমি দেখতে পাচ্ছি, তুমি কোনো একটি ভূখণ্ডের শাসক হবে। হতে পারে তুমি সুলতান হয়ে যাবে। স্মরণ রেখো বেটা! আজ থেকে তুমি আমার পুত্র নও- জাতির পুত্র। কুরআন মানুষকে পিতা-মাতার সেবা করার নির্দেশ দিয়েছে। এখন থেকে দেশের জনগণ ও সালতানাত তোমার পিতা-মাতা। আল্লাহ সন্তানকে পিতার উপর শাসন করতে এবং তাদের কষ্ট দিতে বারণ করেছেন। সাবধান ইউসুফ! দেশের জনগণকে কষ্ট দেবে না। দেখবে তোমার উপর জাতির কী কী হক আছে। সেসব আদায় করতে সচেষ্ট হবে।…।
আর আমার প্রিয় পুত্রগণ! তোমাদের দাদা বলেছেন, ঘাড় সেদিন উঁচু করবে, যেদিন মসজিদে আকসাকে কাফেরদের থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে। আরামের ঘুম সেই রাত ঘুমাবে, যে রাতে মসজিদে আকসায় বিজয়ের নফল নামায আদায় করবে। আর আমাদের প্রিয় রাসূল যে মসজিদের আঙ্গিনা থেকে আল্লাহর দরবারে মিরাজে গমন করেছিলেন, তাকে নিজ চোখের অশ্রু দ্বারা ধৌত করবে। আমার পুত্রগণ! যেসব শিশু বাইতুল মুকাদ্দাসের অলি-গলিতে ও মসজিদে মসজিদে খুন হয়েছিলো এবং জাতির যে মেয়েরা লাঞ্ছিত-নিগৃহীত হয়েছিলো, তারা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না। যে মসজিদে আমার প্রিয় রাসূলের পবিত্র পা পড়েছিলো, যে মসজিদে রাসূলে পাকের পবিত্র কপাল সেজাদবনত হয়েছিলো, তার ইটগুলো রাতভর আমার উপর পতিত হতে থাকে। আমি ব্যাথায় কুকিয়ে উঠি। মুখ থেকে এমন চীৎকার বেরিয়ে আসে, যেনো মসজিদে আকসায় খুন হওয়া শিশুরা কান্নার সুরে আযান দিচ্ছে। তারা তোমাদের ডাকছে আমার পুত্রগণ! তারা আমাকে ডাকছে।…।
তোমাদের দাদা বার্ধক্যে কম্পমান হাত দুটো আমাকে দেখিয়ে বলতেন, আমি আমার যৌবন তোমাদের দিয়ে দিলাম। যে কাজ আমি করতে পারিনি, তা তোমরা সম্পন্ন করো। বাইতুল মুকাদ্দাস যাও। বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারই হয় যেনো তোমাদের জীবনের লক্ষ্য। ক্ষমতার মসনদে বসে যদি নিশ্চিন্তে-নির্বিঘ্নে জাতির উপর শাসন করার জন্য শত্রুকে উপেক্ষা করে চলো, তাহলে এই মসনদের আয়ু দীর্ঘ হবে না। শহীদদের আত্মা জিনের রূপ ধারণ করে তোমার ক্ষমতার মসনদ উল্টে দেবে। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টিই যেনো তোমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়।
আমার প্রিয় পুত্রগণ! আজ আমি আমার পিতার উত্তরাধিকার তোমাদের হাতে অর্পণ করছি। আজ থেকে তোমরা আমার নও- মিল্লাতে ইসলামিয়ার সন্তান। আমি তোমাদের মাকে বলে দিয়েছি, তোমার কোলে কোনো সন্তান জন্মলাভ করেছিলো, সে কথা ভুলে যাও। যদি না পারো, তাহলে অন্তত তাদের বেঁচে থাকার দুআ করো না। আমি তাদেরকে সেই জায়গায় জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছি, যেখানে হযরত ইবরাহীম (আ.) স্বীয় পুত্র ইসমাঈলকে আল্লাহর পথে কুরবান করতে গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন। দুআ যদি করতেই হয়, আল্লাহর সমীপে ফরিয়াদ জানাবে, এই সন্তানদের তুমি যে দুধপান করিয়েছে, তা যেনো নূরান্বিত রক্তে পরিণত হয়ে মসজিদে আকসার মেঝে ধৌত করে দেয়। আর আল্লাহকরুন, যেনো এমনই হয়। শপথ করো আমার পুত্রগণ! আমি যদি বেঁচে না থাকি, তাহলে তোমরা বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করবে।….
সুলতান আইউবী তাঁর পুত্রদ্বয়কে ১০৯৯ সালের রক্তাক্ত কাহিনী শোনান। শেষে যখন তিনি তাদের চলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন, তখন তারা সুলতানকে সে নিয়মে সালাম করেনি, যেভাবে পুত্ররা পিতাকে সালাম করে থাকে। তারা উঠে দাঁড়ায়। আল-আফজল বললো- মহান সুলতান! শুধু শহীদ হওয়া কোনো কৃতিত্ব নয়। আমরা শহীদ হওয়ার আগে বাইতুল মুকাদ্দাসের অলি-গলিতে দুশমনের এতো রক্ত প্রবাহিত করবো যে, আপনার ঘোড়ার পা পিছলে যাবে আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবো, আপনি মসজিদে আকসা থেকে ক্রুশটা নিজ হাতে খুলে ক্রুসেডারদের নাপাক রক্তের মাঝে ছুঁড়ে ফেলছেন।
আর সেই রক্ত নিরস্ত্র নাগরিকদের না হওয়া চাই আল-আফজাল! সুলতান আইউবী বললেন।
এই রক্ত বর্মপরিহিত ক্রুসেডারদের হবে- আল-আফজল বললো এই রক্ত সেই লোহা থেকে ঝরবে, যদ্বারা ক্রুসেডাররা তাদের দেহকে আবৃত করে রাখে। ঈমানের তরবারী মিথ্যার ইস্পাতকেও কেটে ফেলার ক্ষমতা রাখে।
আল্লাহ তোমার মুখ রক্ষা করুন। সুলতান আইউবী বললেন।
পুত্রগণ সামরিক কায়দায় পিতাকে সালাম করে বেরিয়ে যায়।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এখন বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে চল্লিশ মাইল দূরে রোম উপসাগরের তীরে আসকালানে সেই ব্যাঘ্রের ন্যায় ওঁৎ পেতে বসে আছেন, যে আপন শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত। আবেগের দিক থেকে তিনি এক্ষুনি বায়তুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রা করতে প্রস্তুত আছেন বটে; কিন্তু আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে তিনি যুদ্ধের বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। এই চল্লিশ মাইলের দূরত্বটা যেনো আগুন-গরম পাথরে পরিপূর্ণ। এ হচ্ছে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। শুধু নগরীটাই প্রাচীরঘেরা নয়- নগরীর চারদিকে দূর দূরান্ত পর্যন্ত অঞ্চলেও ছোট ছোট দুর্গ ও খৃস্টান বাহিনীর অসংখ্য চৌকি বিদ্যমান। টহল প্রহরার ব্যবস্থাও বাদ নেই। বাইতুল মুকাদ্দাসের পথে অশ্বারোহী সেনারা দলে দলে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। এখন এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগের তুলনায় বেশি শক্ত করা হয়েছে। বাইতুল মুকাদ্দাসের ভেতরে যে ফৌজ আছে, তার সেনাপতিরা সুলতান আইউবীর প্রতিটি গতিবিধি সম্পর্কে অবগত। কিন্তু তাদের এতোটুকু হিম্মত নেই যে, তারা সুলতান আইউবীকে আসকালানে প্রতিহত করবে কিংবা তার উপর জবাবী আক্রমণ চালাবে। হিত্তীন থেকে আসকালান পর্যন্ত সুলতান আইউবী তাদের সামরিক শক্তির অনেক রক্ত চুষে নিয়েছেন।
