আরাকার আমীর ছিলেন একজন ঈমানদার পুরুষ, যার সামরিক শক্তি খৃস্টানদের মোকাবেলায় কিছুই ছিলো না। তবু তিনি খৃস্টান সেনাপতিদের দাবি পূরণ করতে অস্বীকৃত জানান এবং তাদেরকে মোকাবেলার জন্য হুংকার ছাড়েন। খৃস্টান বাহিনী আরাকা অবরোধ করে ফেলে। ১০৯৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত আরাকার মুসলমানরা এমন প্রাণপণ মোকাবেলা করে যে, খৃস্টান বাহিনী বিপুল প্রাণহানির ক্ষতি মাথায় করে অবরোধ তুলে নিয়ে পথ পরিবর্তন করে সম্মুখে চলে যেতে বাধ্য হয়। সকল মুসলিম আমীর যদি নিজ নিজ এলাকায় বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসরমান খৃষ্টান বাহিনীকে এভাবে প্রতিহত করতো, তাহলে ফোঁটায় ফোঁটায় নিঃসরিত হয়ে খৃস্টানদের রক্ত পথেই নিঃশেষ হয়ে যেতো, তাদের বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যেতো এবং ইতিহাস ভিন্নভাবে রচিত হতো।
***
যা হোক, মুসলমান আমীরগণ খৃস্টানদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে নিরাপদে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়েছিলো। তার শাস্তি সেই মুসলমানরা ভোগ করে, যারা বাইতুল মুকাদ্দাসে বসবাস করছিলো। সে সময়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে যেসব মুসলিম পর্যটক অবস্থান করছিলেন, তারাও খৃষ্টানদের পদতলে নিস্পৃষ্ট হন। ১০৯৯ সালের ৭ জুন খৃস্টানরা এই মহান ও পবিত্র শহরটি অবরোধ করে। তখন বাইতুল মুকাদ্দাসের গবর্নর ছিলেন ইফতেখারুদ্দৌলা। তিনি পরম বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার সাথে শত্রুর মোকাবেলা করেন। মুসলিম সৈন্যেরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে খৃস্টানদের উপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু খৃস্টানদের সৈন্যসংখ্যা ছিলো যেমন অগণিত, তেমনি সরঞ্জামও ছিলো প্রচুর। ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই খৃস্টান বাহিনী শহরে ঢুকে পড়ে।
সমগ্র ইউরোপ ও সকল খৃস্টান রাজ্যে এই বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করা হয়। কিন্তু সবচে ভয়ংকর ও ভয়াবহ উৎসবটি পালিত হয় বিজিত বাইতুল মুকাদ্দাসে। খৃস্টান সৈন্যরা মুসলমানদের ঘরে ঘরে ঢুকে লুটপাট করে। কোনো গৃহে কাউকে- সে অশীতিপর বৃদ্ধ হোক কিংবা দুগ্ধপোষ্য শিশু- জীবিত ছাড়েনি। জীবিত রাখে শুধু সুন্দরী যুবতী মেয়েদের, যারা, পরে তাদের পাশবিকতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলো। অলি-গলিতে পলায়নপর মুসলিম শিশু, নারী ও পুরুষদেরকে অমানুষিক পন্থায় হত্যা করেছে। অবুঝ শিশুদেরকে জীবন্ত বর্শার আগায় গেঁথে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে উৎসবে মেতে ওঠেছে। প্রকাশ্যে নারীর সম্ভ্রমহানি এবং নিহতদের মাথা কেটে কেটে ফুটবল খেলেছিলো খৃস্টানরা।
অবশেষে মুসলমানরা একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে বের করে। তারা নিশ্চিত ছিলো, অন্তত এখানে গিয়ে আশ্রয় নিলে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে এবং যে কোনো ধর্মেরই অনুসারীরা এখানে তাদের উপর অত্যাচার করাকে পাপ মনে করবে। সে ছিলো মসজিদে আকসা। মুসলমানরা পরিবার-পরিজনসহ মসজিদে আকসায় চলে যায়। কিন্তু এখানে তারা পা রাখারও জায়গা পায়নি। তারা বাবে দাউদ ও অন্যান্য মসজেদ চলে যায়। স্বয়ং খৃস্টান ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, এই উদ্বাস্তু মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো প্রায় ৭০ হাজার। খৃস্টানরা যে মসজিদে আকসাকে তাদের উপাসনালয় দাবি করতো, তার মর্যাদার একবিন্দু তোয়াক্কাও তারা করেনি। তারা আশ্রয় প্রার্থীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একজনকেও জীবিত রাখেনি। মসজিদে আকসা, বাবে দাউদ এবং অন্য সকল মসজিদ লাশে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। রক্ত বেয়ে বেয়ে মসজিদের বাইরে গড়িয়ে পড়েছিলো। ঐতিহাসিকদের ভাষায়, খৃষ্টানদের ঘোড়ার পা গোড়ালি পর্যন্ত মুসলিম নাগরিকদের রক্তে ডুবে গিয়েছিলো।
মেয়েদেরকে মসজিদে মসজিদে এবং মুসলমানদের অন্যান্য পবিত্র স্থানে নিয়ে শ্লীলতাহানি করা হয়েছে। সবচে বেশি হতভাগ্য ছিলো এই মেয়েরা আর যুদ্ধবন্দিরা। বন্দিদের সঙ্গে পশুর ন্যায় আচরণ করা হয়েছে। তাদের আহার অল্প দেয়া হতো এবং কাজ বেশি নেয়া হতো। সেকালে যেসব কাজে উট-ঘোড়া ব্যবহার হতো, সেসব কাজে এই মুসলিম যুদ্ধবন্দিদের ব্যবহার করা হয়। তাদের হাতে মসজিদগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। যারা অস্বীকার করে, তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এক হিংস্র খৃস্টান এক যুদ্ধবন্দিকে হত্যা করে তার দেহের গোশত কেটে রান্না করে খায়। পরে সঙ্গীদের জানায়, গোশতগুলো খেতে বেশ স্বাদ লেগেছে। তারপর থেকে খৃস্টানরা মানুষ খেতে শুরু করে। যখন কোনো উৎসব কিংবা অনুষ্ঠান হতো, তারা সুস্থ-সবল মুসলমানদের ধরে এনে যবাই করে তাদের গোশত রান্না করে খেতো।
খৃস্টান ঐতিহাসিকগণ এসব ঘটনা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু স্বয়ং ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণই খৃস্টানদের মানবশোরর ঘটনা উল্লেখ করেছেন।
মসজিদগুলোকে অবৈধ কাজে ব্যবহার করা ছাড়াও খৃস্টানরা সেগুলোতে ঘোড়া বাঁধতো। মসজিদে আকসায় বিভিন্ন মুসলিম রাজা এবং সৌখিন পর্যটকগণ সোনা-চাদির ঝাড় ইত্যাদি স্থাপন করেছিলেন। উপহার হিসেবে প্রাপ্ত কয়েকটি সোনার বস্তু রাখা ছিলো। খৃস্টানরা সেসব সামগ্রী তুলে নিয়ে যায় এবং মসজিদের মিনারের উপর কুশ স্থাপন করে দেয়।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে বাইতুল মুকাদ্দাসের অবমাননা ও সেখানকার মুসলমানদের উপর অমানুষিক নির্যাতনের এই কাহিনী তাঁর পিতা নাজমুদ্দীন আইউব শৈশব থেকেই শোনাতে শুরু করেছিলেন। নাজমুদ্দীন আইউব উপাখ্যানটা শুনেছেন তার পিতা শাদীর নিকট। এই কাহিনী সুলতান আইউবীর রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো। এক সময়ে তিনি শপথ করে ফেলেন, যে কোনো মূল্যে বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করে ছাড়বেন। আজ যখন তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করতে বের হলেন, তার দুই যুবক পুত্র আল-মালিকুল আফজাল ও আল-মালিকুয যাহিরও তার বাহিনীতে রয়েছে। বাইতুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে যে কাহিনী তিনি স্বীয় পিতা থেকে শুনেছিলেন, সেসব নিজ পুত্রদেরও শুনিয়ে দেন, যেনো একটি মূল্যবান পৈতৃক সম্পত্তি বংশ পরম্পরায় হাত বদল হচ্ছে।
