***
বাইতুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে বিরাজ করছে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। এখানকার মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার-নিপীড়ন চলছিলো, তার তুলনা অন্তত ফিলিস্তীনের অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে নেই। এই নিপীড়নের ইতিহাস অনেক পুরনো। খৃস্টানরা ১০৯৯ সালে বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করেছিলো। মুসলমানদের অনৈক্য, ক্ষমতার মোহ ও গাদ্দারীর ফল ছিলো এটা। ইতিহাসে বহু হানাদার শক্তির এর চেয়েও অনেক বড় গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড দখলের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করে তাকে এতো অধিক গুরুত্ব প্রদান করে, যেনো তারা অর্ধেক দুনিয়া জয় করে ফেলেছে। সমগ্র ইউরোপ এমনকি সমগ্র খৃস্টজগত ও পৃথিবীর তাবৎ গীর্জার দৃষ্টি বাইতুল মুকাদ্দাসের উপর নিবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই গুরুত্বের এক কারণ ছিলো, খৃস্টানরা বাইতুল মুকাদ্দাসকে তাদের পবিত্র স্থান মনে করতো। তাদের বিশ্বাস মতে, হযরত ঈসাকে (আ.) এ অঞ্চলেরই কোথাও শূলিবিদ্ধ করা হয়েছিলো। আরেক কারণ, বাইতুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কেবলা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এখান থেকেই মিরাজে গমন করেছিলেন। এ কারণে মসজিদে আকসার গুরুত্ব ও মাহাত্ম খানায়ে কাবার চেয়ে কম ছিলো না। মুসলমানরা বাইতুল মুকাদ্দাসকে তাদের ধর্মীয় প্রাণকেন্দ্র মনে করতো। এখনও এটি আমাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রস্থল। খৃস্টানরা আমাদের এই কেন্দ্রটার উপর দখল প্রতিষ্ঠিত করে আমাদের বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনাকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে চেয়েছিলো। খৃষ্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হারমান ভুল বলেননি যে, এই ক্রুসেড যুদ্ধ মুসলমান ও খৃষ্টানদের রাজাদের লড়াই। এটা কালেমা ও কাবার লড়াই, যা সেদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যেদিন দুয়ের একটির পতন ঘটবে।
হিন্দুরা যেভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে, মুসলমানদের পরাজিত করাকে এবং যুদ্ধের ময়দানে তো বটে, যে কোনো অবস্থায় ধোকায় ফেলে হলেও মুসলমানদেরকে হত্যা করাকে ধর্মীয় কর্তব্য স্থির করে রেখেছে, তেমনি খৃষ্টানদের পাদ্রীরাও মুসলমানদের খুন করাকে পুণ্যের কাজ সাব্যস্ত করে রেখেছিলেন। খৃস্টানরা যুদ্ধের বিধান লাভ করতে পোপের (প্রধান পাদ্রী) নিকট থেকে। আপনারা পড়েছেন, হিত্তীনের যুদ্ধে আক্রার পাদ্রী সেই বড় কুশটি নিয়ে রণাঙ্গনে উপস্থিত ছিলেন, যাতে তাদের বিশ্বাস মতে হযরত ঈসাকে শূলিবিদ্ধ করা হয়েছিলো। এই ঘটনাই প্রমাণ করছে, কাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা করেছিলো গীর্জা এবং ক্রুসেড যুদ্ধ দুটি ধর্ম ও দুটি সভ্যতার লড়াই ছিলো।
ক্রুসেড যুদ্ধগুলোতে অংশগ্রহণকারী সম্রাট, সেনাপতি ও সাধারণ সৈনিক প্রত্যেকের থেকে বড় ক্রুশের উপর হাত রেখে ক্রুশের অফাদারী এবং জীবন ও সম্পদের কুরবানীর শপথ নেয়া হতো। এই শপথের কারণেই তাদেরকে সলীবি তথা ক্রুসেডার বলা হতো এবং বাইতুল মুকাদ্দাস রক্ষায় যেসব যুদ্ধ লড়া হয়েছিলো, সেগুলোকে ক্রুসেড যুদ্ধ আখ্যা দেয়া হয়েছিলো। খৃষ্টজগতে মুসলমান বিরোধী যুদ্ধ এবং আরব ভূখণ্ড দখল করাকে এমন উন্মাদনার রূপ দান করা হয়েছিলো, মহিলারা পর্যন্ত তাদের সঞ্চিত অর্থ-সম্পদ ও অলংকারাদি অকুণ্ঠচিত্তে গীর্জার হাতে অর্পণ করতে শুরু করেছিলো। এই উন্মাদনার চূড়ান্ত রূপ এই ছিলো যে, যুবতী মেয়েরা উদার মনে তাদের সম-সতীত্ব ক্রুশের বিজয় ও মুসলমানদের পরাজয়ের লক্ষ্যে উৎসর্গ করে দিয়েছিলো। মুসলমানদের চরিত্র ও চিন্তা-চেতনা ধ্বংসের জন্য যেভাবে প্রয়োজন গীর্জার পক্ষ থেকে খৃস্টান মেয়েদের ব্যবহার করার অনুমোদন দিয়ে রাখা হয়েছিলো। মেয়েদেরকে নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছিলো, গীর্জার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের খাতিরে সম্ভ্রম উৎসর্গকারী মেয়েরা স্বর্গ লাভ করবে।
এই বিশ্বাসেরই অনুকূলে রূপসী খৃস্টান মেয়েদেরকে নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে প্রেরণ করা হয়েছিলো। এরা মুসলিম আমীরদের হেরেমে ঢুকে গিয়ে একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করে, যার বিস্তারিত কাহিনী আপনারা পেছনে পড়ে এসেছেন। তাদেরই কারসাজিতে মুসলমানরা পরস্পর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং খৃস্টানদের পাতা এই সুদৃশ্য ফাঁদে এমনভাবে আটকে যায় যে, তারা আপন চিন্তা-চেতনা, স্বকীয়তা ও বোধ-বিশ্বাসকে ছুঁড়ে ফেলে সিংহাসনের জন্য পাগল হয়ে যায়। তারা তাদের ঈমান নিলাম করে দেয়। তবে তারপরও এমন কিছু লোক অবশিষ্ট থাকে, যাদের আত্মা ঈমানের আলোতে আলোকিত ছিলো। তারা বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারে রক্তের নজরানা দিতে থাকে। কিন্তু নিয়তির অমোঘ বিধান হচ্ছে, একজন গাদ্দারই সমগ্র জাতিকে আত্মমর্যাদাহীন করে তোলার জন্য যথেষ্ট। আর সেই গাদ্দার যখন ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়, তখন তার শত্রু অপেক্ষা দশগুণ বেশি সৈন্যও পরাজয়বরণ করে।
মুসলিম শাসকদের এই গাদ্দার চরিত্রেরই ফলে ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই মোতাবেক ৪৯২ হিজরীর ২৩ শাবান খৃষ্টানরা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিতে সক্ষম হয়। খৃস্টানদের এই বিজয়ে যেসব মুসলিম আমীর ও শাসক খৃস্টানদেরকে সহযোগিতা দান করে এবং যেভাবে করে, সে এক দীর্ঘ ও লজ্জাকর উপাখ্যান। উপমাস্বরূপ এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, খৃস্টান বাহিনী যখন বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিলো, তখন শাহজার আমীর তাদের প্রতিহত করা থেকে বিরত থেকেই ক্ষান্ত হননি; বরং তাদেরকে রসদ সরবরাহ করেন এবং গাইড দিয়েও সহযোগিতা করেন। হামাত-ত্রিপোলীর আমীরগণও খৃস্টান বাহিনীকে নিরাপদ রাস্তা, রসদ ও উপঢৌকন দিয়ে তাদের প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাস দখলের জন্য রওনা করিয়ে দিয়েছিলেন। পথে তাদের আরো কয়েকটি মুসলিম রাজ্য অতিক্রম করতে হয়েছিলো। তারা তাদের রাজ্য ও ক্ষমতার নিরাপত্তার খাতিরে খৃস্টানদের চিত্তাকর্ষক ও সুদৃশ্য উপঢৌকন সাদরে গ্রহণ করে এবং খৃস্টান বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহ করে।
