সুলতান আইউবী গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট মোতাবেক বাইতুল মুকাদ্দাস অবরোধের পরিকল্পনা প্রণয়নে আত্মনিয়োগ করেন।
৮.৫ বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়
বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়
সমুদ্রের নিঃসঙ্গ ও নিরানন্দ জীবনে মেয়ে দুটো আল-ফারেসকে নব জীবন দান করতে শুরু করেছে। কিন্তু একদিকে মেয়ে দুটো যেমন আল ফারেসের জন্য রহস্যময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তেমনি আল ফারেসও তাদের কাছে এক বিস্ময়কর পুরুষে পরিণত হয়েছেন। মেয়েরা বলেছিলো, তারা যাযাবর। তাদের গোত্রের সব মানুষ যুদ্ধের কবলে পড়ে মারা গেছে এবং তারা অনেক কষ্টে লুকিয়ে লুকিয়ে নদীর তীর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। কিন্তু আল-ফারেস দেখতে পাচ্ছেন, তাদের স্বভাব-চরিত্র, চলন-বলন ও রীতি-নীতি যাযাবরদের মতো নয়। যাযাবর মেয়েরা রূপসী হতে পারে; কিন্তু এদের মধ্যে যে রুচিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে না। তাছাড়া এদের মধ্যে যেটুকু অশ্লীলতা দেখা যাচ্ছে, যাযাবর মেয়েরা সাধারণত এমন বেহায়া হয় না।
মেয়েদের জন্য আল-ফারেস এক বিস্ময়কর পুরুষ। তাদের আশা ছিলো, তিনি তাদের সঙ্গে সেই আচরণই করবেন, যেমনটি অন্য পাঁচ দশজন মুসলমান করেছিলো। ফলে মেয়ে দুটো প্রথম প্রথম নিরাশই হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা আল-ফারেসের অন্য একটি দুর্বলতা আন্দাজ করে নেয়। তা হচ্ছে, নোকটা দায়িত্বের ক্ষেত্রে যতোটা কর্তব্যপরায়ণ, অবসরে ততোটা অবোধ শিশুতে পরিণত হয়ে যান। তিনি মেয়েদের সঙ্গে সমবয়সী বান্ধবীর ন্যায় খেলতে শুরু করেন এবং তাদের রূপ-লাবণ্য থেকে স্বাদ উপভোগ করেন। তিনি তাদের বিক্ষিপ্ত রেশমি চুলে বিলি কাটেন, তাদের মাঝে হারিয়ে গিয়ে দুনিয়ার কথা ভুলে যান।
একদিনের ঘটনা। এক মেয়ে আর আল-ফারেন্স কক্ষে উপবিষ্ট। অপরজন বাইরে কোথাও গেছে। মেয়েটি আল-ফারেসের চেতনাকে উত্তেজিত করতে কিংবা লোকটার মধ্যে চেতনা বলতে কিছু আছে কিনা, জানবার চেষ্টা করে। আল-ফারেস তার খোঁচাটা বুঝে ফেলে বললেন–প্রথম দিন যখন আমি তোমাদেরকে বলেছিলাম, আমি জাহাজে তোমাদেরকে আশ্রয় দিতে পারি, তখন তোমরা বলেছিলে, দয়া করে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করবেন না। আমি বলেছিলাম, তোমাদেরকে মিসর নিয়ে যাবো এবং বিয়ে করবো। আমি আমার সেই প্রতিশ্রুতির উপর অটল থাকতে চাই। বিবাহ না করা পর্যন্ত আমি তোমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করবো না, যা থেকে তোমাদের মনে সন্দেহ জাগ্রত হবে। আমি সাময়িকভাবে মনোরঞ্জনের জন্য তোমাদেরকে এখানে এনেছি। আমি তোমাদের অসহায়ত্ব থেকে লাভবান হতে চাই না। মিসর রওনা হওয়া পর্যন্ত তোমরা চিন্তা করো। যদি আমার সঙ্গে থাকা পছন্দ না করো, তাহলে যেখানে বলবে পৌঁছিয়ে দেবো।
সহসা মেয়েটি আবেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে আল-ফারেসের গলা জড়িয়ে ধরে এবং তার গালে নিজ গালের পরশ বুলিয়ে বলে ওঠে আমরা তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। তোমাকেই প্রথম পুরুষ পেলাম, যার হৃদয়ে মানবতার পবিত্রতা আছে এবং যার মনোজগত শয়তানি চরিত্র ও পশুত্ব থেকে মুক্ত।
মেয়েটি এমন ভাষায় ও এমন ধারায় প্রেম নিবেদন করে যে, পানির উপর সন্তরমান জাহাজটা আল-ফারেসের নিকট শূন্যে উড়ে বেড়াচ্ছে বলে মনে হলো। এটিই তার দুর্বলতা, মানবীয় স্বভাবের সবচে বেশি বিপজ্জনক দোষ। দীর্ঘ সময় দিনরাত সমুদ্রে টহল দান এবং মাঝে-মধ্যে ছোটখাটো সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার ফলে তার দেহে যে ক্লান্তি ও হৃদয়ে যে অবসাদ নেমে এসেছিলো, এক রূপসী যুবতীর দেহের পরশ ও প্রেম নিবেদনে সব দূর হয়ে গেছে। আল-ফারেসের দেহ-মন এখন চাঙ্গা ও ঝরঝরে। এখন দায়িত্ব তার আগের তুলনায় বেশি। হাতে ছয়টি জাহাজের কমান্ড এবং ফিলিস্তীন কূলের সামান্য দূরে সতর্ক টহল দিয়ে ফিরছেন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বিদ্যুতের ন্যায় ফিলিস্তীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং তীরবর্তী অঞ্চলগুলো দখল করে নিয়েছেন। আর এখন আসকালানে এসে বাইতুল মুকাদ্দাস দখলে প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। আল-ফারেসের দায়িত্ব, সমুদ্র পথে খৃস্টানদের জন্য কোনো সাহায্য কিংবা রসদ ইত্যাদি আসলে তাকে তীর পর্যন্ত পৌঁছুতে না দেয়া। এই দায়িত্ব তার ঘুম হারাম করে রেখেছে। এখন মেয়ে দুটো তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
আল-ফাবেস একদিন মেয়ে দুটোকে বললেন- তোমাদের মধ্যে যাযাবরের স্বভাব নেই। তার স্থলে আমি তোমাদের মাঝে ভদ্রতা ও সামাজিকতা দেখতে পাচ্ছি। এসব কোথা থেকে আসলো?
আমরা উচ্চমানের খৃস্টান পরিবারে চাকুরি করেছি- এক মেয়ে উত্তর দেয়- তারা আমাদেরকে আতিথেয়তার রীতি-নীতি এবং উঁচু স্তরের মেহমানদের সঙ্গে আচার-ব্যবহারের পন্থা-পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। আপনি যদি সাধারণ মানুষ হতেন, তাহলে আপনার সঙ্গে যাবাবরের ন্যায়ই আচরণ করতাম। আমাদের কথা-বার্তা ও চাল-চলন যাযাবরেরই মতো হতো। আপনি একটি দেশের নৌ-বাহিনীর এতো বড় একজন কমান্ডার এবং আপনার হৃদয়ে আমাদের এতো অধিক ভালোবাসা যে, আমরা আপনার সঙ্গে গেঁয়োর ন্যায় আচরণ করতে পারি না।
অপর পাঁচ জাহাজের ক্যাপ্টেনগণ জেনে গেছেন, তাদের কমান্ডার আল-ফারেস নিজ জাহাজে দুটি মেয়ে নিয়ে এসেছেন। শুনে সবাই মুখ টিপে হাসেন ও টিপ্পনি কাটেন। কিন্তু সবাই অনুভব করেন, যুদ্ধের সময় জাহাজে অচেনা-অপরিচিত মেয়েদের রাখা নিরাপদ নয়। প্রয়োজন হলে নিজ স্ত্রীকেই তো রাখা যায়। তারা বিষয়টি নিয়ে আল-ফারেসের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেন। আল-ফারেস তাদের আশ্বস্ত করে দেন যে, কোনো সমস্যা হবে না। এদেরকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে মাত্র। সকলে জানেন, আল-ফারেস চরিত্রহীন মানুষ নন এবং কর্তব্যপরায়ণ কমান্ডার। আল ফারেসের উত্তরে তারা সহজেই সন্দেহমুক্ত হয়ে যান।
