খানিক পর অনেকগুলো উটের দীর্ঘ এক সারি এসে দাঁড়িয়ে যায়। আরোহীরা শ দুয়েক মেয়ে।
এ কী? সুলতান আইউবী পরম বিস্ময়ের সাথে রোজি খাতুনকে জিজ্ঞেস করেন।
আহতদের সেবা-চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকটি মেয়ে- রোজি খাতুন উত্তর দেন- আমি এদেরকে যুদ্ধেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছি। তীরন্দাজির বেশ অনুশীলন আছে। আমি জানি, তুমি মেয়েদেরকে যুদ্ধের ময়দানে দেখতে চাও না। কিন্তু আমার ও এদের জযবা বিনষ্ট করার চেষ্টা করে না। তুমি জানো না, সিরিয়ায় তরুণীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কতো কষ্টকর হয়ে ওঠেছে। যে কোনো মেয়ে যুদ্ধের ময়দানে চলে যাওয়ার জন্য অস্থির উদগ্রীব। তুমি অনুমতি দিলে আমি এক হাজার মেয়েকে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দেবো। তারা পুরুষ সৈনিকদের ন্যায় লড়াই করবে। এখানে যারা যুদ্ধ করছে, তাদের মায়েরা তাদের নিরাপত্তা নয়- জয়ের সংবাদ শুনতে অপেক্ষা করছে। লোকালয়ে একই কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে- সংবাদ কী? বলল সালাহুদ্দীন কতো মেয়ে পাঠাবো?
আমি এদেরকে আমার সঙ্গে রেখে দেবো- সুলতান আইউবী বললেন- আর কাউকে পাঠাবেন না।
উটের পিঠে করে আমি একটি মিম্বর এনেছি- রোজি খাতুন বললেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখে অশ্রু নেমে আসে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন- তোমার বোধ হয় মনে নেই, আমার মরহুম স্বামী নুরুদ্দীন জঙ্গী এই শপথ নিয়ে মিম্বরটি তৈরি করিয়ে নিজের কাছে রেখেছিলেন যে, বাইতুল মুকাদ্দাসকে ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুক্ত করে এটি মসজিদে আকসায় স্থাপন করবেন। অনেক সুন্দর মিম্বর। দামেশকে রাখা ছিল। আমি বহন করে এনেছি। আল্লাহ তোমাকে বিজয় দান করুন সালাহুদ্দীন। আমি দেখার অপেক্ষায় আছি, তুমি এই মিম্বরকে মসজিদে আকসায় স্থাপন করে আমার মরহুম স্বামীর শপথ পূরণ করেছে।
সুলতান আইউবী আপ্লুত হয়ে ওঠেন। তার দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললেন- আল্লাহ যেনো এই শপথ আমার দ্বারা পূর্ণ করান।
এক যুবতী মেয়ে সুলতানের সন্নিকটে এসে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে সুলতানকে সালাম করে। রোজি খাতুন বললেন- চেনোনি? আমার কন্যা শামসুন্নিসা। সুলতান আইউবী মেয়েটাকে যখন দেখছিলেন, তখন ও অনেক ছোট ছিলো।
শামসুন্নিসা তোমার সঙ্গে ময়দানে থাকবে- রোজি খাতুন বললেন মেয়ে সৈনিকরা তার কমান্ডে কাজ করবে। আমাকে ফিরে যেতে হবে।
***
সুলতান আইউবীর নিকট যে আলেম-দরবেশগণ এসেছিলেন, তারা ইবাদত-বন্দেগী, তাসবীহ-তাহলীল, জিকির-অযীফা ও দুআ-দরূদে নিমগ্ন। মাঝে-মধ্যে সৈনিকদের মাঝে ঘোরাফেরা করছেন এবং তাদের জিহাদী চেতনাকে শাণিত করার চেষ্টা করছেন। আসকালানের বাইরে যেখানে সৈনিকরা ডিউটি করছে, তারা সে পর্যন্তও ঘুরে এসেছেন। তাদের। ভাষণ-বক্তৃতার সারমর্ম মোটামুটি এরূপ
নব্বই বছর যাবত কাফেররা তোমাদের প্রথম কেবলা দখল করে আছে। কুরআন অধ্যয়ন করলে বুঝতে পারবে, প্রথম কেবলাকে কাফেরদের নাপাক কজা থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত কোনো মুসলমানের ঘুম আসার কথা নয়। যে মসজিদে আকসা থেকে আমাদের প্রিয়নবী আল্লাহর আমন্ত্রণে মিরাজে গমন করেছিলেন, সেটি এখন কাফেরদের উপাসনালয়ে পরিণত। রাসূলে মকবুল (সা.)-এর পবিত্র আত্মা আমাদেরকে অভিশম্পাত করছে। আহার-নিদ্রা, স্ত্রী সব আমাদের জন্য হারাম হয়ে যাওয়া দরকার ছিলো। কিন্তু নব্বইটি বছর যাবত আমরা গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছি এবং ভোগ-বিলাসিতায় লিপ্ত রয়েছি।
আল্লাহর সৈনিকগণ! ইহুদী-খৃস্টাদের সুদর্শন চক্রান্তজালে ফেঁসে আমাদের শাসকগণ তাদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলো, যারা প্রথম কেবলাকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। বাইতুল মুকাদ্দাস সেই পবিত্র ভূমি, যেখানে আমাদের প্রিয়নবীর মুবারক পা পড়েছিলো এবং তাঁর পবিত্র কপাল সিজদা করেছিলো। হযরত ইরবাহীম ও হযরত সুলায়মানসহ (আ.) না জানি কতত নবী-রাসূল এখানে ইবাদত করেছিলেন। কিন্তু নব্বইটি বছর যাবত এখানকার মুসলমানদের উপর যে বিভীষিকা চলছে, সেই চিত্র তোমরা নগরীতে প্রবেশ করে দেখে নিও। মসজিদে আকসার উপর ক্রুশ দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদগুলা ঘোড়ার আস্তাবলে পরিণত হয়ে আছে। মুসলমানদের এমন গণহত্যা হয়েছে যে, নগরীর অলি-গলিতে রক্তের নদী বইয়ে গেছে। মুসলমানরা বন্দিত্বের জীবন-যাপন করছে এবং মেয়েরা কাফেরদের দাসীতে পরিণত হয়ে আছে।
হে ইসলামের জানবাজ সৈনিকগণ! আল্লাহ তোমাদের বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত ও পবিত্র করার সৌভাগ্য দান করেছেন। তোমাদের ভাগ্য প্রসন্ন যে, তোমরা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর আমলে জন্ম নিয়েছে। তোমরা যদি ব্যর্থ হও, তাহলে সেখান থেকে তোমাদের লাশ তুলে আনা হবে। আর তোমরা শুনে বিস্মিত হবে, যে বাইতুল মুকাদ্দাসে হযরত ঈসা (আ.) প্রেমের পাঠ শিখিয়েছিলেন, সেখানে ক্রুসেডাররা জঘন্যতম নিষ্ঠুরতার মহড়া দিচ্ছে। শুনলে তোমাদের কান্না পাবে, আবেগ উথলে উঠবে, কোনো যুদ্ধে জয়লাভ করলে খৃস্টানরা বাইতুল মুকাদ্দাসে উত্সবের আয়োজন করে থাকে। সেই উৎসবে তারা আমাদের যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে বিবস্ত্র করে নাচায় এবং সুঠাম সুদেহী মুসলিম যুবকদের জবাই করে তাদের গোশত রান্না করে খায়। আজ তোমাদেরকে প্রতিজন নিরপরাধ মজলুম মুসলমানের প্রতি ফোঁটা রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে। সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী মসজিদে আকসায় স্থাপন করার জন্য একটি মিম্বর তৈরি করিয়ে রেখেছিলেন। এখন তাঁর বিধবা সেটি এখানে এনে দিয়ে গেছেন। এই বিদূষী বীর মহিলা দুশ মেয়ে নিয়ে বহুদূর থেকে এসেছেন। নুরুদ্দীন জঙ্গীর স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে পূরণ করতেই হবে।
