তোমরা এখানে আসলে কীভাবে? মাঝি জিজ্ঞেস করে।
দৈবক্রমে- এক মেয়ে উত্তর দেয়- হারমান ধরা পড়েছেন। মেয়েটি লোকটাকে পূর্ণ ঘটনা শোনায় এবং আল-ফারেস সম্পর্কে জানায়, তিনি আমাদেরকে যাযাবর মনে করে আশ্রয় দিয়েছেন।
কিছু ভেবেছো, কী করবে?- মাঝি জিজ্ঞেস করে- যাবে কোথায়?
আপাতত জান বাঁচানোর ব্যবস্থা করেছি- মেয়েটি উত্তর দেয়- আমরা কমান্ডার আল-ফারেসের মন-মস্তিষ্ক কজা করে ফেলেছি। সুযোগ পেলেই পালাবার চেষ্টা করবো। তবে তুমি দিক-নির্দেশনা দিলে এখানে থেকেই অন্য কিছু করতে পারি।
গরীববেশী এই ব্যবসায়ী মাঝিটা ক্রুসেডারদের গুপ্তচর এবং মেয়েদেরকে ভালো করে জানে। মেয়েরাও তাকে বেশ চিনে। সে বললো, কূলে অবতরণ করে পালাবার চেষ্টা করো না। অন্যথায় শোচনীয় মৃত্যুর সম্মুখীন হবে। বৈরুত পর্যন্ত মুসলমানদের দখল প্রতিষ্ঠি হয়ে গেছে। আমাদের খৃস্টান সৈনিরা প্রতিটি স্থান থেকে পিছু হটে যাচ্ছে। একটিমাত্র অঞ্চল টায়ের অবশিষ্ট আছে, যেখানে আমাদের আশ্রয় মিলতে পারে। এখনো এই জাহাজেই থাকো। আমি তোমাদের খোঁজ-খবর নেবো। পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠেছে। সর্বত্র মুসলিম সৈনিকরা গিজ গিজ করছে।
তুমি এখানে কী করছো?
ক্রুশের গায়ে হাত রেখে যে শপথ নিয়েছিলাম, তা পূর্ণ করার চেষ্টা করছি- মাঝি উত্তর দেয়- এই ছয়টি রণতরীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। এগুলো ধ্বংস করার ব্যবস্থা করবো।
নিজেদের তরী কোথায়?
টায়েরের নিকটে- মাঝি উত্তর দেয়- এই বহর যদি সেদিকে রওনা হয়, তাহলে আগে-ভাগে সংবাদ বলে দেবো। ভাগ্যক্রমে তোমরা এখানে এসে পৌঁছে গেছে। এ কাজে তোমরা আমাকে সাহায্য করতে পারবে। আমিও তোমাদেরকে এখান থেকে বের করে টায়ের পৌঁছিয়ে দিতে পিরবো। আচ্ছা, এবার আমাকে যেতে হবে। সংকেত ঠিক করে নাও। আমি এই জাহাজগুলোর সঙ্গে ছায়ার ন্যায় লাগা আছি। এই জাহজ যেখানেই নোঙ্গর ফেলবে, আমি এই বেশে সেখানে হাজির হয়ে যাবো।
তারা সংকেত ঠিক করে নেয়। মেয়েরা লোকটির টুকরি থেকে কিছু জিনিস নিয়ে দাম দিয়ে দেয়। লোকটি টুকরি মাথায় করে সিঁড়ি বেয়ে, ডিঙ্গিতে নেমে পড়ে।
***
১১৮৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সুলতান আইউবী আরো একটি বিখ্যাত উপকূলীয় শহর আসকালান অবরোধ করেন। এখানেও ভারি পাথর নিক্ষেপকারী মিনজানিক ব্যবহার করা হয়। সুরঙ্গ খননকারী বাহিনী রাতে প্রাচীর ভাঙার চেষ্টা করতে থাকে। নিকটেই একটি উঁচু জায়গা ছিলো। সেখান থেকে মিনজানিকের সাহায্যে শহরের ভেতরে পাথর ও অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করা হয়। দ্বিতীয় দিনই অবরুদ্ধরা নগরীর ফটক খুলে দেয় এবং অস্ত্র সমর্পণ করে।
১১৫৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ফ্রিং এই নগরীটা দখল করেছিলেন। পুরো চৌত্রিশ বছর পর শহরটি আবার স্বাধীন হলো।
আসকাল থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস চল্লিশ মাইল পূর্বে অবস্থিত। দূরত্বটা সুলতান আইউবীর দ্রুতগামী বাহিনী জন্য দুদিনের পথ। তাঁর কোনো কোনো ইউনিট ও গেরিলা বাহিনী আগেই বাইতুল মুকাদ্দাসের নিকটে পৌঁছে গিয়েছিলো। তারা ক্রুসেডারদের বাইরের চৌকিগুলো ইতিমধ্যেই ধ্বংস করে দিয়েছে। জীবনে রক্ষাপাওয়া অবশিষ্ট খৃস্টান সৈন্যরা বাইতুল মুকাদ্দাস পৌঁছাচ্ছে। সুলতান আইউবী তাঁর বিক্ষিপ্ত বাহিনীগুলোকে আসকালানে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাস আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
সুলতান আইউবীর অব্যাহত জয় এবং ঝড়গতির অগ্রযাত্রার সংবাদ দামেক, বাগদাদ, হাব, মসুল এবং ওদিকে কায়রো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ- যিনি এসব আক্রমণ অভিযানে সুলতান আইউবীর সঙ্গে ছিলেন তার রোজনামচায় লিখেছেন, লাগাতার জয়ের ফলে সুলতান আইউবীর বাহিনী ক্লান্তির কথা ভুলেই গিয়েছিলো। তারা একের পর এক অঞ্চল জয় করছিলো আর বিজিত অঞ্চলের মুসলমানদের করুণ অবস্থা দেখে দেখে বাইতুল মুকাদ্দাসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে অধিক থেকে, অধিকতর উদগ্রীব হয়ে উঠছিলো। এ-ই তো ছিলো সুলতান আইউবীর সামরিক শক্তি। কাজী বাহাউদ্দীন আরো লিখেছেন, আসকালানে সুলতান আইউবীর নিকট রূহানী শক্তিও পৌঁছুতে শুরু করেছিলো। তারা হলেন দামেশক, বাগদাদ ও অন্যন্য বড় বড় শহরের আলেম, দরবেশ ও সুফীগণ। তারা সুলতান আইউবীর সাথে বাইতুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করতে– এসেছিলেন। তারা এসে সুলতান আইউবীকে দুআ দেন এবং তার বাহিনীকে বাইতুল মুকাদ্দাসের গুরুত্ব ও পবিত্রতা অবহিত করেন। মুসলিম বাহিনীকে উত্তেজিত করে তোলেন। সুলতান আইউবী আলেম-দরবেশদের বেশ শ্রদ্ধা করতেন। এবার তাদেরকে সঙ্গে পেয়ে তার ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন- এবার পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাকে পরাজিত করতে পারবে না।
আসকালান থেকে রওনা হওয়ার চার দিন আগে সুলতান আইউবীর নিকট হাব থেকে একজন মেহমান আসেন, যাকে দেখে সুলতান বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মেহমান নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিধবা রোজি খাতুন। রোজি খাতুন ঘোড়ায় চড়ে এসেছেন। ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে দৌড়ে গিয়ে সুলতান আইউবীকে জড়িয়ে ধরেন। দুজনেরই আবেগ উথলে ওঠে। দুজনই ভারাক্রান্ত হয়ে যান।
