আমরা সবদিক থেকে প্রস্তুত হয়ে এসেছি। আল-ফারেস উত্তর দেন।
বৃহৎ যুদ্ধেরও সম্ভাবনা আছে- সুলতান আইউবী বললেন ক্রুসেডাররা হিত্তীনে যে পরাজয় বরণ করেছে এবং যেরূপ শোচনীয়ভাবে পলায়ন করেছে, তা খৃষ্টজগতের জন্য এক অসাধারণ ঘটনা। তাদের চার চারজন সম্রাট আমার হাতে বন্দি। একজনকে আমি হত্যা করেছি। রেমন্ড মরে গেছে। তাদের অতিশয় যোগ্য ও দুঃসাহসী সম্রাট বল্ডউইনও মারা গেছে। তার ফিরিঙ্গিরা বিশাল এক শক্তি। কায়রো থেকে আলী বিন সুফিয়ান সংবাদ প্রেরণ করেছে, ইংল্যান্ডের সম্রাট রিচার্ড এবং জার্মানীর সম্রাট ফ্রেডারিক ফিলিস্তীনে ক্রুশের রাজত্ব অটুট রাখার লক্ষ্যে নিজ নিজ বাহিনী ও নৌ-বহরসহ আগমনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তারা আসলে পরে সিদ্ধান্ত নেবো, তাদেরকে ডাঙ্গায় আসতে দেবো, নাকি নদীতেই প্রতিহত করার চেষ্টা করবো। শুনেছি, ইংল্যান্ডের নৌ-বাহিনী নাকি অনেক শক্তিশালী। সংবাদ পেয়েছি, তারা বারুদ প্রস্তুত করে এমন খোলসে ভরে নিয়েছে, যেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিলে উড়ে এসে জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমি এ জাতীয় খোলস সংগ্রহ করে এরূপ অস্ত্র তৈরি করে নেয়ার চেষ্টা করবো। যা হোক, তুমি তোমার জাহাজগুলোকে কূলের কাছাকাছি রাখবে। নৌ-বাহিনী প্রধান আবদুল মুহসিন সমুদ্রে ঘুরে বেড়াবে।
আল-ফারেস প্রয়োজনীয় সব দিক-নির্দেশনা গ্রহণ করে বিদায় নিয়ে চলে যান। রেখে আসা নৌকা তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। নিজের জাহাজে পৌঁছে অন্যান্য জাহাজের কাপ্তানদের তলব করেন। তাদেরকে জরুরি নির্দেশনা প্রদান করে বিদায় করে দেন। নিজে আপন কেবিনে চলে যান, যেখানে আশ্রিতা মেয়ে দুটো তার অপেক্ষায় বসে আছে। অত্যন্ত সরল-সোজা সেজেছে মেয়েগুলো। কিছুই জানে না ভান ধরে জিজ্ঞেস করে, আপনারা সমুদ্রে কী করেন? আল-ফারেস অনেক দিন যাবত সমুদ্রে নিরানন্দ জীবন-যাপন করছেন। আজ একটু হাসি-আনন্দের পরিবেশ পেয়েছেন। পুরুষদেরকে আঙুলের ইশারায় নাচানোর দীক্ষা মেয়ে দুটোর আছে।
১১৮৭ সালের ২০ জুলাই সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আক্ৰা ত্যাগ করেন। তাঁর গেরিলা সৈনিকরা তার জন্য পথ পরিষ্কার করে রেখেছে। সমুদ্রের কূলবর্তী কয়েকটি দুর্গ ও জনপদ তিনি জয় করে ফেলেছেন। ৩০ জুলাই তিনি বৈরুত অবরোধ করেন। খৃস্টানরা তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ নগরীটা রক্ষা করার অনেক চেষ্টা করে। কিন্তু সুলতান আইউবী পরম ত্যাগের বিনিময়ে নগরীটা দখল করে ফেলেন। আক্রার মুসলমানদের ন্যায় : করুণ অবস্থা এখানকার মুসলমানদেরও।
২৯ জুলাই নাগাদ বৈরুতের শাসনক্ষমতা সুসংহত করে সুলতান আইউবী আরেক বিখ্যাত উপকূলীয় শহর টায়ের অভিমুখে যাত্রা করেন। সুলতান গোয়েন্দা রিপোর্ট ব্যতীত অগ্রযাত্রা করতেন না। তাকে অবহিত করা হলো, আপনার ফৌজ অনেক বেশি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এদিক-ওদিক পলায়নকরা খৃস্টান সৈন্যরা টায়েরে একত্রিত হয়ে সংগঠিত হচ্ছে। সকল ফিরিঙ্গিও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে পিছপা হয়ে টায়ের চলে গেছে। সুলতান আইউবী টায়ের আক্রমণ মুলতবী করে দেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসের জন্য সৈন্যদের বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন।
এ সময়ে আল-ফারেস বায়দারীনের নৌ-জাহাজটি কূল থেকে দূরে দূরে টহল প্রদান করতে থাকে। মেয়ে দুটোও তার জাহাজে অবস্থান করছে। ইতিমধ্যে তারা আল-ফারেসের হৃদয়ে জেঁকে বসতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আল-ফারেস কর্তব্যে অবহেলা করছেন না। একটা নিয়ম আছে, যখনই কোনো রণতরী কূলে এসে নোঙ্গর ফেলে, সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট অনেক নৌকা তার চারদিকে ঘুরতে শুরু করে। এগুলো গরীব পল্লীবাসীদের নৌকা। তারা নৌকায় করে এসে নানা রকম ফল-মূল, ডিম, মাখন ইত্যাদি মাল্লা ও সৈনিকদের নিকট বিক্রি করে থাকে। জাহাজের কাপ্তানরা তাদের কাউকে কাউকে রশির সিঁড়ি ফেলে জাহাজে তুলে নিয়ে তাদের থেকে স্থল জগতের খবরাখবর সংগ্রহ করেন।
একদিন আল-ফারেসের জাহাজ কূলে এসে ভিড়ে। স্থল বাহিনীর কোনো এক কমান্ডারের সঙ্গে তার কথা বলার প্রয়োজন। মেয়ে দুটো ছাদের উপর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ছোট তিনটি নৌকা এগিয়ে আসে। সেগুলোতে ফল ইত্যাদি পণ্য দেখা যাচ্ছে। তাদের থেকে কিছু ক্রয় করার জন্য তারা জাহাজের লোকদের নিকট অনুনয় করতে শুরু করে। এক নৌকায় মাঝবয়সী এক বৃদ্ধ ছিলো। লোকটির গায়ে গেঞ্জি ছাড়া আর কিছু নেই। নিতান্ত গরীব মনে হচ্ছে। সে দুটো মেয়েকে দণ্ডায়মান দেখে নৌকা জাহাজের একেবারে নিকটে নিয়ে আসে।
কিছু নিন না শাহজাদী!- লোকটি বিনয়ের সুরে বললো- আমরা নিতান্ত গরীব মানুষ। আপনাদের মতো লোকদের দয়ায়ই তো আমরা বাঁচি।
মেয়েরা তার দিকে গভীর চোখে তাকালে সে বাঁ চোখে হাল্কা একটু ইঙ্গিত করে। উভয় মেয়ে খানিক বিস্মিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকায়। লোকটি এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে একটি আঙুল বুকের উপর উপর-নীচ ও ডান-বাম করে ক্রুশের চিত্র আঁকে। এক মেয়ে নিজের ডান হাতের তর্জনী বাঁ হাতের তর্জনীর উপর আড়াআড়ি রেখে ক্রুশ তৈরি করে। বৃদ্ধ মুচকি হাসে। এক মেয়ে জাহাজের মাল্লাদের বললো, ঐ লোকটাকে উপরে তুলে আনো।
মাল্লাদের জানা আছে, এই মেয়ে দুটোর মালিক জাহাজের কাপ্তান, যিনি সবকটি জাহাজের কমান্ডার। তারা সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি ফেলে। বৃদ্ধ টুকরিতে বিভিন্ন পণ্য ভরে উপরে নিয়ে আসে এবং টুকরিটা মেয়েদের সম্মুখে রাখে। মেয়েরা নেড়ে-চেড়ে পণ্য দেখতে শুরু করে। অন্য কারো তাদের কাছে ঘেঁষবার সাহস নেই।
