সুলতান ঘটনাটা বিস্তারিত শোনেন। বিক্ষুব্ধ কমান্ডারের অভিযোগ অনুযোগও ধৈর্য সহকারে শ্রবণ করেন। সকলে আশঙ্কা করেছিলো, সুলতান তাকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করবেন। কিন্তু না, সুলতান লোকটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভেতরে নিয়ে যান। তাকে শরবত পান করান এবং বুঝিয়ে দেন, আমাদের উদ্দেশ্য খৃষ্টানদের হত্যা করা নয়। আমাদের লক্ষ্য প্রথম কেবলাকে মুক্ত করে এই পুণ্যভূমি থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করা।
কমান্ডারের মানসিক অবস্থা ভালো নয়। সুলতান তাকে ডাক্তারের হাতে অর্পণ করেন।
সৈনিকদের এতো আবেগপ্রবণ হওয়া উচিত নয়- সুলতান আইউবী। তাঁর সালার ও উপদেষ্টাদের বললেন- কিন্তু ঈমান উন্মাদনার পরিসীমা পর্যন্ত পোক্ত হওয়া দরকার। আমাদের এই কমান্ডার হুশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। মুসলমান যদি আপন দীনের শত্রুদের দেখে উন্মাদ হয়ে যায়, তাহলে ইসলামের পতাকা সেই পর্যন্ত পৌঁছে যাবে, যেখানে গিয়ে এই ভূখণ্ডের পরিসীমা সমাপ্ত হয়েছে।
হারমানের যে মেয়েরা এই কমান্ডারের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো, তাদের দুজন সমুদ্রের কূলে পৌঁছে যায়। সমুদ্র দূরে ছিলো না। তারা ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। তারা আশ্রয় সন্ধান করছে। তারা। এক স্থানে চুপচাপ বসে পড়ে। খানিক পর একখানা, নৌকা কূলে এসে ভিড়ে। মাল্লা দুজন। তৃতীয়জন অফিসার গোছের লোক। ইনি সুলতান আইউবীর নৌ-বাহিনীর অফিসার আল-ফারেস বায়দারীন। নৌ-বাহিনীর প্রধান হলেন আবদুল মুহসিন। তার পরবর্তী পদের আমীর হলেন হুসামুদ্দীন লুলু।
সুলতান আইউবীর আদেশে নৌবহর- যার হেডকোয়ার্টার আলেকজান্দ্রিয়ায়- রোম উপসাগরে টহল দিচ্ছিলো, ইউরোপের খৃস্টানদের জন্য যদি সেনা সাহায্য, রসদ-সরঞ্জাম ইত্যাদি আসে, তাহলে তাদের জাহাজগুলোকে পথেই যেনো প্রতিহত করা হয়।
হুসামুদ্দীন লুলু ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছিলেন। সুলতান আইউবী যেহেতু উপকূলীয় অঞ্চলগুলো দখল করতে চাচ্ছিলেন, তাই মিসরী নৌ বহরকে নির্দেশ প্রেরণ করেন, যেনো ছয়টি সামুদ্রিক জাহাজ কুলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এগুলো যুদ্ধজাহাজ, যাতে মিনজানিক ছাড়াও অভিজ্ঞ তীরন্দাজ এবং লড়াকু সৈনিক ছিলো।
নৌবাহিনী প্রধান আবদুল মহসিন আল-ফারেসকে কমান্ডার নিযুক্ত করে ছয়টি জাহাজ প্রেরণ করেন। আল-ফারেস তারই একটি জাহাজ থেকে নেমে নৌকায় করে কূলে চলে আসেন। তিনি নির্দেশনা গ্রহণের জন্য সুলতান আইউবীর নিকট যাচ্ছিলেন। কূলে অবতরণ করে তিনি কৃষাণীর পোশাক পরিহিত দুটি মেয়েকে দেখতে পান। আল-ফারেস তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কারা? এখানে কী করছো? তারা উত্তয় দেয়, আমরা যাযাবর গোত্রের মেয়ে, যুদ্ধের কবলে পড়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছি। আমাদের বহু পুরুষ মারা গেছে। অন্যরা এদকি-ওদিক পালিয়ে গেছে।
আর আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি- এক মেয়ে বললো খৃস্টানদের এই জন্য ভয় করি, তারা আমাদের মুসলমান মনে করে আর মুসলমানরা মনে করে খৃস্টান। আমরা এখন নিরুপায়-নিরাশ্রয়।
তোমরা মুসলমান না খৃস্টান?
আমাদের যিনি মালিক হবেন, তার ধর্ম যা, আমাদের ধর্মও তা-ই হবে- অপর মেয়ে বললো- আমাদেরকে কারো না কারো হাতে বিক্রি হতেই হবে।
আল-ফারেস নৌযুদ্ধে অভিজ্ঞ এবং অস্বাভাবিক সাহসী কমান্ডার। তদুপরি তিনি খোশ মেজাজের প্রাণবন্ত পুরুষ। এসব গুণের কারণে তিনি সকলের প্রিয়ভাজন। সেকালে তার মতো একজন পুরুষ একসঙ্গে দুতিনটি করে স্ত্রী রাখতো। কিন্তু তিনি এখনো বিয়েই করেননি। সময়টা ছিলো যুদ্ধ বিগ্রহের। আল-ফারেসকে মাসের পর মাস সমুদ্রে কাটাতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত স্থল চোখে দেখাই কপালে জুটছে না। প্রতিটি নৌ-জাহাজের কাপ্তান স্ত্রীকে সঙ্গে রাখছে।
মেয়েগুলোর রূপ-যৌবন আল-ফারেসকে এততটা প্রভাবিত ও বিমোহিত করে তোলে যে, তার ভেতরে অনুভূতি জাগ্রত হয়ে যায়, তিনি আজ তিনটি মাসেরও বেশি সময় সমুদ্রে ঘুরে ফিরছেন। তিনি মেয়েদের বললেন, তোমরা চাইলে আমি তোমাদেরকে জাহাজে রাখতে পারি।
আমরা অসহায় অবলা নারী। আশা রাখি, আমরা প্রতারণার শিকার হবো না।
আমি তোমাদেরকে বিক্রি করবো না- আল-ফারেস বললেন- মিসর নিয়ে যাবে এবং দুজনকেই বিয়ে করে নেবো।
মেয়েরা পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। চোখে চোখে কথা বলে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তারা আল-ফারেসের আশ্রয় গ্রহণ করতে সম্মতি জ্ঞাপন করে।
আল-ফারেস মেয়ে দুটোকে নৌকার মাল্লাদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন- এদেরকে আমার জাহাজে নিয়ে আমার কক্ষে খাবার খাওয়ায়। পরে এদের ওখানেই রেখে ফিরে এসে আমার অপেক্ষা করো।
মেয়ে দুটোকে নৌকায় তুলে দিয়ে আল-ফারেস প্রেমের গান গাইতে গাইতে আক্ৰা অভিমুখে রওনা হয়ে যান।
***
আল-ফারেস!- সুলতান আইউবী আর-ফারেসকে বললেন- আমি তোমার নাম জানি। তোমার দু-তিনটি সামুদ্রিক অভিযানের কীর্তির কথাও শুনেছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে তুমি একাকি ছোট-খাট অভিযান পরিচালনা করতে। এখন বড় মাপের বৃহৎ যুদ্ধের সম্ভাবনা বিরাজ করছে। আমি বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করতে এসেছি। কিন্তু তার আগে সকল বড় বড় বন্দর এলাকা দখল করতে হবে এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোকে দখলে নিতে হবে। এই উপকূলীয় শহরগুলোর মধ্যে টায়ের ও আসকালান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ দূতদের মাধ্যমে হবে। তোমার দু-তিনটি নৌকা সবসময় কূলে ভেড়ানো থাকতে হবে। আমি স্থলপথে যেখানেই যাবো, তোমাকে অবহিত রাখবে। তোমার জাহাজ সমুদ্রে টহল দিতে থাকবে। তোমার জাহাজগুলোতে অস্ত্র ও রসদের ঘাটতি নেই তো?
