সুলতান কক্ষে বসে মানচিত্রের উপর ঝুঁকে বসে হাইকমান্ডের সালার ও উপদেষ্টাদের দ্বারা পরবর্তী পরিকল্পনা প্রস্তুব করাচ্ছেন। হঠাৎ বাইরে শোর ওঠে- আমি তোমাদের সুলতানকে হত্যা করবো, তোমরা ক্রুসেডারদের তাবেদার… আমাকে ছেড়ে দাও। নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবার। কণ্ঠটা একই ব্যক্তির। সেই সঙ্গে আরো কিছু মানুষের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে –ওকে এখান থেকে নিয়ে যাও… সুলতান রুষ্ট হবেন… মেরে ফেলো বেটাকে… মুখে পানি ছিটাও… পাগল হয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তার ধারণা ছিলো, কোনো খৃস্টান সৈনিক হবে হয়তো। কিন্তু এসে দেখেন তারই ফৌজের এক কমান্ডার, যার হাত দুটো রক্তে লাল হয়ে গেছে। গায়ের কাপড়-চোপড়ও রক্তে ভেজা। চোখ দুটোও রক্তের ন্যায় লাল। ঠোঁটের দুকোণ থেকে ফেনা বেরুচ্ছে। চারজন লোক তাকে ঝাঁপটে ধরে আছে। তারপরও আটকে রাখতে পারছে না।
এই ওকে ছেড়ে দাও। সুলতান আইউবী গর্জে ওঠে বললেন।
সুলতান!- কমান্ডার ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললো- এখানে এসে তোমার সকল সৈন্য আত্মমর্যাদাহীন হয়ে পড়েছে। কাফেররা কেনো জীবিত বেরিয়ে যাচ্ছে? তুমি আমাদের সুলতান সেজে বসে আছো! যেসব মুসলিম নারী ও শিশু কারাগারে পড়ে ছিলো, তুমি কি তাদেরকে দেখেছো?
সুলতান আইউবীর রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার ছুটে গিয়ে উক্ত কমান্ডারের মুখে হাত চেপে ধরে। সে কমান্ডারের বাহু ধরে এতো জোরে ধাক্কা মারে যে, লোকটা তার কাঁধের উপর হয়ে সুলতান আইউবীর সম্মুখে গিয়ে পড়ে।
বাধা দিও না- ওকে বলতে দাও- সুলতান আইউবী পুনরায় গর্জে ওঠে বললেন- এদিকে আসো বন্ধু! আমাকে বলল, তারা তোমাকে কেননা ধরে রেখেছে?
তথ্য বের হয়, লোকটা এক বাহিনীর কমান্ডার ছিলো। তাকে সদ্য কারামুক্ত মুসলিম পরিবারগুলোতে খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি রিলিফ পৌঁছানোর এবং রুগ্নদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো। এ কাজের জন্য একশত সৈনিকের দুটি বাহিনী তৈরি করা হয়েছিলো। এই কমান্ডার মজলুম মুসলমানদের ঘরে ঘরে যেতে থাকে। সেই সূত্রে খৃস্টানরা মুসলমানদের উপর কীরূপ নির্যাতন করেছিলো, তার বিবরণ জানতে পারে। অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও লজ্জাকর কাহিনী। কমান্ডার তার বাহিনীর সৈনিকদেরকে কার্কের মসজিদগুলো পরিষ্কার করতে দেখে। এক মসজিদ থেকে দুজন নারীর বিবস্ত্র গলিত লাশ উদ্ধার হয়। এই কমান্ডার তা-ও নিজ চোখে দেখতে পায়।
সৈনিকরা লাশ দুটো মসজিদ থেকে বের করে আনে। তাদের চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে শুরু করে। একজন বললো- ওরা আমাদের বোন কন্যাদের সঙ্গে এরূপ অমানুষিক আচরণ করলো আর আমাদের সুলতান কিনা তাদেরকে পরিবার-পরিজনসহ এখান থেকে নিরাপদে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন!
কমান্ডারের মাথায় রক্ত চড়ে যায়। কিছুদূর সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পর সে পনের-বিশটি মেয়েকে যেতে দেখে। তার এক সহকর্মী কমান্ডার কয়েকজন সৈনিকসহ তাদেরকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কমান্ডার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করে- এরা কারা, তোমরা এদের সঙ্গে হাঁটছো কেন?
এরা সেই মেয়ে, যারা মিসর ও সিরিয়ায় গাদ্দার তৈরি করেছিলো সঙ্গী উত্তর দেয়- এদের নেতা হারমান ধরা পড়েছে। সবাই খৃস্টান। সুলতান এদের নেতাকে কারাগারে আটক করে এদের ব্যাপারে আদেশ করেছেন, নগরী থেকে বের করে দূরে কোথাও সেই খৃস্টানদের হাতে তুলে দিতে, যারা আক্রা থেকে পালিয়ে যাচ্ছে।
আর তোমরা এদেরকে জীবিত রেখে আসবে? কমান্ডার জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ, আদেশ তো এমনই পেয়েছি।
এরা কি আমাদের সেই বোনদের চেয়েও বেশি পবিত্র, যাদের উলঙ্গ লাশ মসজিদ থেকে উদ্ধার হচ্ছে এবং যাদেরকে কারাগারে আটক রেখে নিগৃহীত করা হয়েছিলো?
সঙ্গী কমান্ডার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো- আমি তো হুকুমের পাবন্দ।
কমান্ডার দাঁড়িয়ে যায় এবং কাফেলার গমন দেখতে থাকে। হঠাৎ তরবারী বের করে তাদের দিকে ছুটে যায়। সে চীৎকার করে বলে ওঠে আমি কারো অনুগত নই। সে এতো তীব্রগতিতে তরবারী চালায় যে, মুহূর্ত মধ্যে তিন-চারটি মেয়ের মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রক্ষী কমান্ডার তাকে ধরার জন্য ছুটে যায়। মেয়েরা চীৎকার করে করে এদিক ওদিক পালাতে শুরু করে। ইতিমধ্যে ধাওয়া করে করে কমান্ডার আরো তিন-চারটি মেয়েকে হত্যা করে ফেলে। এক সৈনিক তাকে ধরার জন্য এগিয়ে গেলে বর্শার ন্যায় তরবারীটা তার পেটে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর আর কেউ তার কাছে ঘেঁষতে পারেনি।
এই মানসিক অবস্থা নিয়েই কমান্ডার নগরী থেকে বেরিয়ে যায়। সে কয়েকজন খৃষ্টানকে শহর ত্যাগ করে চলে যেতে দেখে তাদের উপর আক্রমণ করে বসে। সামনে যাকে পেলে হত্যা করে ফেললো এবং তাকবীর ধ্বনি দিতে থাকে- আমি আত্মমর্যাদাহীন নই- আল্লাহু আকবার।
কমান্ডারের ডাক-চীৎকার শুনে কয়েকজন সৈনিক এগিয়ে আসে। তারা সকলে মিলে ঘেরাও করে কমান্ডারকে ধরে ফেলে। তাকে টেনে-হেঁচড়ে সুলতান আইউবী যে ভবনে অবস্থান করছিলেন, তার নিকট দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। একজন বললো, একে সুলতানের আমলাদের হাতে তুলে দাও। ব্যবস্থা যা নেয়ার তারাই নেবেন। অপরাধ গুরুতর- সুলতানের আদেশ লংঘন। সুলতান নিরস্ত্র নাগরিকের উপর হাত তুলতে বারণ করে দিয়েছিলেন। কমান্ডার চীৎকার করতে থাকে। তার চীৎকার শুনে সুলতান আইউবী বাইরে বেরিয়ে আসেন।
