***
সুলতান আইউবী দু-তিন দিনের মধ্যে আক্ৰায় তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। মসজিদগুলোকে পাক-পরিষ্কার করিয়ে নামাযের উপযোগী করে তোলেন। গনীমতের সম্পদ যা হাতে এসেছে, তার সিংহভাগ সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দেন। এতোদিন যারা খৃস্টানদের কারাগারে আবদ্ধ ছিলো, একটা অংশ তাদেরকে দান করেন। কিন্তু সুলতানের সব ভাবনা-চিন্তা ফিলিস্তীনের মানচিত্রটার উপর নিবদ্ধ হয়ে আছে। তার অঙুলি লেবানন ও ইসরাইলের কূল ঘেঁষে ঘেঁষে এগিয়ে চলছে। তার মন-মস্তিষ্কের উপর বাইতুল মুকাদ্দাস চেপে বসে আছে। এদিক-ওদিককার কোনো খবর তাঁর নেই। বাহিনীর কোন্ ইউনিট কোথায় অবস্থান করছে, তার জানা আছে। কমান্ডো সেনাদের বণ্টন-বিন্যাস বেশ উন্নত ও যুৎসই ছিলো। প্রতিটি ইউনিটের সঙ্গে তার যথারীতি যোগাযোগ আছে।
সুলতানে আলী মাকাম! সুলতান আইউবী হাসান ইবনে আবদুল্লাহর কণ্ঠ শুনতে পান।
হাসান!- মানচিত্র থেকে চোখ না সরিয়েই সুলতান আইউবী বললেন- যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেলো। আমার হাতে সময় নেই যে, প্রতিটি কথা রাষ্ট্রীয় রীতি-নীতি অনুসরণ করে শুনবো, বলবো। আর আমার মাকাম সেদিন। উচ্চ হবে, যেদিন আমি বিজয়ী বেশে বাইতুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করবো।
ত্রিপোলী থেকে খবর এসেছে, রেমন্ড মারা গেছে। আহত ছিলো?
না সুলতান!- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ উত্তর দেন- লোকটা অক্ষত এবং সুস্থই ত্ৰিপোলী পৌঁছে গিয়েছিলো। পরদিন নিজ কক্ষে তার লাশ পাওয়া গেছে। বোধ হয় আত্মহত্যা করেছে।
লোকটা অতেটা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ছিলো না- সুলতান আইউবী। বললেন- আগেও কয়েকবার পরাজয়বরণ করে ময়দান থেকে পালিয়েছিলো। যাক গে, আমি তার মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করছি। লোকটা আমাকে হত্যা করার জন্য হাশিশিদের দ্বারা তিনবার আক্রমণ করিয়েছিলো।
ঐতিহাসিকগণ রেমন্ড অব ত্রিপোলীর মৃত্যুর নানা কারণ উল্লেখ করেছেন। কাজী বাহউদ্দীন শাদ্দাদ ফুসফুসের ব্যাধি লিখেছেন। কিন্তু অধিকাংশ ঐতিহাসিক লিখেছেন, হাশিশিরা তাকে বিষ খাইয়েছিলো। রেমন্ড অসচ্চরিত্র এবং কুটিল মনের খৃস্টান শাসক ছিলেন। মুসলমানদেরকে গৃহযুদ্ধে জড়ানোর হীন কারসাজিতে তারও হাত ছিলো। খৃস্টান শাসকদের মাঝেও পরস্পর বিরোধ সৃষ্টি করতে কুণ্ঠিত হতেন না। তার সখ্য ছিলো হাসান ইবনে সাব্বাহর ফেদায়ীদের সঙ্গে। সুলতান আইউবীর উপর একাধিক সংহারী আক্রমণ করিয়েছিলেন। এক-দুজন খৃস্টান সম্রাটকেও ফেদায়ীদের দ্বারা হত্যা করাবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সফল হননি। সে যুগের কাহিনীকারদের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, রেমন্ড জোটের শরীক সম্রাটদের সঙ্গে বড় ক্রুশে হাত রেখে শপথ করে পরে হিত্তীনের ময়দান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ত্রিপোলী পৌঁছার পরদিনই তাকে তার কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। জীবনের শেষ রাতে হাশিশিদের নেতা শেখ সান্নান তার নিকট গিয়েছিলো।
তার আগে অপর খ্যাতিমান খৃস্টান সম্রাট বল্ডউইন মৃত্যুবরণ করেন। এই লোকটি ফিরিঙ্গিদের যুদ্ধবাজ সম্রাট ছিলেন। বাইতুল মুকাদ্দাসের তত্ত্বাবধান তার দায়িত্বে ছিলো। বল্ডউইন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি জানতেন, সুলতান আইউবী বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করতে চাচ্ছেন। তাই বাইতুল মুকাদ্দাসকে রক্ষা করার জন্য তিনি তার বাহিনীকে নিয়ে মুসলিম অঞ্চলগুলোতে ঘুরে-ফিরে যুদ্ধ করতে থাকেন। এটা তার যোগ্যতার প্রমাণ যে, তিনি ইযযুদ্দীন, সাইফুদ্দীন ও গোমস্তগীনকে ঐক্যবদ্ধ করে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং নিজের এই রণময়দানকে যুদ্ধ সরঞ্জাম, মদ, সোনা-মাণিক্য ও সুন্দরী মেয়েদের দ্বারা সুসংগঠিত করতে থাকেন। বয়সে বৃদ্ধ ছিলেন। হিত্তীন যুদ্ধের দিন কয়েক আগে মারা যান। তার স্থলে গাই অফ লুজিনান বাইতুল মুকাদ্দাসের ক্ষমতা হাতে নেন।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈনিকরা যে ধরনের গেরিলা ও কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করেছিলো, ইতিহাস আজও তার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে পারেনি। গেরিলারা শত্রু অঞ্চলে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে; কিন্তু কোনো ভূ-খণ্ড দখল করতে পারে না। ভূখণ্ড দখল করে সেনাবাহিনী। সুলতান আইউবী তার গেরিলা ও ফৌজকে যে পরিকল্পনা প্রদান করেছিলেন, তা হচ্ছে, বাইতুল মুকাদ্দাসের আশপাশে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত অঞ্চল থেকে খৃস্টান বাহিনীকে উৎখাত ও ধ্বংস করা, উপকূলীয় অঞ্চলসমূহের দুর্গগুলো জয় করা এবং দুশমনের যেসব অস্ত্র ও রসদ হস্তগত হবে, সেগুলো নিরাপদ স্থানে এনে জমা করা।
সুলতান আইউবী তার বাহিনীকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য দিয়ে রেখেছিলেন। এটাই ছিলো তার আসল শক্তি। সুলতান তাঁর সালারদের বলে রেখেছেন, যখন যে নগরী কিংবা পল্লী জয় করবে, সৈনিকদেরকে সেখানকার নির্যাতিত মুসলমানদের করুণ চিত্র দেখাবে। তাদেরকে সেইসব মসজিদ দেখাবে, যেগুলোকে খৃস্টানরা বিরান ও অবমাননা করেছে। তাদেরকে সেই মুসলিম নারীদের দেখাবে, খৃস্টানদের হাতে যাদের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছিলো, তাদেরকে ভালোভাবে দেখাও, আমাদের শত্রু কীরূপ এবং তাদের পরিকল্পনা কী।
এ কারণেই সুলতান আইউবীর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সেনাদল বৃহৎ থেকে বৃহত্তর শত্রু সেনাদলের উপর গজব হয়ে আপতিত হতো। সুলতান আইউবী যা যা দেখাতে চেয়েছিলেন, সৈনিকরা সব দেখে নিয়েছিলো। সে ছিলো এক উন্মাদনা। এখন সুলতান প্রতিনিয়ত একটিই শব্দ শুনতে পাচ্ছেন- অমুক অঞ্চল দখল হয়ে গেছে। অমুক ক্যাম্প থেকে খৃস্টানরা পিছু হটে গেছে ইত্যাদি। আইউবীর বাহিনীর অবিশ্রাম ও অবিরাম যুদ্ধ করছে আর সম্মুখে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একদিনের এক ঘটনায় সুলতান আইউবীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।
