আমার বাহিনীর চরিত্র সম্পর্কে তোমার অভিমত কী? সুলতান আইউবী জিজ্ঞেস করেন।
আপনার বাহিনীর চরিত্র যদি তেমন হতো, যেমনটি আমি তৈরি করার চেষ্টা করছিলাম, তাহলে আপনার বাহিনী আজ এখানে থাকতো না হারমান বললেন- আপনি যদি দুশ্চরিত্র আমীর, সালার, শাসক ও উজিরদের উৎখাত না করতেন, তাহলে তারা সেই কবে আপনাকে আমাদের কারাগারে নিক্ষেপ করতো। আমি আপনার প্রশংসা করছি যে, আপনি অন্তরে ক্ষমতার মোহ স্থান দেননি।
হারমান!- সুলতান আইউবী বললেন- আমি তোমাকে জীবনদান করেছি। তোমাকে আমার বন্ধুরূপে বরণ করে নিয়েছি। বলো, আমার বাহিনীর চরিত্রকে আমি কীভাবে অটুট ও উচ্চ রাখতে পারি। আর আমার মৃত্যুর পর এই চরিত্র কীভাবে অটুট থাকতে পারে।
মহামান্য সুলতান!- আমরা এই যে যুদ্ধ লড়ছি, এটা আমার-আপনার কিংবা আমাদের সম্রাটদের আর আপনার যুদ্ধ নয়। এটা কালিমা ও কাবার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ আমাদের মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকবে। আমরা রণাঙ্গনে লড়বো না। আমরা কোন দেশ জয় করবো না। আমরা মুসলমানদের মন ও মস্তিষ্ক জয় করবো। আমরা মুসলমানদের কোনো ভূখণ্ড অবরোধ করবো না– অবরোধ করবো মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা। আমাদের এই মেয়েরা, আমাদের ধন-ঐশ্বর্য ও আমাদের সভ্যতার আকর্ষণআপনি যাকে বেহায়াপনা বলেন- ইসলামের প্রাচীরে ফাটল ধরিয়ে দেবে। তারপর মুসলমানরা আপন সভ্যতা-সংস্কৃতিকে ঘৃণা করবে আর ইউরোপের রীতি নীতিকে ভালোবাসবে। সেই সময়টা আপনি দেখবেন না। আমিও দেখবো না। আমাদের আত্মারা দেখবে।
সুলতান আইউবী জার্মান বংশোদ্ভূত খৃস্টান গোয়েন্দা প্রধান হারমানের বক্তব্য গভীর মনোযোগ সহকারে শুনছেন। হারমান বলছেন
আমরা পারস্য, আফগানিস্তান ও হিন্দুস্তানের উপর কেনো দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত করিনি। কেন আমরা আরবকে যুদ্ধক্ষেত্র বানালাম? একমাত্র কারণ, সমগ্র পৃথবীর মুসলমান এই ভূখণ্ডটার প্রতি মুখ করে ইবাদত করে এবং এখানে মুসলমানদের কাবা অবস্থিত। আমরা মুসলমানদের এই কেন্দ্রটা ধ্বংস করছি। আপনার বিশ্বাস, আপনার রাসূল মসজিদে আকসা থেকে আকাশ ভ্রমণে গিয়েছিলেন। আমরা তার মিনারের উপর ক্রুশ স্থাপন করেছি এবং সেখানকার মুসলমানদের বুঝাচ্ছি, তোমাদের বিশ্বাস ভুল যে, তোমাদের রাসূল কখনো এখানে এসেছিলেন এবং এখান থেকে মেরাজে গিয়েছিলেন।
হারমান!- সুলতান আইউবী বললেন- আমি তোমার দৃষ্টিভঙ্গী ও প্রত্যয়-পরিকল্পনার প্রশংসা করছি। নিজ ধর্মের প্রতি এমনই অনুগত ও নিষ্ঠাবান হওয়া উচিত, যেমন তুমি হয়েছে। সে জাতিই জীবিত থাকে, যারা আপন ধর্ম ও সভ্যতা লালন ও সংরক্ষণ করে এবং তার আশপাশে এমন দুর্ভেদ্য প্রাচীর স্থাপন করে রাখে, যাতে কোনো মিথ্যা ধর্ম-কালচার তার কোনো ক্ষতিসাধন করতে না পারে। আমি জানি, ইহুদীরা আমাদের এখানে আমাদের চরিত্র-চেতনা ধ্বংসের মিশন নিয়ে কাজ করছে এবং তোমাদের সঙ্গ দিচ্ছে। আমি বাইতুল মুকাদ্দাস যাচ্ছি- সেই লক্ষ্যে যাচ্ছি, যে উদ্দেশ্য নিয়ে তোমরা এখানে এসেছিলে। এটা আমাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রভূমি। আমার রাসূলকে আল্লাহ পাক এখান থেকে মেরাজের সৌভাগ্য দান করেছিলেন। আমি তাকে ক্রুশের দখল থেকে মুক্ত করবো।
তারপর কী হবে?- হারমান বললেন- তারপর আপনি এই জগত থেকে চলে যাবেন। মসজিদে আকসা পুনরায় আমাদের উপাসনালয়ে পরিণত হবে। আমি যে ভবিষ্যদ্বাণী করছি, আপনার জাতির স্বভাব চরিত্রকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেই করছি। আমরা আপনার জাতিকে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিভক্ত করে তাদেরকে একে অপরের শত্রু বানিয়ে দেবো। তারপর ফিলিস্তীনের নাম-চিহ্ন মুছে ফেলবো। ইহুদীরা আপনার জাতির যুবক-যুবতীদের মধ্যে যৌন পূজার বীজ বপণ করতে শুরু করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে এখন আর কোনো নুরুদ্দীন জঙ্গী, সালাহুদ্দীন আইউবী জন্ম নেবে না।
সুলতান আইউবী মুচকি হাসি হেসে হারমানের সঙ্গে করমর্দন করে বললেন- তোমার কথাগুলো অনেক মূল্যবান। আমি তোমাকে দামেশক পাঠিয়ে দিচ্ছি। সেখানে তোমাকে সম্মানের সঙ্গে রাখা হবে।
আর আমার সঙ্গের মেয়েগুলো?
সুলতান আইউবী গভীর ভাবনায় হারিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর বললেন আমি নারীদের যুদ্ধবন্দি বানাই না। তোমার মেয়েগুলোকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিতে পারি।
মহামান্য সুলতান!- হারমান বললেন- এরা অত্যন্ত রূপসী মেয়ে। এক নজর দেখলে আপনি তাদেরকে হত্যা করতে পারবেন না, বন্দিশালায়ও নিক্ষেপ করতে পারবেন না। আপনার ধর্মে দাসীকে বিয়ে করার অনুমতি আছে। দাসীদেরকে হেরেমে রাখা যায়।
আমার ধর্ম এই বিলাসিতার অনুমতি দেয় না- সুলতান আইউবী বললেন- আমি নিজের ঘরে কিংবা কোনো মুসলমানের ঘরে সাপ পুষতে পারি না।
কিন্তু তাদের তো কোনো অপরাধ নেই- হারমান বললেন- এ কাজের জন্য তাদেরকে শৈশব থেকেই প্রস্তুত করে নেয়া হয়েছিলো।
এ কারণেই আমি তাদের হত্যার নির্দেশ দিচ্ছি না- সুলতান আইউবী বললেন- আমি তাদেরকে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। আমি তোমার এই ভাবনার প্রশংসা করছি যে, তুমি এই মধুর বিষ আমার জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু আমি তোমার ন্যায় ভাবনা ভাবতে পারি না। ওদের বলে দাও, আক্রা থেকে বেরিয়ে যাক। আমার আওতার ভেতরে কোথাও তাদের কাউকে পাওয়া গেলে তাকে হত্যা করা হবে।
