খৃস্টান সেনাপতি ও কমান্ডারদের যেখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, সুলতান আইউবী সেখানে যান। তিনি বললেন- এদের সকলকে নদী তীরে নিয়ে যাও এবং প্রত্যেককে হত্যা করে নদীতে ফেলে দাও। অন্যান্য যুদ্ধবন্দিদের বাছাই করো। যাদেরকে জীবিত রাখা আবশ্যক মনে হবে, তাদের দামেশক পাঠিয়ে দাও আর বাকিদের খতম করে দাও। কোনো নিরস্ত্র নাগরিকের গায়ে হাত তুলবে না। তাদের যারা নগরী ত্যাগ করে চলে যেতে চায়, তাদের যেতে দাও। যারা এখানে থাকতে চাইবে তাদেরকে সসম্মানে থাকতে দাও।
১১৮৭ সালের ৮ জুলাই আক্রার দখল সম্পন্ন হয়ে যায়।
রাতে যখন সুলতান আইউবী আহার থেকে অবসর গ্রহণ করেন, তখন তাকে সংবাদ দেয়া হলো, অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ একজন কয়েদিকে আপনার সামনে হাজির করা হচ্ছে।
সে কে?- সুলতান আইউবী খানিক বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করেন।
হারমান- ক্রুসেডারদের আলী বিন সুফিয়ান।
হারমান খৃস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান। আলী বিন সুফিয়ানের ন্যায় অত্যন্ত বিচক্ষণ গোয়েন্দা এবং মানুষের চরিত্র ধ্বংসে অভিজ্ঞ। যেসব খৃস্টান ও ইহুদী মেয়েকে মুসলিম অঞ্চলে গুপ্তচরবৃত্তি ও চরিত্র ধ্বংসের জন্য প্রেরিত করা হতো, তাদের প্রশিক্ষণ দিতেন এই হারমান। মিশনের বেশকটি মেয়েসহ তিনি আক্ৰায় অবস্থান করছিলেন এবং ধরা পড়ে গেলেন। তিনি নগরী থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আইউবীর এক গোয়েন্দা পিছু নিয়ে তাকে ধরে ফেলে। ছদ্মবেশ সত্ত্বেও গোয়েন্দা তাকে চিনে ফেলে। সঙ্গের মেয়েগুলোকে কৃষাণীর পোশাক পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। গোয়েন্দা এক কমান্ডারকে বিষয়টা অবহিত করে।
কমান্ডার দুতিনজন সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে হারমানের কাফেলাটি ঘিরে ফেলে। হারমান মেয়েদের ছাড়া সঙ্গে সোনা-দানাও নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি মেয়েগুলোকে কমান্ডারের ও সৈন্যদের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দেন এবং সোনাগুলোও তার সামনে রেখে দিয়ে বললেন- যার যে মেয়েকে পছন্দ হয় নিয়ে নাও। আর এই সোনাগুলোও ভাগ করে নাও।
আমার সব কটা মেয়েই পছন্দ হয়- কমান্ডার বললো- আর সোনাগুলোও সব নিয়ে নেবো। তুমিও আমার সঙ্গে চলো।
কমান্ডার সকলকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। সোনাসহ সব কজনকে সুলতান আইউবীর ব্যক্তিগত আমলার হাতে তুলে দেয়। হারমান সুলতান আইউবীর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কয়েদি। তাকে সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করা হয়।
তুমি আমার ভাষা জানো- সুলতান আইউবী হারমানকে উদ্দেশ করে বললেন- তাই আমার ভাষায় কথা বলল। আমি তোমার বিদ্যা ও বিচক্ষণতার স্বীকৃতি প্রদান করছি। আমি তোমার যতোটুকু কদর করতে পারবো, ততোটুকু তোমার ম্রাটরা পারেনি। আমি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।
আপনি যদি আমার সঙ্গে কোনো কথা বলা ছাড়া আমার হত্যার আদেশ প্রদান করেন, তবেই ভালো হবে- হারমান বললেন- আমাকে যদি আক্রার সেনাপতি-কমান্ডারদের ন্যায় খুনই হতে হয় এবং আমার মৃতদেহটা মাছের আহারে পরিণত হতেই হয়, তাহলে কথা বলে লাভ কী?
তোমাকে হত্যা করা হবে না হারমান!- সুলতান আইউবী বললেন আমি যাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, তার সঙ্গে কথা বলি না।
সুলতান আইউবী দারোয়ানকে ডেকে হারমানকে শরবত পান করাতে বললেন। হারমানের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি আরবের রীতি সম্পর্কে অবহিত আছেন যে, আরবী মেজবান যদি দুশমনকে পানি বা শরবত পান করতে দেয়, তো তার অর্থ দাঁড়ায় তিনি অন্তর থেকে শত্রুতা দূর করে ফেলেছেন এবং তার জীবন ভিক্ষা দিয়েছেন। দারোয়ার শরবত এনে দিলে হারমান তা পান করেন।
আপনি বোধ হয় জানতে চাইবেন, আমাদের কোন্ কোন্ অঞ্চলে কী পরিমাণ সৈন্য আছে- হারমান বললেন- আপনি এ-ও জানতে চাইবেন, তাদের লড়াই করার যোগ্যতা কীরূপ?
না- সুলতান আইউবী বললেন- এ তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো, তোমাদের কোন্ অঞ্চলে কী পরিমাণ সৈন্য আছে। আমার গোয়েন্দারা তোমাদের বুকের উপর বসে থাকে। তাছাড়া তোমাদের কোন অঞ্চলে কতো সৈন্য আছে, তা আমার জানবার গরজও নেই। হিত্তীনে তোমাদের সৈন্য কম ছিলো না। কম ছিলো আমার। এখন আরো কমে গেছে। কোনো বাহিনীই এখন আমাকে পবিত্র ভূমি থেকে বিতাড়িত করতে পারবে না। তুমি সংবাদ শুনবে, সালাহুদ্দীন আইউবী মারা গেছেন- পিছপা হননি।
যে কমান্ডার আমাকে ধরে এনেছে, আপনার সকল কমান্ডারের চরিত্র যদি তার মতো হয়, তাহলে আমি আপনাকে নিশ্চয়তার সঙ্গে বলবো, যতো বৃহই হোক কোনো শক্তিই আপনাকে এখান থেকে তাড়াতে পারবে না হারমান বললেন- আমি তাকে যে মেয়েদের পেশ করেছিলাম, তারা আপনার পাথরসম সালার ও দুর্গপতিদের মোমে পরিণত করেছে এবং তাদেরকে ক্রুসেডারদের ছাঁচে ঢেলে তৈরি করেছে। আর সোনা এমন এক বস্তু, যার চমক চক্ষুকে নয়- বিবেককেও অন্ধ ক তোলে। আমি সোনাকে শয়তানের সৃষ্টি বলে থাকি। অথচ আপনার কমান্ডার সোনাগুলোর প্রতি চোখ তুলে তাকালো না। আমার দৃষ্টি সব সময় মানবীয় স্বভাবের দুর্বলতাগুলোর উপর নিবদ্ধ থাকে। ভোগ-বিলাসিতা ঈমানকে খেয়ে ফেলে। আপনার বিরুদ্ধে আমি এই অস্ত্রটাই ব্যবহার করেছিলাম। কোনো সেনা অধিনায়কের মধ্যে যখন এসব দুর্বলতা সৃষ্টি হয়ে যায় কিংবা সৃষ্টি করে দেয়া হয়, তখন পরাজয় তার কপালের লিখন হয়ে যায়। আমি আপনার বলয়ে যে কজন গাদ্দার জন্ম দিয়েছি, তাদের মধ্যে প্রথমে এই দুর্বলতাগুলোই সৃষ্টি করেছি। ক্ষমতার নেশা মানুষকেসহ ডুবে মরে থাকে।
