আলী বিন সুফিয়ান মহিলাকে বড় কণ্ঠে শান্ত করেন। বললেন, মেয়েটি যে গুপ্তচর, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে । দেখতে হবে, আল-বার্ক গুপ্তচরদের দলে ভিড়েই গেলো, নাকি তাকে মদপান করিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। আলী বিন সুফিয়ান আল-বার্কের স্ত্রীকে এ-ও জানান যে, আমরা গুপ্তচরদের হত্যা করি না গ্রেফতার করে তাদের গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করি।
আলী বিন সুফিয়ানের পরামর্শে শান্ত হয়ে আল-বারকের স্ত্রী চলে যান। কিন্তু তার ভাব-গতিতে মনে হচ্ছিলো, ঈমানী চেতনাসমৃদ্ধ মহিলা ফুঁসে উঠতে পারেন যে কোন মুহূর্তে। আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারেন তিনি।
***
খাদেমুদ্দীন আল-বার্ক আলী বিন সুফিয়ানের কেবল সহকর্মী-ই নয় অন্তরঙ্গ বন্ধুও বটে। বয়সেও দুজন সমান। রণাঙ্গনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইও করেছেন দুজনে। সে সুলতান আইউবীর প্রবীণ সহচর। তথাপি সে তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা আলী বিন সুফিয়ান থেকে গোপন রেখেছে। বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর আলী বিন সুফিয়ান এ প্রসঙ্গে তার সঙ্গে কোন আলাপ করেননি। আল-বার্কের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সুকৌশলে তৎপরতা চালান। তিনি আল-বাকের ঘর এবং মেয়েটি রাতের অন্ধকারে যে বাড়িতে যাওয়া-আসা করে, দুয়ের মাঝে গুপ্তচর বসিয়ে দেন।
.
আলু-বার্কের প্রথমা স্ত্রীর সঙ্গে আলী বিন সুফিয়ানের কথা হলো দুদিন হয়ে গেছে। এ সময়ে আসেফা ঘর থেকে বের হয়নি। রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে আলীর গোয়েন্দারা।
তৃতীয় রাতের দ্বি-প্রহরের পূর্ব মুহূর্ত। ঘুমিয়ে আছেন আলী বিন সুফিয়ান। হঠাৎ এস্ত-ব্যস্ত হয়ে তার কক্ষে প্রবেশ করে এক চাকর। ঘুম থেকে ডেকে তোলে তাঁকে। বলে–ওমর এসেছে! তাকে বড় ভয়ার্ত দেখাচ্ছে!
ধনুক থেকে বের হওয়া তীরের ন্যায় দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন আলী বিন সুফিয়ান। দু-তিন লাফে বারান্দা অতিক্রম করে দেউড়ী পার হয়ে বাইরে চলে আসেন। বাইরে দণ্ডায়মান ওমর বললো–দ্রুত দশ-বারজন অশ্বারোহী প্রস্তুত করুন! নিজের ঘোড়াও হাজির করুন। তারপর বলছি, কী ঘটেছে।
চৌদ্দজন সশস্ত্র আরোহী, নিজের ঘোড়া ও তরবারী প্রস্তুত করার আদেশ দিয়ে আলী ওমরকে জিজ্ঞেস করেন–বলো, ব্যাপার কী?
আসেফার গতিবিধি অনুসরণ করার জন্য নিয়োজিত ছিলো ওমর ও আজর নামের দুই গোয়েন্দা। আলী বিন সুফিয়ান তাদেরকে আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন, ঘর থেকে বেরিয়ে মেয়েটি কোথাও যেতে শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে সংবাদ দেবে।
বড় ভয়ানক সংবাদ নিয়ে এসেছে ওমর। সে জানায়, এই সামান্য আগে আল-বার্কের ঘর থেকে আপাদমস্তক কালো চাদরে ঢাকা একটি মেয়ে বের হয়েছে। পঞ্চাশ-ষাট গজ পথ অতিক্রম করার পর সেই ঘর থেকে বের হয় একই রকম পোশাকে আরেকজন নারী। দ্রুত অগ্রসর হয়ে দ্বিতীয় মহিলা প্রথম মহিলার পিছনে চলে যায়। খানিকটা দূরে থাকতেই প্রথম মহিলা দাঁড়িয়ে যায়। গুপ্তচর দুজন লুকানো ছিলো আড়ালে। তাদের দেখতে পায়নি কেউ। মহিলাদের অনুসরণও করছিলো. অতি সন্তর্পণে। মুখোমুখি হলো মহিলাদ্বয়। কি যেন কথা হলো দুজনের মধ্যে। হঠাৎ হাতে তালি বাজায় তাদের একজন। কাছাকাছি একস্থান থেকে বেরিয়ে আসে এক ব্যক্তি। সে দ্বিতীয় মহিলাকে আটক করার চেষ্টা করে। মহিলা কি একটি অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে তার উপর। মহিলার উপরও পাল্টা আঘাত হানে লোকটি।
কণ্ঠস্বর শোনা গেলো প্রথম মহিলার–একে তুলে নিয়ে চলো। দ্বিতীয় মহিলা আঘাত হানে তার উপর। তার চীৎকারের শব্দ ভেসে আসে। পুরুষ লোকটির আঘাত প্রতিহত করে দ্বিতীয় মহিলী। আরো একটি আঘাত হানে প্রথম মহিলার উপর। আহত হয়ে পড়ে মহিলাদের দুজনই। আলী বিন সুফিয়ানকে সংবাদ দেয়ার জন্য দৌড়ে যায় ওমর। আজর লুকিয়ে থাকে সেখানেই। এরা যায় কোথায়, দেখবার অপেক্ষায় লুকিয়ে থাকে সে।
এরূপ বিশেষ সময়ের জন্য অতি দ্রুতগামী ও অভিজ্ঞ আরোহীদের একটি বাহিনী গঠন করে রেখেছিলেন আলী বিন সুফিয়ান। রাতে ঘুমায় তারা আস্তাবলে–ঘোড়ার কাছে। যিন-হাতিয়ার প্রস্তুত থাকে সব সময়। প্রয়োজন হলে রাতেও যেনো তারা কয়েক মিনিটে প্রস্তুত হয়ে যথাস্থানে পৌঁছে যেতে পারে, তার প্রশিক্ষণ দিয়ে রাখা হয়েছে তাদের। বাহিনীটি এতো-ই তৎপর যে, সংবাদ পেয়ে আলী বিন সুফিয়ান পোশাক পরিবর্তন ও ঘোড়া প্রস্তুত করতে না করতেই তারা এসে উপস্থিত।
আলী বিন সুফিয়ানের নেতৃত্ব ও ওমরের রাম্বরীতে ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছে বাহিনীটি। দুজন আরোহীর হাতে লাঠির মাথায় বাঁধা তেল-ভেজা কাপড়ের মশাল। ঘটনাস্থলে পড়ে আছে দুটি মানব-দেহ। ঘোড়া থেকে অবতরণ করে দেখলেন আলী বিন সুফিয়ান। একজন আলু-বার্কের প্রথমা স্ত্রী, অপরজন ওমরের সহকর্মী আজর। দুজন-ই জীবিত এবং রক্তরঞ্জিত।
আজর জানায়, অপর দুজন এই মহিলাকে ফেলে চলে গেলে আমি এগিয়ে আসি। কিন্তু হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন পরপর তিনটি আঘাত হানে আমার উপর। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আক্রমণকারী পালিয়ে যায়। অপর মহিলা আল-বার্কের ঘরের দিকে যায়নি, গেছে বরাবরের মতো ঐ ভবনটির দিকে। সেই ভবনটি জানা আছে ওমরের।
আলী বিন সুফিয়ান দুজন আরোহীকে বললেন, তোমরা জখমীদেরকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও এবং রক্তক্ষরণ বন্ধ করার চেষ্টা করো । অবশিষ্টদেরকে ওমরের দিক-নির্দেশনায় সেই ভবনটির দিকে নিয়ে যান, আসেফা যেখানে যাওয়া-আসা করতো।
