পুরনো আমলের বিশাল এক বাড়ি। সঙ্গে সংযুক্ত আরো কয়েকটি ভবন। পিছনের দিক থেকে ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা গেলো। আলী বিন সুফিয়ান তার সৈন্যদেরকে ভবনটির দুদিক থেকে পিছনে পাঠিয়ে দেন। দুজনকে দাঁড় করিয়ে রাখেন সম্মুখের ফটকে। বলে দেন, ভেতর থেকে কেউ বেরুবার চেষ্টা করলে তাকে ধরে ফেলবে। পালাবার চেষ্টা করলে পেছন থেকে তীর ছুঁড়ে শেষ করে দেবে।
চক্কর কেটে আলী বিন সুফিয়ানের সৈন্যরা ভবনের পিছনে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে তারা একাধিক ধাবমান ঘোড়ার পদধ্বনি শুনতে পায়। আলী বিন সুফিয়ান এক আরোহীকে বললেন–জলদি যাও, কমাণ্ডারকে বলল, দ্রুত ভবনটিকে ঘিরে ফেলে যেন ভিতরে ঢুকে পড়ে এবং ভিতরের সবাইকে গ্রেফতার করে।
আরোহী ক্যাম্পের দিকে ছুটে যায়।
আলী বিন সুফিয়ান উচ্চকণ্ঠে তাঁর বাহিনীকে আদেশ করেন–ঘোড়া ছুটাও-ধাওয়া করো। নিজেও ঘোড়া হাঁকান আলী বিন সুফিয়ান। উন্নত জাতের বাছাই করা ঘোড়া তাঁর। বাতাসের গতিতে ছুটে চলেন তিনি। নগর এলাকা পেরিয়ে-ই সামনে খোলা ময়দান।
অন্ধকারে ঘোড়া দেখা যায় না। ধাবমান অশ্বের শব্দের অনুসরণ করা হচ্ছে শুধু। নগর ছেড়ে খোলা মাঠে এসে পড়ে পলায়নকারীরা। এবার আত্মগোপন করা কঠিন হয়ে পড়ে তাদের জন্য । বিস্তৃত দিগন্তের দৃশ্যপটে এবার ছায়ার মত দেখা যাচ্ছে তাদের।
তারা চারজন। দু পক্ষের মাঝে এখনো অন্তত একশত গজের ব্যবধান। আলী বিন সুফিয়ানের নির্দেশে ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে-ই তীর ছুঁড়ে দু আরোহী। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় আক্রমণ। বড় চতুর মনে হলো ওদের। যাচ্ছিলো একত্রিতভাবে পাশাপাশি। এবার পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তাদের ঘোড়া। ধেয়ে চলেছে অবিরাম। আলী বিন সুফিয়ানের বাহিনীও এগিয়ে চলছে তীব্রগতিতে । ধীরে ধীরে দু পক্ষের মাঝের দূরত্ব কমে আসতে থাকে পলায়নকারীদের ঘোড়াও পরস্পর আরো বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। সামনে ধন সন্নিবিষ্ট একটি খেজুর বাগান। এখানে উপনীত হয়ে তাদের ঘোড়াগুলো একের থেকে অপরুটি আরো দূরে সরে খায়।দুটি ডানে আর দুটি বায়ে কেটে পড়ে। স্থানটি বেশ উঁচু। উপরে অদৃশ্য হয়ে যায় ঘোড়াগুলো।
আলী বিন সুফিয়ানের বাহিনীও উঁচুতে আরোহণ করে। কিন্তু পলায়নরত ছায়ামূর্তিগুলো এবার অনেক ব্যবধানে চলে যায় তাদের থেকে। চারজন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আলী বিন সুফিয়ান বুঝে ফেললেন, ওরা তার বাহিনীকে বিক্ষিপ্ত করতে চায়। উচ্চকণ্ঠে হাঁক দেন তিনি। বলেন—বিভক্ত হয়ে তোমরা ওদের ধাওয়া করো। আরো দ্রুত ঘোড়া ছুটাও। ব্যবধান কমিয়ে ফেলো। ধনুকে তীর সংযোজন করো।
চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে আলী বিন সুফিয়ানের বাহিনী। কাঁধ থেকে ধনুক নামিয়ে তাতে তীর সংযোজন করে। পিছু নেয় পলায়নকারী চারটি ঘোড়ার। পলায়নকারীদের ঘোড়ার গতি বেড়ে যায় আরো। বেড়ে যায় আলী বিন সুফিয়ানের বাহিনীর ঘোড়ার গতিও। হঠাৎ উনিশটি ঘোড়ার সোজা ক্ষুরধ্বনির প্রভেদ করে কানে ভেসে এলো ধনুক থেকে ছুটে যাওয়া একটি তীরের শাঁ শাঁ শব্দ। সঙ্গে একজনের চীৎকার ধ্বনি–একটা শেষ করেছি–ঘোড়া কাবু হয়ে গেছে।
এদিকে আলী বিন সুফিয়ানের সঙ্গে যে দুজন আরোহী আছে, তারাও তীর ছুঁড়ে। অন্ধকারে তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে, হচ্ছেও। তবু তারা একটি ঘোড়াকে ঘায়েল করতে সক্ষম হয়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘোড়াটি চক্কর কেটে চলে আসে পিছনে। একজন বর্শার আঘাত হানে ঘোড়াটির ঘাড়ে। পেটে বর্শা ঢুকিয়ে দেয় আরেকজন। অত্যন্ত শক্ত সমর্থ ঘোড়া। দুটি আঘাত খাওয়ার পরও দাঁড়িয়ে আছে। আরোহীদের জীবিত ধরতে হবে। আলীর এক সৈনিক হাত বাড়িয়ে এক আরোহীর ঘাড় ধরে ফেলে। তার ঘোড়া আহত। ঘোড়া থেমে যায়। ঘোড়ার আরোহী দুজন একজন পুরুষ, একটি মেয়ে। মেয়েটি বসেছে পুরুষের সামনে। তাকে অচেতন বলে মনে হলো।
অন্ধকার রাত। এখন আর কোন ধাবমান ঘোড়ার পায়ের শব্দ শোনা যায় না। এখন কানে আসছে শুধু কতিপয় মানুষের কথা বলার শব্দ আর দুলকি চালে চলন্ত কয়েকটি ঘোড়ার আওয়াজ। আরোহীরা একে অপরকে ডাকাডাকি করছে। তাদের আওয়াজে বুঝা যাচ্ছে, তারা পলায়নপর লোকগুলোকে ধরে ফেলেছে।
আলী বিন সুফিয়ান সবাইকে একত্রিত করেন। পলায়নপর লোকগুলো এখন তার হাতে বন্দী। তাদের দুটি ঘোড়া আহত। সেগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে যমের হাতে।
পলায়নপর লোকের সংখ্যা পাঁচজন। চারজন পুরুষ, একটি মেয়ে। মেয়েটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। পুরুষদের একজন বললো, আমাদের সঙ্গে তোমরা যেমন ইচ্ছা আচরণ করতে পারো। কিন্তু এই মেয়েটি আহত। আমরা আশা করি। তোমরা একে বিরক্ত করবে না।
একটি ঘোড়ার যিনের সঙ্গে মশাল বাঁধা আছে। সেটি খুলে নিয়ে জ্বালানো; হলো। মশালের আলোকে মেয়েটিকে নিরীক্ষা করে দেখা হলো। অতিশয় রূপসী এক যুবতী। গায়ের পোশাক রক্তে রঞ্জিত। কাঁধেও ঘাড়ের পার্শ্বে গভীর ক্ষত । সীমাহীন রক্তক্ষরণে মুখমণ্ডল লাশের ন্যায় সাদা। চক্ষুদ্বয় মুদিত। আলী বিন সুফিয়ান জখমের গর্তে এক খণ্ড কাপড় ঢুকিয়ে আরেকটি কাপড় দ্বারা বেঁধে দেন। তারপর তাকে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে এক সৈনিককে বললেন, একে জলদি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। কিন্তু জলদি যাওয়া কিভাবে। শহর এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে। একজন বৃদ্ধও আছে কয়েদীদের মধ্যে।
