আল-বারকের ন্যায় উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তার বাসগৃহ সম্পর্কে রিপোর্ট করার সাহস একজন সাধারণ গুপ্তচরের থাকার কথা নয়। কিন্তু আলী বিন সুফিয়ানের নীতি অত্যন্ত কঠোর। তাঁর গুপ্তচর ও সংবাদদাতাদের বলে রাখা ছিলো, স্বয়ং সুলতান আইউবীর কোন আচরণ-গতিবিধিতেও যদি সন্দেহ দেখা দেয়, তারও রিপোর্ট করতে হবে। এ ব্যাপারে কারো পদমর্যাদার তোয়াক্কা করা যাবে না। যখন-ই যার ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দেবে–হোক তা তুচ্ছ–সঙ্গে সঙ্গে, তা আলী বিন সুফিয়ানকে অবহিত করতে হবে।
এই গুপ্তচর চার চারটিবার যা দেখেছে, আলী বিন সুফিয়ানের জন্য তা অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আল-বার্কের স্ত্রীকে ভাল করেই জানেন। মহিলা এমন নন যে, রাতের বেলা পরপুরুষের সঙ্গে ঘর থেকে বের হবেন। আল-বার্কের কোন যুবতী মেয়েও তো নেই। তাছাড়া আর-বারক নতুন কোন যুবতাঁকে বিয়ে করে ঘরে তুললে সে খবর তো তারা জানতেন!
বিষয়টি নিয়ে গভীর ভাবনায় পড়ে যান আলী বিন সুফিয়ান। তিনি ভাবেন, আল-বার্ক আমার বন্ধু মানুষ। তার ঘরে নতুন করে কিছু একটা ঘটে থাকলে তা আমার জানবার কথা। তবে কি আল-বার্ক কোন একটা নারীর খপ্পরে পড়ে গেলো? রহস্যটা উদ্ঘাটন করা যায় কিভাবে?
মাথায় একটা বুদ্ধি আসে আলী বিন সুফিয়ানের। গোয়েন্দা বিভাগের একটি মেয়েকে নির্যাতিতা নারীর বেশে আল-বার্কের ঘরে প্রেরণ করেন। তাকে বলে দেন, তুমি গিয়ে বলবে, আমার স্বামী মারা গেছেন। ছেলে-সন্তান কেউ নেই। আমাকে সাহায্য করুন।
আলী বিন সুফিয়ানের নির্দেশনা মোতাবেক মেয়েটি আল-বারূকের ঘরে যায়। আল-বারক তখন ঘরে ছিলো না। মেয়েটি কৌশল করে ঘরের সর্বত্র ঘুরে-ফিরে দেখে। সে এক নবাগতা সুন্দরী তরুণীকে দেখতে পায়। মেয়েটি আল-বারককের প্রথমা স্ত্রীর কাছে যায়। তার কাছে নিজের ফরিয়াদ পেশ করে। বলে, আপনি দয়া করে আল-বার্কের কাছে আমার জন্য সুপারিশ করুন। কথায় কথায় সে জিজ্ঞেস করে বসে, আপনার মেয়ের কি বিয়ে হয়ে গেছে? আল-বার্কের স্ত্রী জবাব দেয়–ও আমার মেয়ে নয়। আমার স্বামীর নতুন বউ। তিন মাস হলো, তিনি একে বিয়ে করেছেন।
আলী বিন সুফিয়ানের জন্য এ তথ্য ছিলো বিস্ময়কর। তার মনে এ সন্দেহ-ই জাগ্রত হয়েছিলো যে, রাতের অন্ধকারে বের হওয়া মেয়েটি আল-বার্কের স্ত্রী হতে পারে না। গুপ্তচর মেয়েটির দেয়া তথ্যের পর অপর এক মহিলার মাধ্যমে আলী বিন সুফিয়ান আল-বার্কের প্রথমা স্ত্রীর নিকট বার্তা প্রেরণ করেন যে, আমি বাইরে কোথাও আপনার সঙ্গে সাক্ষাত করতে চাই। তবে আল-বারক যেন জানতে না পারে। বার্তায় তিনি একথাও বলেন, আপনার পরিবার সম্পর্কে আমার অনেক জরুরী কথা আছে। আলী বিন সুফিয়ান সাক্ষাতের স্থান এবং সময়ও নির্ধারণ করে দেন।
আল-বার্ক অফিসের কাজে ব্যস্ত। তার প্রথমা স্ত্রী নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে এসে উপস্থিত হন। মহিলাকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন আলী বিন সুফিয়ান। তিনি বললেন–আমি জানতে পারলাম, আপনার স্বামী নাকি আরেকটি বিয়ে করেছে? মহিলা বললেন–আল্লাহর শোকর, আমার স্বামী মাত্র দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন–তৃতীয় বা চতুর্থ বিয়ে করেননি।
কথা প্রসঙ্গে আলী বিন সুফিয়ান জিজ্ঞেস করলেন–তা নতুন বউটা কেমন হলো?
অত্যন্ত সুন্দরী। জবাব দেন মহিলা।
ভদ্রও তো, না? তার প্রতি আপনার কোন ধরনের সন্দেহ নেই তো? জিজ্ঞেস করেন আলী বিন সুফিয়ান।
জবাবে মহিলা কিছুই বললেন না। নীরবে কিছুক্ষণ ভাবনায় পড়ে থাকেন আলী বিন সুফিয়ান জবাবের অপেক্ষা না করে বললেন–আচ্ছা, আমি যদি বলি, মেয়েটি মাঝে-মধ্যে রাতের আঁধারে বাইরে কোথাও চলে যায়, তাহলে রাগ করবেন না তো?
মহিলা স্মিত হেসে বললেন আমি নিজেই অস্থিরচিত্তে ভাবছিলাম, কথাটা কাকে বলবো। আমার স্বামী মেয়েটির গোলাম হয়ে গেছেন। আমার সঙ্গে তো তিনি এখন কথাও বলেন না। অতি আদরের এই বউটির বিরুদ্ধে যদি কিছু বলতে যাই, তাহলে নির্ঘাত আমাকে তিনি ঘর থেকে বের করে দেবেন। তিনি ভাববেন, হিংসাবশত আমি তার বদনাম করছি। মেয়েটি আসলেই ভালো নয়। আমার ঘরে ইতিপূর্বে কখনো মদের ঘ্রাণও আসেনি। আর এখন পিপার পর পিপা শূন্য হয়ে যায়।
মদ? আল-বারূক মদও পান করতে শুরু করেছে? হঠাৎ শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করেন আলী বিন সুফিয়ান।
শুধু পানই করেন না–মাতাল-অচেতনও হয়ে যান। আমি ছয়বার মেয়েটিকে রাতের বেলা বাইরে যেতে দেখেছি। ফিরেছে অনেক বিলম্বে । আমি এ-ও দেখেছি যে, যে রাতে মেয়েটির বাইরে যেতে হয়, সে রাতে আল-বারক অজ্ঞানের মত পড়ে থাকেন। সকালে জাগ্রত হন অনেক বিলম্বে। মেয়েটি বড় বদমাশ, লোকটার সঙ্গে ও প্রতারণা করছে। বললেন মহিলা।
না, মেয়েটি বদমাশ নয়–গুপ্তচর। আর সে ধোকা দিচ্ছে আল-বাক্বককে নয়–গোটা জাতিকে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
কী বললেন? গুপ্তচর? আমার ঘরে শত্রুর গোয়েন্দা? অকস্মাৎ চমকে উঠেন মহিলা। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁত কড়মড় কর বললেন–আপনি জানেন, আমি শহীদ পিতার কন্যা। আমার স্বামী আল-বারক ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান। নিজের জীবনটা উৎসর্গ করে রেখেছিলেন ইসলামের জন্য। সন্তানদেরুকে আমি গঠন করছি জিহাদের জন্য। আর এখন আপনি কিনা বলছেন, আমার সন্তানদের পিতা একজন শত্ৰু গোয়েন্দা মেয়ের কজায় বন্দী! আমি আমার সন্তানদের পিতাকে ত্যাগ করতে পারি–জাতি ও ইসলামকে কোরবান হতে দিতে পারি না। যে করে হোক, দুজনকে-ই আমি খুন করে ফেলবো।
