রাতভর সুলতান আইউবীর জানবাজ সৈন্যরা পাচিল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার এবং পাঁচিলে ছিদ্র করার কিংবা সুড়ঙ্গ খনন করার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে আর উপর থেকে খৃস্টানরা তাদের উপর তীর, পাথর ও আগুন নিক্ষেপ করতে থাকে। সুলতান আইউবী অনুপম কুরবানী দিয়ে যাচ্ছেন। নগরীর পাঁচিলের এক স্থানে বড় মিনজানিকের সাহায্যে ভারি ভারি পাথর নিক্ষেপ করা হচ্ছে। রাত পোহাবার পর দেখা গেলো, পাঁচিলের উপর সবখানে সবদিকে আক্রার সাধারণ মানুষ ও সৈনিকরা মাছির ন্যায় ছেয়ে আছে। তারা তীর বর্ষণ করছে। আরো দেখা গেলো, প্রাচীরের এক স্থানে ফাটল ধরেছে। সুলতান আইউবী ঘোড়ার পিঠে চড়ে সামান্য পেছনে একস্থানে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি অবলোকন করছেন। তিনি আদেশ করেন, যেখান থেকে দেয়াল ফাটছে, তার উপর ও ডান-বাম থেকে দুশমনের উপর তীর বর্ষণ করো। তিনি অপর দিককার তীরন্দাজদেরও তলব করে উক্ত স্থানে নিয়োজিত করেন। সুড়ঙ্গ খননকারী বাহিনীকে বললেন, তোমরা দৌড়ে পাচিলের কাছে পৌঁছে যাও।
জানবাজরা পৌঁছে গেছে। প্রাচীরের উপর এতো অধিক ও এতো তীব্র গতিতে তীর বর্ষিত হচ্ছে যে, উপরের লোকদের পক্ষে মাথা ভোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জানবাজরা প্রাচীরে এতোটুকু ছিদ্র করে ফেলেছে যে, সেই ছিদ্র পথে দুজন লোক এক সঙ্গে অতিক্রম করতে পারবে। মুসলিম সৈনিকরা এতো আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেছে যে, তারা কোনো আদেশ ছাড়াই ছুটে একজন একজন করে ভেতরে ঢুকে যেতে শুরু করেছে। খৃস্টানরা প্রাচীরের উপর থেকে নীচে নেমে আসতে এতোটুকু সময় ব্যয় করে ফেলে যে, ইতিমধ্যে বহু মুসলমান সৈন্য ভেতরে ঢুকে পড়েছে। খৃস্টানরা প্রাণপণ মোকাবেলা করে। কিন্তু আক্রার নির্যাতিত মুসলিম নারী-শিশুদের ফরিয়াদ আরশ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সুলতান আইউবীর শক্তি মূলত এটিই ছিলো।
***
নগরীর ভেতরে হুলস্থূল শুরু হয়ে গেছে। খৃস্টানদের বড় ক্রুশ মুসলমানদের কজায় চলে গেছে এবং তার প্রধান মোহাফেজ মারা গেছেন এ সংবাদ সেখানে আগেই পৌঁছে গিয়ছিলো। হিত্তীনের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাওয়া খৃস্টান সৈন্যও এই নগরীতে এসে পৌঁছেছে। কিছু জখমীও এসেছে। তারা নিজেদের পরাজয় এবং পিছুহটার ঘটনাকে যৌক্তিক প্রমাণিত করার জন্য অত্যন্ত ভীতিকর গুজব ছড়িয়ে দিয়েছে। সুলতান আইউবীর জানবাজরা যখন নগরীর প্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং অপ্রতিরোধ্য বানের ন্যায় ভেতরে ঢুকতে শুরু করে, তখন সেই গুজবের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সৈন্যরা মোকাবেলায় অবতীর্ণ হয়েছে বটে; কিন্তু জনসাধারণের মাঝে হুলস্থুল শুরু হয়ে গেছে। তারা নগরী ছেড়ে পালানোর জন্য ফটকগুলোর উপর আছড়ে পড়ে এবং সৈনিকদের বাধা সত্ত্বেও দু তিনটি দরজা খুলে ফেলে।
মুসলিম আরোহী সেনারা কমান্ডারদের আদেশে দ্রুতগতিতে ঘোড়া হাঁকায়। দলে দলে, ফটক অতিক্রমকারী জনসাধারণকে পিষে পিষে ঘোড়াগুলো ভেতরে ঢুকে পড়ে। এবার মুজাহিদদের স্রোত কেউ ঠেকাতে পারলো না। নগরীর প্রতিটি দ্বার খুলে গেছে। ক্রুসেডাররা অস্ত্র সমর্পণ করতে শুরু করেছে। এখনো সূর্য অস্ত যায়নি। আক্রার শাসনকর্তা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সম্মুখে দণ্ডায়মান। তিনি খৃস্টান বাহিনীর সেনাপতি কমান্ডারদের এক স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে সেই জায়গাটিতে চলে যান, যেখানে হাজার হাজার নিরপরাধ মুসলমান বন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। প্রহরীরা পালিয়ে গেছে। বন্দিরা ফটক ও দড়ির জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
সুলতান আইউবী তাদের থেকে বেশ দূরে দাঁড়িয়ে যান। ওগুলো মানুষ তো নয়- মানুষের লাশ। নারী ও শিশুদের দেখে তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
যাও, রশিগুলো কেটে দাও। ওদেরকে মুক্ত করে দাও- সুলতান আইউবী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- আর তাদেরকে বলো না, আমি শহরে আছি। আমি তাদেরকে মুখ দেখাতে পারবো না।
সুলতানের আদেশ পেয়ে কয়েকজন অশ্বারোহী দ্রুতগতিতে ছুটে যায়। তারা কারাগারের কাঠের বেড়া ভেঙে ফেলে। কয়েক স্থানে রশির জাল কেটে পেছনের ঝোঁপ-কাঁটা সরিয়ে দেয়। কয়েদিরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ওটা যেনো এক মুহূর্তও থাকার জায়গা নয়। আরোহীরা তাদের নিয়ন্ত্রণে আসার জন্য চীৎকার করে করে বলছে- ধীরে সুস্থে বের হও। এখন আর তোমাদেরকে কেউ ধরতে আসবে না। ঐ দেখো, দুর্গের উপর তোমাদের পতাকা উড়ছে।
তারা আমাদেরই পাপের শাস্তি ভোগ করছে- সুলতান আইউবীর কাছে দণ্ডায়মান এক সালারকে বললেন- এ ছিলো বিশ্বাসঘাতকদের পাপ, যার শাস্তি এই নিরপরাধ মানুষগুলো ভোগ করলো। যারা আপন দীনের শক্রদেরকে বন্ধু হিসেবে বরণ করলো, তারা একটুও ভাবলো না, তাদের জনগণের পরিণতি কী হবে। ক্ষমতালোভী গাদ্দাররা যদি আমার পথ আগলে না দাঁড়াতো, তাহলে আমাদের এই হাজার হাজার শিশু ও কন্যার এমনি দশা ঘটতো না। হযরত ঈসা (আ.) প্রেম-ভালোবাসা ও শান্তির পাঠ শিখিয়েছিলেন। কিন্তু ক্রুশের পূজারীদের হৃদয়-মন মুসলমানদের বিরুদ্ধে এতো ঘৃণায় পরিপূর্ণ যে, তারা আপন পয়গম্বরের নীতি আদর্শেরও পরোয়া করছে না। পৃথিবীতে দুটি মাত্র ধর্ম টিকে থাকবে। ইসলাম ও খৃস্টবাদ। আমরা যদি হৃদয় থেকে ক্ষমতার লোভ ও ভোগ বিলাসিতার মোহ দূর করতে না পারি, এই দুর্বলতার সুযোগে খৃস্টবাদ ইসলামের পতন ঘটিয়ে ছাড়বে।
