আক্ৰায় মুসলমানদের অবস্থা হচ্ছে, দু-চারজন বৃদ্ধ ও পঙ্গু ছাড়া সবাই মানবতের ও আতঙ্কের জীবন-যাপন করছে। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ। কারাগারে আটক মুসলমানদের সংখ্যা চার হাজারের অধিক লিখেছেন। সে যুদ্ধের অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ পাঁচ থেকে ছয় হাজারের মধ্যে লিখেছেন। মোটকথা, আক্ৰা মুসলমানদের জন্য কারাগারে পরিণত হয়েছিলো। কোনো মুসলমানের বোন-কন্যা নিরাপদ ছিলো না। ক্রুসেডারদের উদ্দেশ্য ছিলো, মুসলমানরা চলমান লাশে পরিণত হয়ে যাক এবং তাদের শিশুদের মধ্যে ধর্ম ও জাতীয়তার অনুভূতিই জাগ্রত না হোক। সেখানকার মসজিদগুলো বিরান হয়ে গিয়েছিলো।
১১৮৭ সালের ৪ জুলাইয়ের পর ক্রুসেডাররা সেখানকার মুসলমানদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলো। এতোদিন যেসব মুসলমান নিজ ঘরে অবস্থান করার সুযোগ পেয়েছিলো, তাদেরও ধরে ধরে উন্মুক্ত কারাগারে নিক্ষেপ্ত করা হলো। সে ছিলো এক ধরূনের বেগার ক্যাম্প। ওখানে মুসলমানদের দ্বারা পশুর ন্যায় কাজ করানো হতো। ১১৮৭ সালের ৪ জুলাইয়ের পর আর তাদের বের হতে দেয়া হয়নি। তাদের কঠোর পাহারা বসিয়ে দেয়া হলো। তা থেকেই হতভাগ্যরা অনুমান করে নিয়েছিলো, খৃস্টানদের কোথাও পরাজয় ঘটেছে কিংবা ইসলামী ফৌজ তাদের নগরী অবরোধ করেছে। মহিলারা আল্লাহর দরবারে মিনতি করতে শুরু করলো। কারাগারের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন মাত্রায় বেদনার ছায়া নেমে হলো। মায়েরা দুআর জন্য অবুঝ সন্তানদের হাত উচ্চে তুলে ধরে বলতে শুরু করে- বেটা! বলল, হে আল্লাহ! আপনি ইসলামকে বিজয় দান করুন। বলল, হে আমার আল্লাহ! আপনি বাইরের মুসলমানদেরকে হিম্মত দান করুন, যেন তারা আমাদেরকে জালেমদের এই লোকালয় থেকে বের করে নিতে পারেন।
হাজার হাজার শিশু হাজার হাজার নারী আল্লাহর সমীপে হাত তুলে দুআ করছে, আকুল ফরিয়াদ জানাচ্ছে। শিশুরা তাদের মায়েদের কান্না দেখে তারাও কাঁদতে শুরু করে। তবে অবলা নারী আর অবুঝ শিশুদের এই ক্রন্দনরোলের সঙ্গে হান্টারের শব্দও ভেসে আসছে। তারা তাকিয়ে দেখে, বিপুলসংখ্যক নতুন কয়েদি নিয়ে আসা হচ্ছে। এরা নগরীর সেইসব মুসলিম বাসিন্দা, যারা এতোদিন আপন আপন বাড়িঘরে বসবাস করছিলো। তাদের নারী এবং শিশুদেরকেও নিয়ে আসা হয়েছে। তাদেরই উপর হান্টারের আঘাত হানা হচ্ছে।
ছয় কি সাত জুলাই মধ্যরাতের পর হঠাৎ নগরীতে হট্টগোল শুরু হয়ে যায় এবং কোনো কোনো স্থান থেকে অগ্নিশিখা উত্থিত হতে শুরু করে। শা শা করে তীর এসে এই মুক্ত কারাগার পর্যন্ত আঘাত হানতে শুরু করে। এই কারাগারের চারদিকে শুষ্ক কাটা এবং রশির জালের বেড়া দেয়া। রাতে চারদিকে স্থানে স্থানে বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে বন্দিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়। এক বন্দি বাইরে থেকে আসা একটি তীর তুলে হাতে নিয়ে বাতির আলোতে নিরিক্ষা করে দেখেই চীঙ্কার দিয়ে ওঠে- আমি এই তীর চিনি। এটি ইসলামী ফৌজের তীর।
এমন সময় বেড়ার জালের ফাঁক গলিয়ে শা করে অপর একটি তীর ধেয়ে এসে লোকটার বুকে গেঁথে যায়। কোন এক খৃস্টান সান্ত্রী বন্দিকে চুপ করানোর জন্য তীরটা ছুঁড়েছে। শহর জেগে ওঠেছে। নগরী ও দুর্গের পাচিলের উপর দৌড়-ঝাঁপ, হট্টগোল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধনুক থেকে তীর বের হওয়ার শব্দও বেড়ে চলেছে। বাইরে আল্লাহু আকবার তাকবীর ধ্বনি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে। একটু পরপর ভ্রাম ভ্রাম শব্দ কানে ভেসে আসছে। এগুলো বড় বড় পাথর পতনের শব্দ, যা কিনা সুলতান আইউবীর সৈন্যরা মিনজানিকের সাহায্যে পাঁচিলের উপর নিক্ষেপ করছে।
***
এটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অবরোধ। তবে অবরোধের চেয়ে আক্রমণটাই বেশি। শহরে অগ্নিগোলা নিক্ষেপক মিনজানিক ছাড়াও ফটক ও পাঁচিলের উপর ভারি পাথর নিক্ষেপকারী বড় মিনজানিকও ব্যবহার করা হচ্ছে। উঁচু উঁচু মাচান সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছে। এক একটি মাচানের দশ থেকে বিশজন করে সৈনিক দাঁড়াতে পারে। সেগুলোর নীচে চাকা লাগানো। উট এবং ঘোড়া এগুলো টেনে এনেছে। এই চলমান মাচানগুলো দেয়াল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু খৃষ্টানরা নগরীর প্রতিরক্ষায় প্রাণান্ত যুদ্ধ লড়ছে। সাধারণ জনগণও সৈনিকদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে। তারা সুলতান আইউবীর চলন্ত মাচানগুলোর উপর বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়ে ছুঁড়ে মুসলিম সৈনিকদের খতম করে চলেছে। যে মাচানগুলো পাঁচিলের সন্নিকটে পৌঁছে গেছে, খৃস্টান সৈনিকরা সেগুলোর উপর জ্বলন্ত প্রদীপ এবং তরল দাহ্য পদার্থের পাতিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে তাদের ভস্ম করে দিচ্ছে।
ভেতরে বন্দিশালায় হাজার হাজার কয়েদি সমকণ্ঠে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ জিকির করছে। মহিলারা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে আকুতি করছে। হঠাৎ একজন অতি উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারীব। আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটে। সঙ্গে সকল নারী, শিশু ও পুরুষের কণ্ঠ এক কণ্ঠে পরিণত হয়ে যায়, যা যুদ্ধের হট্টগোল থেকে অধিক উচ্চ হয়ে দেখা দেয় এবং বিকট শব্দের রূপ ধারণ করে শহরময় ছড়িয়ে পড়ে।
দু-তিনজন সান্ত্রী ভেতরে প্রবেশ করে বন্দিদের চুপ করানোর চেষ্টা করতে শুরু করে। তিন-চারজন উত্তেজিত কয়েদি উঠে সান্ত্রীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফটক খোলা ছিলো। অবশিষ্ট কয়েদিরা কারাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তীর বৃষ্টি সামনের লোকগুলোকে মাটিতে ফেলে দেয়। পরক্ষণে অনেকগুলো ঘোড়া ছুটে আসে। আরোহীদের হাতে বর্শা ছিলো। পলায়নপর কয়েদিরা ভেতরে ঢুকে পড়ে। যারা পেছনে রয়ে যায়, তারা আরোহীদের বর্শার আঘাতে শহীদ হয়ে যায়। বন্দিদের পলায়ন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। নারী ও শিশুরা আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। তারপর সমস্বরে কালেমা তায়্যেবার জিকির করতে শুরু করে।
