সালারগণ খানিকটা বিস্মিত হন। তাদের আশা ছিলো, এবার সুলতান আইউবী বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রার আদেশ দেবেন। অথচ, তিনি কিনা আক্ৰা আক্রমণের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করলেন। খৃস্টানদের বড় ক্রুশটা তার পেছনে রাখা আছে। তিনি কুশটার প্রতি তাকান এবং কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। উপস্থিত লোকজন চুপচাপ বসে আছে। হঠাৎ তিনি দ্রুত সালারদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে বলে ওঠেন- আমার বন্ধুগণ! এটা দুটি বিশ্বাসের যুদ্ধ। এটা হক ও বাতিলের সংঘাত। এই ক্রুশটার উপর জমাট হয়ে থাকা রক্ত দেখো। এই রক্ত হযরত ঈসার নয়। এই রক্ত সেই পাদ্রীরও নয়, যাকে খৃস্টান জগত এই ক্রুশের মোহাফেজ বলে বিশ্বাস করে। এই রক্ত সেই পাদ্রীদেরও নয়, যারা এতো বড় ক্রুশটাকে যুদ্ধের ময়দানে এনে রেখেছিলো। এরা সকলে আল্লাহর সৈনিকদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু এই রক্ত তাদের একজনেরও নয়। এই রক্ত অসত্যের রক্ত। এই রক্ত ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও মানুষের গড়া চিন্তা-চেতনার রক্ত।
সুলতান আইউবীর কণ্ঠে আবেগের জোশ সৃষ্টি হয়ে গেছে। তিনি বললেন- আমি প্রতিটি যুদ্ধাভিযান জুমার দিন শুরু করে থাকি। অগ্রযাত্রা জুমার দিন করি। জুমা বরকতময় দিবস। আমি প্রতিটি অভিযান জুমার খুতবার সময় শুরু করি। কারণ, এই সময়টা দুআ কবুলের সময়। তোমরা যখন দুশমনের সঙ্গে লড়াইরত থাকো, তোমাদের উপর তীরবৃষ্টি হতে থাকে, দুশমনের মিনজানিকগুলো তোমাদের উপর আগুন ও পাথর বর্ষণ করতে থাকে, সে সময় জাতির প্রতিজন মানুষের হাত মহান আল্লাহর দরবারে তোমাদের নিরাপত্তা ও বিজয়ের জন্য উত্তোলিত থাকে। তোমরা কি দেখোনি, আমি এই যুদ্ধের জন্যও রওনা জুমার দিন করেছিলাম এবং জুমার দিন যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। এখন তোমরা বিজয়ী। তোমাদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে। এটা আমাদের সুমহান বিশ্বাস ও চিন্তা চেতনার জয়। এই যুদ্ধ ছিলো চাঁদ-তারা বনাম ক্রুশের যুদ্ধ। চাঁদ-তারা জয়লাভ করেছে। আমি তোমাদেরকে কথাগুলো কেনো বলছি? এই জন্য বলছি যে, তোমাদের কারো মধ্যে যদি বিশ্বাস সংক্রান্ত কোনো শোবা-সন্দেহ থাকে, তাহলে দূর হয়ে যাবে। তোমরা আল্লাহর রশিকে আরো শক্তভাবে ধারণ করো।
তোমাদের বোধ হয় অবাক লাগছে, আমি আক্ৰা আক্রমণের সিদ্ধান্ত কেননা নিয়েছি। আবেগের কথা বলতে হলে তার কারণ, ক্রুসেডাররা একবার আমাদের পবিত্র মক্কা ও মদীনা অভিমুখে অগ্রযাত্রা করেছিলো। প্রিন্স অর্নাত মক্কা থেকে মাত্র দুক্রোশ দূর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলো। আমি অর্নাত থেকে পবিত্র মক্কার প্রতি কুনজরে তাকাবার প্রতিশোধ নিয়ে ফেলেছি। এবার অন্যান্য সম্রাট ও নাইটদের থেকে প্রতিশোধ নেবো। আক্রা তাদের মক্কা। আমি নগরীটা পদানত করবো। মসজিদের আকসার যে অবমাননা চলছে, তার প্রতিশোধ নেবো। আর সামরিক বিচারে বাইতুল মুকাদ্দাসের আগে আক্রা জয় করা এ কারণেও জরুরি যে, তাতে ক্রুসেডারদের মনোবল ভেঙে যাবে।
সুলতান আইউবী বিশাল একটা নকশা- যেটি তিনি নিজ হাতে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন- খুলে সকলের সামনে মেলে ধরেন এবং হিত্তীনের উপর আঙুল রেখে বললেন- এখন তোমরা এখানে। তিনি আঙুলটা এমনভাবে দ্রুত আক্রার দিকে নিয়ে যান, যেনো কিছু কর্তন করার জন্য খঞ্জরের আগা চালালেন। বললেন- ক্রুসেডারদের শাসনক্ষমতাকে দুভাগে বিভক্ত করে আমি তার মধ্যখানে এসে পড়বো। আক্ৰায় দখল প্রতিষ্ঠিত করে টায়ের, বৈরুত, হীফা, আসকালান এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সকল উপকূলীয় নগর ও পল্লীকে ধ্বংস করে দেবো। সামরিক-বেসামরিক কোনো খৃস্টানকে সেসব অঞ্চলে থাকতে দেবো না। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর দখল এ কারণেও জরুরি যে, ইউরোপের আরো কতিপয় সম্রাট তাদের খৃস্টান ভাইদের সাহায্যার্থে সৈন্য, অর্থ ও সামরিক সরঞ্জাম প্রেরণ করবে। উপকূল তোমাদের দখলে থাকলে দুশমনের কোনো রণতরী কূলে ভিড়তে পারবে না। এখান থেকে আমরা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হবো। আমাদেরকে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে হবে।
ফিলিস্তীন ও লেবাননের মানচিত্র দেখলে আপনি গ্যালিলি ঝিলের পাড়ে হিত্তীন এবং তার বিপরীত দিকে সমুদ্রের কূলে আক্রা দেখতে পাবেন। দক্ষিণে বাইতুল মুকাদ্দাস। হিত্তীন থেকে আক্রার দূরত্ব পঁচিশ মাইল আর বাইতুল মুকাদ্দাস সত্তর মাইল। আজকের লেবানন ও ফিলিস্তীনের উপর সেদিন খৃস্টানদের দখল ছিলো। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী পরিকল্পনা ঠিক করেছিলেন, তিনি হিত্তীন থেকে আক্রা পর্যন্ত এমনভাবে অগ্রযাত্রা করবেন যে, পথে পড়া প্রতিটি অঞ্চল দখল করতে থাকবেন এবং সেসব অঞ্চল থেকে খৃষ্টানদের বিতাড়িত করে শুধু মুসলমানদের থাকতে দেবেন। সামরিক বিশেষজ্ঞগণ একে অতিশয় উত্তম এক পরিকল্পনা বলে অভিহিত করেছেন। সুলতান আইউবী এই পরিকল্পনা ক্রুসেডারদের সামরিক শক্তিকে দুভাগে বিভক্ত করার লক্ষ্যে প্রস্তুত করেছিলেন। ক্রুসেডারদের মোকাবেলায় তাঁর বাহিনী ক্রুসেডারদের এভো বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও কম ছিলো। কিন্তু তার যুদ্ধ-কৌশলগুলো ক্রুসেডারদের অপেক্ষা উন্নত এবং চলাচলের গতি অত্যন্ত তীব্র ছিলো।
***
আক্রার প্রতিরক্ষা অনেক শক্ত- সুলতান আইউবী তাঁর সালারদের উদ্দেশে বললেন- আমাদের গোয়েন্দারা জানিয়েছে, ওখানে শক্ত-সামর্থ যুবক মুসলমানরা কারাগারে আটক রয়েছে। নারী-শিশুরাও বন্দি অবস্থায় রয়েছে। ওখানকার খৃস্টান নাগরিকরা নগরীর প্রতিরক্ষায় জীবনের বাজি লাগিয়ে যুদ্ধ করবে। মুসলিম যুবকরা যেহেতু বন্দি, তাই ভেতর থেকে তারা আমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে না। আমি দীর্ঘ অবরোধ করতে চাই না। তোমাদের আক্রমণ ঝড়গতির হওয়া চাই। আক্রা পর্যন্ত আমাদের অগ্রযাত্রার নিরাপত্তা বিধান করবে আমাদের কমান্ডোরা। অগ্রযাত্রা হবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। পথে কোন লোকালয় অক্ষত থাকবে না। তবে সৈনিকগণ গনীমত কুড়ানোর জন্য থামবে না। এ কাজের জন্য আলাদা বাহিনী নিযুক্ত করা হয়েছে।
