শহর থেকে দূরে এক স্থানে পৌঁছে তারা দুটি ঘোড়া পেয়ে যায়। এগুলো তাদেরই গোয়েন্দাদের ব্যবস্থাপনায় সেখানে অপেক্ষমান দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটা সেখানেই ছেড়ে দেয়া হলো। কুলসুম ও বকর ঘোড়া দুটোতে আরোহণ করে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরদিন পথে নিজ বাহিনীর এক দূত তাদের জানায়, ক্রুসেডাররা পরাজয়বরণ করেছে। অর্নাত মৃত্যুবরণ করেছে। সুলতান আইউবী এখনো হিত্তীন ও নাসেরার অঞ্চলে অবস্থান করছেন। কুলসুম সুলতান আইউবীর নিকট যেতে চাচ্ছে।
তারা গ্যালিলি ঝিলে পৌঁছে গেছে। কুলসুমকে যখন সুলতান আইউবীর সম্মুখে উপস্থিত করা হলো, তখন মেয়েটি সুলতানের পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে।
আমার কন্যা- সুলতান আইউবী মেয়েটিকে ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে স্বস্নেহে বললেন- আমার এই বিজয়ে না জানি তোমার মতো আরো কতো মেয়ের হাত রয়েছে।
আমি অর্নাতের লাশটা দেখতে চাই- কুলসুম বললো।
সব কটার লাশ নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে- সুলতান আইউবী বললেন- অর্নাতকে আমি নিজ হাতে শাস্তি দিয়েছি। আগামীকাল তোমাকে কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হবে। আমাকে এখনো বহুদূর যেতে হবে। যেখানে থাকবে, আমার জন্য দুআ করবে, যেনো আমি কেবলই সম্মুখে অগ্রসর হতে পারি। দুআ করবে সূর্য যেখানে অস্ত যায়, সে পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পয়গাম পৌঁছিয়ে দিতে পারি।
হিত্তীনের জয় ছিলো অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। এই জয়ের মাধ্যমে সুলতান আইউবী ফিলিস্তীনের দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন এবং তাতে ঢুকে পড়েছিলেন। এতো বিশাল একটা অঞ্চল জয় করার ফলে সুলতানের জন্য ফিলিস্তীন জয় সহজ হয়ে গিয়েছিলো। তিনি এই অঞ্চলটাকে আস্তানা বানিয়ে নেন এবং বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রার প্রস্তুতি ও অস্ত্র রসদ ইত্যাদি সগ্রহে আত্মনিয়োগ করেন।
৮.৪ আল-ফারেস
আল–ফারেস
হিত্তীনে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যে বিজয় অর্জন করেছেন, তা কোনো সাধারণ বিজয় ছিলো না। সাত সাতজন খৃস্টান সম্রাট ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুলতান আইউবীর সামরিক শক্তিকে চিরতরে খতম করতে এবং তারপরে পবিত্র মক্কা-মদীনা দখল করতে এসেছিলেন। কিন্তু ফল ফলেছে উল্টো। মরুর টিলা যেমন ঝড়ের কবলে পড়ে বালিকণার ন্যায় মরুভূমিতে মিশে যায়, তেমনি তাদের নিজেদের সামরিক শক্তিই বরং নিঃশেষ হয়ে গেছে। চারজন বিখ্যাত ও শক্তিমান ম্রাট আইউবীর হাতে বন্দি হয়েছেন, যাদের মধ্যে জেরুজালেমের (বাইতুল মুকাদ্দাস) শাসনকর্তা গাই অফ লুজিনান অন্যতম। খৃস্টান বাহিনীর মনোবল ভেঙে গেছে এবং আইউবী বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। তবে গেরিলা অপারেশন এখনো চলছে। আইউবীর গেরিলারা পলায়নপর খৃস্টান সৈন্যদের পাকড়াও করছে। ক্রুসেডারদের মনোবল এমনভাবে ভেঙে গেছে যে, কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের ভাষায়- এক ব্যক্তি যার সম্পর্কে আমার বিশ্বাস আছে, লোকটা সত্য বলে- আমাকে বলেছে, সে নিজ চোখে দেখেছে, মুসলিম বাহিনীর এক সৈনিক ত্রিশজন খৃস্টান সৈন্যকে এক রশিতে বেঁধে নিয়ে আসছিলো। এমন তো একাধিক দৃশ্য দেখা গিয়েছিলো, এক একজন মুসলিম সৈনিক কয়েকজন করে খৃস্টান সৈন্যকে নিরস্ত্র করে হাঁকিয়ে নিয়ে আসছে। কোনো কোনো ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ক্রুসেডারদের পরাজয়ের এরূপ একাধিক কাহিনী বর্ণনা করেছেন এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সামরিক যোগ্যতার প্রশংসা করেছেন।
হিত্তীন এবং তার আশপাশে এবং আরো দূরে যেখানে যেখানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, সেই মাইলের পর মাইল বিস্তৃত অঞ্চলে ক্রুসেডারদের লাশ পড়ে আছে। গুরুতর আহতরা ছটফট করে করে প্রাণ হারিয়েছে। সাধারণ আহতরাও মারা গেছে। তার কারণ জখম নয়- পিপাসা। লোহা পরিহিত নাইটদের নিরাপত্তা বর্মগুলো উত্তপ্ত চুলায় পরিণত হয়ে তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কালের এক ঐতিহাসিক এ্যান্থনি ওয়েস্ট সেকালের ঐতিহাসিকদের সূত্রে লিখেছেন, হিত্তীনের রণাঙ্গনে লাশের সংখ্যা ছিলো ত্রিশ হাজারেরও অধিক। লাশগুলো তুলে আনার কোনো ব্যবস্থা করা হলো না। তাদের যেসসব সহকর্মী জীবিত ছিলো, তারা হয়তো বন্দি হয়ে গিয়েছিলো, নতুবা ছিন্নভিন্ন হয়ে পালিয়ে গিয়েছিলো। অ্যান্থনি ওয়েস্ট লিখেছেন, তাদের লাশগুলো চিল-শকুন ও শিয়াল-কুকুররা খেয়ে ফেলেছিলো। দিন কয়েকের মধ্যেই লাশগুলো হাড়ের কংকালে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। যারা উপর থেকে দৃষ্টিপাত করেছেন, তারা দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত ভূখণ্ডটাকে হাড়ের কারণে সাদা দেখেছেন। সেই কংকালগুলোর মাঝে হাজার হাজার ছোট ছোট ক্রুশ ছড়িয়ে পড়েছিলো, যেনো পাকা ফসল থেকে ফলগুলো ছিঁড়ে পড়ে শুকিয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী লাশগুলো সরিয়ে অঞ্চলটাকে পরিষ্কার করার গরজ বোধ করেননি। কারণ, তিনি সেখানে অবস্থান করবেন না। তার গন্তব্য বাইতুল মুকাদ্দাস। কিন্তু তিনি আলোচনা করছেন আক্রার। আক্রার বড় কুশটা সুলতানের তাবুর বাইরে পড়ে আছে। তার মহান মোহাফেজ পাদ্রী মৃত্যুবরণ করেছেন। ক্রুসেডারদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার এটিও একটি কারণ।
***
আমাদেরকে এখন সোজা আক্ৰায় আক্রমণ চালাতে হবে- সুলতান আইউবী তার সালার ও নায়েবদের উদ্দেশে বললেন- আমি মহান আল্লাহর শোকর আদায় করছি যে, আমার রিজার্ভ বাহিনীটা গোটাই অক্ষত রয়ে গেছে- ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি। তিনি সকলের উপর চোখ বুলিয়ে মুচকি হেসে বললেন- মনে করো না আমার নিজের ও কদের ক্লান্তির অনুভূতি নেই। তোমাদেরকে এর বিনিময় আল্লাহ দান করবেন। তোমাদের বিশ্রাম হবে মসজিদে আকসায়। আমরা যদি এখানে বিশ্রামের জন্য বসে পড়ি, তাহলে ক্রুসেডাররা জড়ো হয়ে সতেজ ও প্রস্তুত হয়ে যাবে। আমি তাদেরকে জখম পরিষ্কার করারও সুযোগ দিতে চাই না।
