আক্রার পাত্রী মৃত্যুবরণ করেছেন। বড় ক্রুশ মুসলমানদের হাতে এসে পড়েছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিকগণ এই ক্রুশ সম্পর্কে কিছু লিখেননি। সে কালের লিপি থেকে প্রমাণিত হয়, বাইতুল মুকাদ্দাস জয়ের পর সুলতান আইউবী ওখানকার খৃস্টানদের সম্মানার্থে কুশটা তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
সন্ধ্যা পর্যন্ত হিত্তীন যুদ্ধ চূড়ান্তে পৌঁছে যায়। ক্রুসেডারদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ ছিলো না। অসংখ্য-অগণিত সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। অবশিষ্টরা অস্ত্র, সমর্পণ করে আইউবীর হাতে বন্দি হয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষে সুলতান আইউবীর সম্মুখে যেসব বন্দিকে হাজির করা হলো, তাদের মধ্যে রেমন্ড ব্যতীত জোট বাহিনীর ছয় সম্রাটই আছেন। আছেন প্রিন্স অর্নাতও, সুলতান যাকে নিজ হাতে হত্যা করার কসম খেয়েছিলেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেছে এবং কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদও বর্ণনা করেছেন, সুলতান আইউবী খৃস্টান সম্রাট জেফ্রেকে শরবত পান করতে দিয়েছিলেন। জেফ্রে অর্ধেক পান করে গ্লাসটা অনাতকে দিয়ে দেন।
অর্নাত শরবত পান করতে শুরু করেন। সুলতান আইউবী দোভাষীর মাধ্যমে গর্জে ওঠে বললেন- ওকে (অর্নাতকে) বলল, ওকে আমি নই- তার সম্রাট শরবত দিয়েছে। আরবী মেজবান শুধু সেই শত্রুকে শরবত পান করতে দেয়, যার জীবন ক্ষমা করে দেয়া হয়। আমি অর্নাতকে শরবত দেইনি।
বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ লিখেছেন, সে সময় সুলতান আইউবীর চোখ থেকে যেনো স্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছিলো।
সুলতান চাকরদের বললেন, এদের খাওয়ার ব্যবস্থা করো। সকলে তাঁবুতে বসে আহার করেন। সুলতান পুনরায় জেফ্রে এবং অর্নাতকে নিজ তাবুতে ডেকে পাঠান। অর্নাতকে বললেন- তুমি সবসময় আমার রাসূলকে অবমাননা করতে। এখন ইসলাম গ্রহণ করা ব্যতীত তোমার মুক্তির আর কোন পথ নেই।
অর্নাত অস্বীকৃতি জানান।
সুলতান আইউবীর এটাই কামনা ছিলো। তিনি ঝট করে তরবারীটা বের করে এক আঘাতে অর্নাতের একটা বাহু দেহ থেকে আলাদা করে ফেলেন এবং চীৎকার করে বলে ওঠেন- শয়তান! আমার প্রিয় রাসূলের অবমাননা করেছি। গালিগুলো যদি আমাকে দিতে, তবু জীবনটা রক্ষা পেতো।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান আইউবীর তাঁবুতে তাঁর যে দুতিনজন সালার ছিলেন, তারা তরবারীর আঘাতে অর্নাতকে খতম করে দেন। সুলতান শ্লেষমাখা কণ্ঠে বললেন- এই নাপাক মরদেহটাকে বাইরে ফেলে দাও।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ লিখেছেন- সুলতান আইউবী অর্নাতের দেহটা তাঁবুর বাইরে এবং তার আত্মাটা জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছেন।
সহকর্মীর এই পরিণতি দর্শনে সম্রাট জেফ্রের মুখ শুকিয়ে যায়। তিনি বুঝে নেন, এবার আমার পালা। সুলতান আইউবী তার দিকে এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে কোমল কণ্ঠে বললেন- রাজা রাজাকে হত্যা করে না। কিন্তু লোকটার অপরাধ এমন ছিলো যে, আমাকে এক সময় তাকে নিজ হাতে হত্যা করার শপথ করতে হয়েছিলো। আপনি ভয় পাবেন না।
বন্দি সম্রাটদেরকে বন্দিদের তাঁবুতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সিজদায় লুটিয়ে পড়েন।
***
এখন রাত। কার্কের রাজপ্রাসাদ নীরব-নিস্তব্ধ। প্রিন্স অর্নাত সেখানে নেই। নেই তার সেনাপতি-দরবারিগণও। আছে কেবল হেরেমের নারীরা। কুলসুমও আছে। তার চাকর-চাকরানিরাও আছে। দুর্গে অল্প কজন সৈন্য আছে। এখনো সেখানে অর্নাতের মৃত্যু সংবাদ পৌঁছেনি। রাতের প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এতোক্ষণে কুলসুমের শুয়ে পড়ার কথা।
এক মহিলা পা টিপে টিপে কুলসুমের শয়নকক্ষে প্রবেশ করে। তার হাতেখঞ্জর। সে কুলসুমের পালঙ্কের নিকটে পৌঁছে যায়। কক্ষে আলো নেই। কিছু দেখা যাচ্ছে না। মহিলা খঞ্জরধারী হাতটা উঁচু করে পূর্ণ শক্তিতে আঘাত হানে। কিন্তু কেউ চীৎকার করেনি। খঞ্জর পালঙ্কে গেঁথে যায়। সে বিছানা হাতড়ায়। কুলসুম নেই। মেয়েটি কোথাও গেছে মনে করে মহিলা পালঙ্কের পাশ ঘেঁষে লুকিয়ে বসে থাকে।
খানিক পর চাপা পায়ে কে একজন কক্ষে প্রবেশ করেছে শোনা যায়। শব্দটা পালঙ্কের নিকটে চলে আসে। মহিলা উঠে তার উপর খঞ্জরের আঘাত হানে। পরক্ষণেই উল্টো তার পেটে খঞ্জর গেঁথে যায়। তারপর কিছুক্ষণ দুখঞ্জরের সংঘর্ষ চলে। আঘাত-পাল্টা আঘাত চলে। তারপর দুজনই বাইরে বেরিয়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে। হেরেমের অন্যান্য মেয়েরা ছুটে আসে।-দেখে। আঘাতপ্রাপ্ত দুজন মারা গেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কুলসুম। নেই। এরা দুজনই হেরেমের নারী- দুজনই কুলসুমকে হত্যা করতে গিয়েছিলো। সেদিনই তারা কুলসুমকে খুন করার পরিকল্পনা এঁটেছিলো। কিন্তু খুনটা কে গিয়ে করবে, তাতে ভুল বুঝাবুঝি হয়ে যায়। ফলে অন্ধকার কক্ষে তারাই কুলসুম মনে করে একে অপরকে হত্যা করে ফেলে।
ততোক্ষণে কুলসুম প্রাসাদ থেকেই নয় শুধু কার্ক থেকেও বেরিয়ে গেছে। সেদিনই বকর তার গোয়েন্দা সঙ্গীদের মারফত জানতে পারে, হিত্তীনে ক্রুসেডারদের অত্যন্ত শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। কার্কের গোয়েন্দারাই তাকে পরামর্শ দিয়েছে, তুমি কুলসুমকে নিয়ে পালিয়ে যাও। রাতে দুর্গের ফটক খোলানো কুলসুমের পক্ষে ব্যাপার নয়। সকলেই জানে, এই মেয়েটি প্রিন্স অর্নাতের প্রেপাম্পদ। বকর ইবনে মুহম্মদ সায়বাল সেজে তাকে ঘোটক্যানে করে নিয়ে যাচ্ছে। হেরেমের কোনো নারী কুলসুমকে যেতে দেখেনি।
