সারাটা দিন যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। রাতে মুসলমান কমান্ডোরা দুশমনকে অস্থির করে রাখে। দুশমনের ফৌজ ও ঘোড় পিপাসার্ত। পানি মুসলমানদের দখলে। গেরিলারা দুশমনকে পানির সন্ধানে যেতে দিচ্ছে না। পরদিন ক্রুসেডাররা টিলায় চড়ে যুদ্ধ করে। মুসলমানরা এগিয়ে এসে এসে আক্রমণ করতে থাকে। কিন্তু উপরে থাকায় ক্রুসেডাররা আজ বেশি সুবিধা ভোগ করছে। মুসলমানরা টিলা ঘেরাও করে উপরে উঠতে শুরু করে। পদাতিক তীরন্দাজরা উপর থেকে তাদের উপর তীর ছুঁড়তে শুরু করে। এমন সময়ে ক্রুসেডাররা দেখে, তাদের কমান্ডারের ঝাণ্ডা দেখা যাচ্ছে না। তখনই জানা গেলো, কমান্ডার রেমন্ড যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছেন। অথচ, তিনি বড় ক্রুশের উপর হাত রেখে জোটের শরীকদের অনুগত থাকার এবং রনাঙ্গনে পিঠ না দেখানোর শপথ নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, হিত্তীনের এই যুদ্ধে বড় কুশটা নিয়ে আসা হয়েছিলো।
ক্রুসেডারদের পলায়নের পথ বন্ধ। এখন তারা প্রতিরক্ষা যুদ্ধ লড়ছে। উঁচু স্থানগুলো তাদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ঐদিনটিও কেটে গেছে। মুসলিম সৈন্যরা বিপুল পরিমাণ শুষ্ক ঘাস ও কাঠ সংগ্রহ করে ক্রুসেডারদের চারপার্শ্বে আগুন ধরিয়ে দেয়। রাতে আইউবীর সৈন্য ঘাস-লাকড়ি সংগ্রহ করে আগুনের তেজ বৃদ্ধি করতে থাকে। সারাদিনের পিপাসাকাতর ও ক্লান্ত খৃস্টান সৈন্যরা টিলার উপর ঝলসে যেতে থাকে। তাদের একটি ইউনিট পালাবার চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলমানরা তাদের একজনকেও জীবন নিয়ে যেতে দেয়নি। পরদিন ক্রুসেডাররা অস্ত্র সমর্পণ করে এবং সেনাপতিগণসহ সকলে সুলতান আইউবীর হাতে বন্দি হয়ে যায়।
***
সুলতান আইউবীর বাহিনীর অপর তিন অংশ বিভিন্ন স্থানে কখনন ক্রুসেডারদের পার্শ্বের উপর আক্রমণ করছে ও বেরিয়ে যাচ্ছে, কখনো পেছনের উপর হামলা চালিয়ে এদিক-ওদিক সরে যাচ্ছে। এক-দুটি প্লাটুন এমন ধারায় দুশমনের সম্মুখে অবস্থান নিয়ে আছে যে, তারা এই সম্মুখে এগিয়ে যাচ্ছে, তো এই পিছিয়ে আসছে। এভাবে দুশমন হিত্তীনের ময়দানে এসে পড়ে। কিন্তু ততক্ষণে তারা এবং তাদের ঘোড়াগুলো পিপাসায় আধমরা হয়ে গেছে।
১১৮৭ সালের ৩ জুলাই। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী হিত্তীনের জন্য যে পরিকল্পনা ঠিক করে রেখেছিলেন, এদিনে সে অনুপাতে অভিযান শুরু করেন। এ দিনটিও ছিলো পবিত্র জুমার বরকতময় দিন। ইতিপূর্বে গোয়েন্দারা। যাদের মধ্যে কুলসুম ও বকর উল্লেখযোগ্য- রিপোর্ট করেছিলো, সাত খৃস্টান জোট বেঁধেছেন। মোকাবেলায় সুলতান আইউবীর সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করার তো সুযোগ ছিলো না। কিন্তু তিনি যুদ্ধকৌশল, বাহিনীর বণ্টন, বিন্যাস, কমান্ডো গেরিলাদের ব্যবহার, তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা, রণাঙ্গনে দ্রুত চলাচলের ধরণ ইত্যাদিতে রদবদল করে নিয়েছেন এবং নতুন করে কিছু কার্যকর কৌশল ঠিক করে রেখেছেন। তিনি দুশমনকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হিত্তীনে নিয়ে এসেছেন। আশপাশের দুর্গ এবং বসতিগুলোও দখল করে নিয়েছেন। পানির উৎস তার নিয়ন্ত্রণে। ঋতুর রুদ্ররোষও তার পক্ষে।
শত্রু বাহিনী যখন হিত্তীন এসে উপনীত হয়, তখন তারা জানতো না, তারা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিপুণভাবে পাতা জালে এসে অনুপ্রবেশ করেছে। আইউবীর গেরিলা বাহিনী দুশমনের পাহারা চৌকি, টহল সেনা, আউটপোস্ট এবং রসদের জন্য প্রলয় সৃষ্টি করে রেখেছে। রাতে তারা না শত্রুসেনাদের আরাম করতে দিচ্ছে, না সেনাপতিদের ভাবনা-চিন্তার সুযোগ দিচ্ছে।
১১৮৭ সালের ৪ জুলাই সুলতান আইউবীর বাহিনীর মধ্যম অংশ মুখোমুখি আক্রমণ করে বসে। টিলা-টিপির কারণে যুদ্ধের অঙ্গনটা সংকীর্ণ। ক্রুসেডাররা এদিক-ওদিক থেকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে মুসলিম সেনারা তৎপর হয়ে ওঠছে। তীরন্দাজগণ উঁচুতে অবস্থান গ্রহণ করে ক্রুসেডারদের উপর তীর ছুঁড়ছে। সুলতান আইউবী একবার উপরে উঠছেন, আবার নীচে অবতরণ করছেন। তাঁর দূত সংবাদ-বার্তা আদান-প্রদান করছে। লোহার বর্ম খৃস্টান নাইটদের পুড়ে মারছে। তাদের ঘোড়াগুলো পিপাসায় কাতর। সম্মুখে পানি দেখা যাচ্ছে, যা তাদের পিপাসাকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। কিন্তু পানির দখল আইউবীর হাতে।
ক্রুসেডাররা হেডকোয়ার্টারে সাহায্যের আবেদন পাঠায়। অল্প সময়ে সাহায্য তথা নতুন সৈন্য এসে পড়ে। শেষবারের মতো তারা একটা জবাবি আক্রমণ চালায়।
তারা মুসলিম বাহিনীর যে অংশটির উপর আক্রমণ চালায়, তার সেনাপতি তকিউদ্দীন। আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তিনি তার বাহিনীকে অর্ধ বৃত্তাকারে বিন্যস্ত করে দেন। দুশমন সোজা ধেয়ে আসে। তকিউদ্দীন বৃত্তের মুখ বন্ধ করে দেন। ক্রুসেডাররা তার বেষ্টনীতে আটকা পড়ে যায়। মুসলিম অশ্বারোহীরা তাদের কেটে-পিষে ফেলে।
এখন যুদ্ধের অবস্থাটা হলো, ক্রুসেডাররা হিত্তীনের ময়দানে প্রতিরক্ষা যুদ্ধ লড়ছে। হিত্তীন থেকে দূরে কোথাও তাদের যদিও কোনো ইউনিট থেকে গিয়ে থাকে, তাহলে মুসলমানরা তাদের সেখানেই বেকার করে দিয়েছে। এই প্রথম ও শেষবারের মতো আক্রার পাদ্রী বড় কুশসহ রণাঙ্গনে উপস্থিত রয়েছেন। তিনি মনে বড় আশা নিয়ে এসেছিলেন। খৃষ্টান সম্রাটগণ এই ক্রুশেই হাত রেখে আমৃত্যু অটল থেকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সম্রাটগণ তার আশার গুড়ে বালি ছিটিয়ে পিঠ দেখাতে শুরু করেছেন। গাই অফ লুজিনান দুজন সঙ্গীসহ পালাতে শুরু করলে মুসলিম সৈনিকরা দেখে ফেলে এবং তাকে জীবিত ধরে ফেলে।
