আপনারা জানেন, আমি প্রতিটি অভিযান পবিত্র জুমা দিবসে শুরু করে থাকি। আমি সেই সময়ে রওনা হবো, যখন মসজিদগুলোতে মুসলমানরা খুতবা শ্রবণ করবে। এটা দুআ কবুল হওয়ার সময়। আমি প্রতিটি পাড়া মহল্লায় নির্দেশনা প্রেরণ করেছি, জুমার দিবসের দুআয় যেনো মুসল্লিরা সেই মুজাহিদদের কথা স্মরণ রাখে, যারা জুমার নামায থেকে বঞ্চিত হয়ে যুদ্ধের ময়দানে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়ে, আবার উঠে দাঁড়ায় এবং জুমা না পড়তে পারার কাফফারা রক্তের নজরানা দ্বারা আদায় করে। আর এ সময়টা ঠিক সেই সময়, যখন সূর্যটা মাথার উপরে থাকবে এবং লোহাকে কামানের চুল্লির ন্যায় উত্তপ্ত করে তুলবে।
আর এই দেখুন, এটা গ্যালিলির ঝিল আর এটা হচ্ছে নদী তরবারীটাকে লাঠির ন্যায় নকশার উপর মেরে মেরে সুলতান আইউবী বললেন- আর এটা হলো অত্র অঞ্চলের একমাত্র পুকুর, যাতে পানি আছে। বাদ বাকি সব পুকুর-কূপ শুকিয়ে গেছে। এই সেই মাস, যাকে ক্রুশের পূজারীরা জুন বলে থাকে। আমাদেরকে পানি আর দুশমনের মধ্যখানে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। আমি মুখের ভাষায় দুশমনকে পানি থেকে বঞ্চিত করে ফেলেছি। বাস্তবে তাদেরকে পিপাসায় মারা আপনাদের কাজ। দুশমন হিত্তীনের এই অঞ্চলে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করব। কিন্তু আমি তাদেরকে এখানেই যুদ্ধ করাবো। আমি ফৌজকে চার ভাগে বিভক্ত করেছি। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, মুজাফফর উদ্দীন এবং আমার পুত্র আল-আফজাল আমাদের মাঝে উপস্থিত নেই। তারা বাহিনীর একটি অংশকে নিয়ে গ্যালিলি ঝিলের দক্ষিণ দিয়ে জর্ডান নদী পার হয়ে গেছে। এই বাহিনীটি তুর পর্বত পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। বোধ হয় পৌঁছে গেছে। এটা একটা ধোকা, যা আমি দুশমনকে প্রদান করছি।
সুলতান আইউবী ফৌজের অবশিষ্ট তিন অংশের বিস্তারিত এবং তাদের মিশন বর্ণনা করেন। তার একটি অংশ সুলতান নিজের সঙ্গে রাখেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই বাহিনীকে রিজার্ভ এবং টাস্কফোর্স হিসেবে ব্যবহার করার কথা ছিলো। শেষ পর্যায়ে চূড়ান্ত অপারেশনে অংশ নেয়া এদের দায়িত্ব ছিলো। সবগুলো অংশকে বিভিন্ন স্থান দিয়ে নদী পার করিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্রুসেডাররা তাদের গুপ্তচর ও সোর্সদের মাধ্যমে এই গতিবিধি প্রত্যক্ষ করছিলো। কিন্তু বুঝে ওঠতে পারছিলো না, আইউবীর পরিকল্পনাটা কী। সুলতান আইউবী নিজে গ্যালিলি ঝিলের পশ্চিম তীর হয়ে তাবরিয়া নামক স্থানে এক পাহাড়ের উপর গিয়ে ছাউনি ফেলেন।
***
ক্রুসেডাররা আরো একটি প্রতারণার শিকার হয়। সুলতান আইউবী সাধারণত কমান্ডো ধরনের যুদ্ধ লড়তেন, গেরিলা আক্রমণ চালাতেন। স্বল্প থেকে স্বল্পতর সংখ্যক সৈন্য দ্বারা দুশমনের বিপুল সৈন্যের উপর আঘাত করো, পালিয়ে যাও নীতি অনুযায়ী হামলা করতেন এবং দুশমনকে ছড়িয়ে দিতেন। ক্রুসেডাররা সুলতান আইউবীর এ ধারার যুদ্ধেরই মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতো। তার বাহিনীর যে অংশটি মুজাফফর উদ্দীন ও আল-আফজালের কমান্ডে নদী পার হয়ে গিয়েছিলো, সেটি ক্রসেডারদের সেনা চৌকিগুলোর উপর গেরিলা হামলা করতে শুরু করে দিয়েছে। এতে ক্রুসেডাররা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়ে যে, সুলতান আইউবী তার বিশেষ ধারায়ই যুদ্ধ করবেন। কিন্তু এই যুদ্ধে তাঁর পরিকল্পনা ভিন্ন। কমান্ডো সেনাদের তিনি যথারীতি সেই মিশনই বুঝিয়ে দেন, যা প্রতিটি যুদ্ধে দিয়ে থাকেন।
খৃস্টান ফৌজ দুর্গের ভেতরেও আছে, বাইরেও আছে। সুলতান আইউবী দ্রুতগতিতে তার বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যস্ত করে ফেলেন যে, গ্যালিলি ঝিলের এবং উক্ত অঞ্চলের একমাত্র পানির পুকুরটি তার দখলে এসে যায়। খৃস্টান বাহিনীর একটি অংশ সাইফুরিয়া নামক স্থানে সমবেত হয়। কিন্তু সুলতান আইউবী সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে তাবরিয়ায় বসে থাকেন। তিনি দুশমনকে হিত্তীনের নিকটে নিয়ে আসতে চাইছেন। যখন দেখলেন, ক্রুসেডাররা সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে না, তখন তিনি পদাতিক বাহিনীকে খানিক সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে অল্প কিছু সৈন্য নিয়ে তাবরিয়ার উপর আক্রমণ করে বসেন এবং আদেশ জারি করেন, তাবরিয়াকে ধ্বংস করে নগরীতে আগুন লাগিয়ে দাও। তার আদেশ পালিত হয়।
তাবরিয়ার দুর্গ নগরী থেকে সামান্য দূরে। ফৌজ দুর্গে ছিলো। নগরীকে রক্ষা করার জন্য ফৌজ দুর্গ থেকে বেরিয়ে নগরীর উদ্দেশে রওনা হয়। সুলতান আইউবী তাদের পথরোধ করে ফেলেন। তিনি বাহিনীর অপর অংশকে বিভিন্ন দিকে রওনা করিয়ে দিয়েছিলেন। ক্রুসেডারদের যে বাহিনী দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসেছে, তার কমান্ডার হলেন সম্রাট রেমন্ড। তাবরিয়ার পাথুরে অঞ্চলে তার ও সুলতান আইউবীর মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ সেই যুদ্ধের চোখে দেখা চিত্র এভাবে অংকন করেছেন
উভয় বাহিনীর আরোহী সেনারা প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথমে সমুখের অংশটি তীর চালাতে চালাতে পরস্পরের দিকে এগিয়ে যায়। পরে পদাতিক বাহিনীকেও মাঠে নামানো হয়। ক্রুসেডাররা চোখে মৃত্যু দেখতে শুরু করে। মুসলমানদের পেছনে নদী এবং সামনে শত্রু। পেছনে সরে যাওয়ার জন্য তাদের কোনো জায়গা নেই। সে কারণে উভয় বাহিনী এমন উন্মাদের ন্যায় লড়াই করে, যার বিবরণ বলে বুঝানো সম্ভব নয়।
