এমন যেনো না করো- বকর ইবনে মুহম্মদ বললো- ফৌজ নগরীতে ঢুকে পড়লে আমরা চোখ রাখবো, যেন তিনি পালাতে না পারেন। নতুন কোনো খবর?
অর্নাত নজর রাখছিলেন, সুলতান আইউবী কোন্ দিকে অগ্রযাত্রা করেন- কুলসুম বললো- এখন পরিস্থিতি অন্য কিছু হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম বলতেন, আইউবী ফৌজ নিয়ে গ্যালিলি ঝিলের দিকে যাচ্ছেন।
বেশিক্ষণ থাকা যাবে না- বকর বললো- চলো, ফিরে যাই।
***
পরদিন ভোর বেলা। কার্কের পাঁচিলের উপর দূরপাল্লার ধনুক হাতে তীরন্দাজগণ দণ্ডায়মান। পাথর ও অগ্নিগোলার পাতিল নিক্ষেপকারী মিনজানিক স্থাপন করা হয়েছে। ফৌজ প্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রিন্স অর্নাত পাঁচিলের উপর দাঁড়িয়ে সুলতান আইউবীর বাহিনীর প্রতি তাকিয়ে আছেন। এততক্ষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এটি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীরই বাহিনী। তবে সুলতান নিজে সঙ্গে আছেন কিনা জানা যায়নি। কিন্তু বাহিনীর মধ্যে অবরোধ জাতীয় কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তবু স্থাপন করা আছে। সৈনিকরা স্বাভাবিক ক্রিয়া-কর্মে রত।
এ দিনটি কেটে গেছে। তারপর অতিবাহিত হয়ে গেছে আরো ছয় দিন। অর্নাতের অপেক্ষার পালা যত দীর্ঘ হচ্ছে, অস্থিরতা তত বাড়ছে। তিনি যে বিষয়টি জানতে পারেননি, তা হচ্ছে, রাতে সুলতান আইউবী তার অশ্বারোহী কমান্ডো বাহিনীটিকে সে পথে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছেন, যে পথে হাজীদের কাফেলার আসবার কথা। দিন কয়েক পর প্রথম কাফেলাটি আসতে দেখা গেলো। এটি মিসরের কাফেলা। সুলতান আইউবীর অশ্বারোহী বাহিনীটি তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কাফেলা সুলতানের তাবু অঞ্চলের সন্নিকটে পৌঁছুলে তিনি ছুটে এগিয়ে গিয়ে হাজীদের সঙ্গে মুসাফাহা করেন। পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে সকলের হাতে চুমো খান এবং বিশ্রাম ও আহারের জন্য তাবুতে নিমন্ত্রণ জানান। আইউবীর কমান্ডোরা বহুদূর পর্যন্ত কাফেলার সঙ্গে গমন করে। একদিন পরই সিরীয় হাজীদের কাফেলাও এসে পড়ে। সুলতান তাদেরও স্বাগত জানান, আপ্যায়ন করেন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিদায় জানান।
এ সময়ে কার্কের অভ্যন্তরে খৃস্টান বাহিনী প্রস্তুত অবস্থায় অবস্থান করে। জনমনে আতঙ্ক ছেয়ে গেছে। সুলতান আইউবীর গোয়েন্দারা নিজ নিজ কর্তব্য পালনে ব্যস্ত থাকে। এক সকালে অর্নাত সংবাদ পান, সুলতান আইউবীর ফৌজ চলে যাচ্ছে। অর্নাত শুধু এটুকু দেখলেন যে, হাজীদের দুটি কাফেলা সুলতান আইউবীর বাহিনীর হেফাজতে অতিক্রম করে গেছে। শুধু সুলতান আইউবীর গোয়েন্দারাই জানে, আসল কাহিনী কী ছিলো। সুলতান রওনা দেয়ার আগে গোয়েন্দাদের জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা অন্যত্র যাচ্ছি। গোয়েন্দারা সুলতানকে অর্নাতের গতিবিধির খোঁজ খবর জ্ঞাত করতে থাকে।
১১৮৭ সালের ২৭ মে। সুলতান আইউবী এশতরা নামক স্থানে ছাউনি স্থাপন করেন। সেখানে মিসর ও সিরিয়ার ফৌজ তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়। সুলতানের জ্যেষ্ঠ পুত্র আল-মালিকুল আফজাল- যার বয়স ষোল বছর প্রখ্যাত সেনাপতি মুজাফফর উদ্দীনের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হয়। এভাবে তার সমস্ত বাহিনী একত্রিত হয়ে যায়। তিনি সকল সালার ও নায়েব সালারদের সর্বশেষ দিক-নির্দেশনার জন্য একত্রিত করেন। সুলতান বললেন
আমার বন্ধুগণ! আল্লাহ আপনাদের সাহায্য করুন। অন্তর থেকে আপন-পরিজন ও বাড়ি-ঘরের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিন। হৃদয়ে প্রথম কেবলার ভাবনা ঠাই করে নিন এবং যে মহান আল্লাহ আমাদেরকে মুসলমানের প্রথম কেবলাকে ক্রুসেডারদের অপবিত্র দখল থেকে মুক্ত করার এবং কাফেরদের হাতে সম্ভ্রম হারানো বোন-কন্যাদের লাঞ্ছনার প্রতিশোধ নেয়ার তাওফীক দান করেছেন, তাকে স্মরণ রাখুন।
আজ আমরা বাস্তব কথা বলবো। আমাদের সংখ্যা শত্রুর মোকাবেলায় কম। আমাদের মোকাবেলা সাতজন খৃস্টান সম্রাটের সঙ্গে, যাদের সঙ্গে থাকবে মাথা থেকে পা পর্যন্ত বর্মাবৃত দুহাজার দুশত নাইট। বাদ বাকি সৈন্যরাও আধা-বর্মাচ্ছাদিত। তদুপরি এই বাহিনীর জন্য সুবিধাটা হচ্ছে, তাদের ঠিকানা নিকটে এবং এই সমগ্র অঞ্চল নিজেদের, যেখানে তাদের রসদের সমস্যায় পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমাদের দুটি যুদ্ধ লড়তে হবে। সরাসরি শত্রুর মোকাবেলায় এবং আমাদের যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, তার মোকাবেলায়। এই সংকট-সমস্যা আমাদেরকে শত্রুর দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
নকশাটা সামনে মেলে ধরে সুলতান আইউবী যুদ্ধক্ষেত্র কোন্টা হবে তরবারীর আগা দ্বারা সকলকে দেখিয়ে দেন। যেসব সালার অঞ্চলটা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন, তারা চমকে ওঠে সুলতান আইউবীর দিকে তাকান। তাদের চোখে বিস্ময়। সুলতান তাদের বিস্ময়ভাব বুঝে ফেলে মুচকি হাসলেন।
এটা হিত্তীনের উপকণ্ঠীয় ময়দান- সুলতান আইউবী বললেন আপনারা ভাবছেন, এ অঞ্চল তো শুকিয়ে যাওয়া গাছের বাকলের ন্যায় শুষ্ক, উঁচু-নিচু এবং ঋতুর নির্মমতায় চৌচির। আরো ভাবছেন, এই এলাকার মাটি এতোই পিপাসু যে, মানুষ-ঘোড়া যাকেই পাবে, রক্ত চুষে খাবে। আপনারা দেখেছেন, তার এখানে-সেখানে উঁচু-নিচু পাথরখণ্ড ছড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, জায়গাটা ঠিকই ঘাস-পাতা, তরুণতাহীনই এবং পিপাসাকাতরও। রোদের সময় লোহার ন্যায় উত্তপ্ত থাকে। আপনাদের জিজ্ঞাসু চোখে যে প্রশ্নটি উঁকি-ঝুঁকি মারছে, আমি তা বুঝি। আপনারা আমাকে জিজ্ঞেস করতে চাইছেন, সে কোন্ বাহিনী, যারা নরকময় এই অঞ্চলে যুদ্ধ করতে পারবে? হ্যাঁ, সে আমাদের বাহিনী। আপনাদের হাল্কা পাতলা আরোহী সৈন্যরা এই অঞ্চলে প্রজাপতির ন্যায় উড়ে বেড়াবে আর লোহার ভারি পোশাকে আবৃত নাইট আর অধ-বর্মপরিহিত খৃস্টান সৈন্যদের নাচাতে থাকবে। দুশমনের এই আরোহী ও পদাতিক সৈন্যরা লোহার উত্তাপে অল্প সময়ে পিপাসায় বেহাল হয়ে যাবে এবং লোহার ভার তাদেরকে অতোটুকু ছুটে বেড়াতে দেবে না, যতোটুকু ছুটে বেড়াবে আমাদের সৈন্যরা।
