যুদ্ধবিদ্যার খুঁটিনাটি ও সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয়াবলী বোঝেন এমন সব সামরিক বিশ্লেষক ও ঐতিহাসিকগণ সুলতান আইউবীর অন্যান্য গুণাবলী ছাড়াও তাঁর ইন্টেলিজেন্স, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ও কমান্ডো অপারেশনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বকর ইবনে মুহম্মদের ন্যায় গোয়েন্দাদের আপন জীবনকে মৃত্যুর মুখে রেখে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেসব তথ্য সুলতানের নিকট পৌঁছানো সে আরেক বাস্তবতা। কুলসুমের ন্যায় নির্যাতিতা মেয়েরা রাজকীয় বিলাসী জীবন পরিত্যাগ করে নিজ নিজ উদ্যোগে ইসলামী বাহিনীর সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিলো। ইতিহাস এই অখ্যাত গাজী ও শহীদদের নাম জানাতে অপারগ, যারা পর্দার আড়ালে এবং মাটির নীচে যুদ্ধ করে হিত্তীনকে ইসলামের মর্যাদার সুমহান প্রতাঁকে পরিণত করেছিলো।
সুলতান আইউবী সবসময় যুদ্ধের জন্য জুমার দিন রওনা হতেন। কারণ, এটি পুণ্যময় ও বরকতময় দিন। এই মুবারক দিনে প্রত্যেক মুসলমান মহান আল্লাহর সমীপে সেজদাবনত হয়ে থাকে। আর সৈনিক যখন আপন জাতিকে ইবাদতে নিমগ্ন রেখে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হয়, তখন সমগ্র জাতির দুআ তাদের সঙ্গ নেয়। হিত্তীন অভিমুখে রওনা হওয়ার জন্যও সুলতান এই জুমার দিনটিকে নির্বাচন করেন। ১১৮৭ সালের ১৫ মার্চ। সুলতান আইউবী ফৌজের মাত্র একটি অংশকে সঙ্গে নিয়ে কাকের সন্নিকটে এক স্থানে গিয়ে ছাউনি ফেলেন।
খৃস্টান গুপ্তচররা তৎক্ষণাৎ তাদের জোট বাহিনীকে সংবাদ পেঁছিয়ে দেয়, সুলতান আইউবী কার্কের সন্নিকটে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তা থেকে বুঝে নেয়া হয়, সুলতান কার্ক অবরোধ করবেন। কিন্তু আসলে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মিসর ও সিরিয়ার হজ্ব কাফেলী। হাজীরা হজ্ব সম্পাদন করে ফিরে আসছে। তাদের উপর কার্কের অদূরেই আক্রমণ হয়ে থাকে। কার্কের শাসনকর্তা প্রিন্স অর্নাত এ কাজে বেশ পারঙ্গম। কাফেলাগুলোকে নিরাপদে এলাকাটা পার করিয়ে দেয়ার জন্যই সুলতান আইউবী এখানে এসে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাঁর আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি ক্রুসেডারদের ধোকা দিতে চান, যেনো তারা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়। তিনি তাঁর সালারদেরকে সকল পরিকল্পনা অবহিত করে রেখেছেন।
***
কার্কের রাজপ্রাসাদে যেনো কম্পন শুরু হয়েছে। প্রিন্স অর্নাতকে মধ্যরাতে ঘুম থেকে জাগ্রত করে বলা হলো, বিশাল এক বাহিনী নগরীর অনতিদূরে ছাউনি ফেলছে। অর্নাত ধড়মড় করে উঠে বসেন। সালাহুদ্দীন আইউবী ছাড়া আর কে হতে পারে! কুলসুমও অর্নাতের শয্যায় শায়িত ছিলো। কথার শব্দে জাগ্রত হয়ে সেও অনাতের সঙ্গে দৌড়ে নগরীর প্রধান ফটকের উপর দিককার প্রাচীরের উপর উঠে যায়। ওখানে হাজার হাজার প্রদীপ জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। তাবু স্থাপন করা হচ্ছে। রাতের নিস্তব্ধতায় ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনির শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
অর্নাত তার বাহিনীকে অবরোধের মধ্যে যুদ্ধ করার জন্য প্রাচীরের উপর দাঁড় করিয়ে দেন। ফটকের উপর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্ত করা হয়। অর্নাত ছুটে বেড়াচ্ছেন। কুলসুমের কোনো খেয়াল নেই তার। কুলসুম ফিরে গিয়ে দেখতে পায়, অর্নাতের রক্ষী বাহিনী জাগ্রত হয়ে আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। এক স্থানে সেই ঘোটকযানটি দণ্ডায়মান, যেটিতে করে কুলসুম নাসেরা গিয়েছিলো এবং ভ্রমণে বের হয়েছিলো। তার পার্শ্বে বকর ইবনে মুহম্মদ প্রস্তুত দাঁড়িয়ে আছে। ওখানকার প্রতিজন মানুষ যার যার ডিউটিতে চলে গেছে।
কুলসুম আদেশের সুরে বকরকে বললো- সায়বাল! গাড়িটা এদিকে নিয়ে আসো।
বকর গাড়ি নিয়ে এলে কুলসুম তাতে চড়ে বসে এবং তাকে একদিকে নিয়ে যায়। অর্নাতের হেরমের নারীরাও জাগ্রত হয়ে বেরিয়ে এসেছে। তারা তাদের ভাষায় প্রিন্সেস লিলিকে গাড়োয়ানকে আদেশ দিতে এবং গাড়িতে চেপে বসে যেতে দেখেছে। একজন দাঁত কড়মড় করে বললো- এই হতভাগী মুসলমানের বাচ্চাটা নিজেকে রাণী ভাবতে শুরু করেছে। ওকে, নিশানা বানাতেই হবে।
সময় এসে গেছে- আরেকজন বললো- সালাহুদ্দীন আইউবীর অবরোধ খুব ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে। তিনি আগুন নিক্ষেপ করবেন, মিনজানিকের সাহায্যে পাথর ছুঁড়বেন। ভেতরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবেন। এরূপ অস্থিতিশীল মুহূর্তের কোনো এক সুযোগে আমরা ডাইনিটাকে ঠিকানা লাগিয়ে দেবো।
তোমার প্রেমিক প্রবর সেনাপতিটাও তো কিছু করতে পারলো না। তৃতীয়জন বললো।
কিছু করবার লোক আরো বহু আছে- সে উত্তর দেয়- কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের অবস্থা দেখো। তারপরে প্রিন্স অর্নাত অন্য কোনো প্রিন্সেসকে খুঁজে বেড়াতে বাধ্য হবেন।
কুলসুম গাড়িটা এক অন্ধকার স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখে। বকর গাড়ির সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। কুলসুম তাকে জিজ্ঞেস করে- আমাদের লোকেরা কি ভেতর থেকে ফটক খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারে না?
চেষ্টা করা হবে- বকর বললো- এই ফৌজ যদি আমাদের হয়ে থাকে, তাহলে আমার বিস্ময় লাগছে, আমাদেরকে আগে অবহিত করা হলো না কেননা! সুলতান আইউবী তো এমন ভুল করেন না। আমার সন্দেহ হচ্ছে। সকালে জানতে পারবো, এ কার ফৌজ।
আমরা কি এখান থেকে পালাতে পারবো? কুলসুম জিজ্ঞেস করে।
পরিস্থিতি বলবে। বকর উত্তর দেয়।
এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে আমি অর্নাতকে হত্যা করতে পারি। কুলসুম বললো।
