আপনারা কয়েক বছর যাবত অবিরাম যুদ্ধ করে আসছেন। কিন্তু আসল যুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। মস্তিষ্কে এই যুদ্ধের লক্ষ্য তাজা করে নিন। সিদ্ধান্ত নিন, আমাদেরকে একটি স্বাধীন ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে জীবিত থাকতে হবে এবং আল্লাহ পাকের মহান ধর্মকে কুফরের অশুভ ছায়া থেকে মুক্ত রাখতে হবে। মুহাম্মদ ইবনে কাসিম ও তারিক ইবনে যিয়াদ সালতানাতে ইসলামিয়াকে যে পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন, আমাদেরকেও ইসলামী সাম্রাজ্যকে সে পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। তাদের পরে আগত বংশধরদের কর্তব্য ছিলো, আল্লাহর পয়গামকে সেখান থেকেও সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যেতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তার পরিবর্তে আমাদের ধর্মের শত্রুরা আমাদের ঘরে এসে জেঁকে বসেছে এবং তারা খানায়ে কাবা ও রওজায়ে মুবারককে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। কেন, এমনটা কীভাবে সম্ভব হলো? যেখানে মস্তিষ্কে রাজত্বের উন্মাদনা চেপে বসে, সেখানে সীমান্ত অনিরাপদ হয়ে পড়ে এবং আমীর-শাসকরা ক্ষমতার খাতিরে আপন ধর্ম ও আত্মমর্যাদাবোধকে বিসর্জন দিয়ে দেন।
আমাদের পতনের কারণ ক্ষমতার গদির নেশা এবং সম্পদের মোহ। তারা পৃথিবীর উপর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আর এখন পৃথিবী আমাদের উপর রাজত্ব করছে। আমরা আখেরাতকে ভুলে বসেছি। আমরা শত্রু-বন্ধুর পরিচয় জানি না। আমাদের সামরিক চেতনার উপর ধ্বংসশীল জগতের স্বপ্নের যাদু প্রভাব বিস্তার করে বসেছে। মনে রাখুন আমার বন্ধুগণ! আমি আপনাদেরকে বহুবার বলেছি, জাতির ভাগ্য তরবারীর আগা দ্বারা লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। সেনাপতি যখন সিংহাসনে বসে মাথায় মুকুট পরিধান করে, তখন তার হাতে কোষ থেকে তরবারীটা বের করার শক্তি তাকে না। তাদের হৃদয়ে আপন বোধ-বিশ্বাস ও স্বজাতির মর্যাদা সুরক্ষার চেতনা থাকে না। শেষে ধর্মটা প্রতারণার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া ব্যতীত আর কোনো কাজের থাকে না।
আজ আমরা ইসলামের মর্যাদার খাতিরে শুধু এ জন্য আপন ঘর পরিজন ত্যাগ করে বেরিয়ে আসতে এবং দুশমনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে সক্ষম হয়েছি যে, আমরা ক্ষমতার পূরজারীদের খতম করে দিয়েছি। আমরা আস্তিনের সাপগুলোর মস্তক পিষে ফেলেছি। তারপরও আমরা যদি হেরে যাই, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের নিয়ত ঠিক ছিলো না।
সুলতান আইউবী এরূপ আবেগময় এবং দীর্ঘ ভাষণদানে অভ্যস্ত নন। কিন্তু যে লক্ষ্যে তিনি বের হচ্ছেন, তার জন্য সকলকে মানসিক ও আত্মিকরূপে প্রস্তুত করা জরুরি। এরা তাঁর অনুগত ও বিশ্বস্ত সালার-নায়েব সালার। তাদের মধ্যে মুজাফফর উদ্দীনের ন্যায় সুযোগ্য ও দুঃসাহসী সালারও উপস্থিত আছেন, যিনি এক সময় সুলতানের সঙ্গ ত্যাগ করে তার বিরোধী শিবিরে চলে গিয়েছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিলেন। তকিউদ্দীন, আফজালুদ্দীন, ফররুখ শাহ এবং আল-মালিকুল আদিলের ন্যায় সালারগণও তার সঙ্গে আছেন, যারা তার রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়। সালার কাকবুরী তার ডান হাত। সামরিক যোগ্যতা এবং চেতনার দিক থেকে তারা একজনও কম নন। কিন্তু সুলতান আইউবী এই প্রথমবার ফিলিস্তীনের মাটিতে আক্রমণ করতে যাচ্ছেন এবং তার গন্তব্য বাইতুল মুকাদ্দাস।
অভিযানটা সহজ নয়। ক্রুসেডারদের সামরিক শক্তি যেমন পরিমাণে বেশি, তেমনি মানে উন্নত। তাদের জন্য সুবিধাটা হচ্ছে, তারা প্রতিরক্ষার জন্য নিজ ভূমিতে লড়াই করবে, যেখানে তাদের রসদের কোনো সমস্যা নেই এবং তারা নিজ অবস্থানের নিকটে। সুলতান আইউবী নিজ অবস্থান থেকে বহু দূরে অভিযানে যাচ্ছেন, যেখানে পর্যন্ত তার রসদ পৌঁছার পথ ঝুঁকিপূর্ণ এবং দূরে। যুদ্ধবিদ্যার হিসাব মোতাবেক আক্রমণকারী পক্ষই বেশি সমস্যা-অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে থাকে। সে কারণে আক্রমণকারী পক্ষের সেনাসংখ্যা প্রতিপক্ষের তুলনায় তিনগুণ না হোক দ্বিগুণ তত বেশি হতেই হয়। কিন্তু সুলতান আইউবী আক্রমণকারী হওয়া সত্ত্বেও তার সেনাসংখ্যা প্রতিপক্ষের তুলনায় কম। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, এই যুদ্ধ দীর্ঘ লাভ করবে এবং ঘরে ফিরে আসা সম্ভব হবে না। তাই তিনি সালারদেরকে তারিক ইবনে যিয়াদের সেই অভিযানের কথা স্মরণ রাখতে বলে দিলেন, যাতে তিনি রোম উপসাগর অতিক্রম করে নৌকাগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে ফিরে যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে বেরিয়ে যায়।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় সুলতান আইউবীর উপর কী বিভীষিকা নেমে এসেছিলো শিরোনামে লিখেছেন
সুলতানের বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ প্রদান করেছেন। ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তাঁর প্রথম কর্তব্য। কাফেরদের সঙ্গে যুদ্ধ করা এবং পৃথিবীতে আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। অধিক থেকে অধিক রাজ্যকে আল্লাহর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিশ্ব মানবতাকে আল্লাহর অনুগত বানানো তাঁর প্রধান ব্রত। তিনি যেখানে তাঁর যতো বাহিনী ছিলো, সকলকে এশতরা নামক স্থানে সমবেত হওয়ার আদেশ জারি করেন। আদেশনামায় আল্লাহ পাকের নির্দেশের উদ্ধৃতিও উল্লেখ করেছেন।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দৃষ্টিভঙ্গী ভবিষ্যতের ঘন আধারের উপর উঁকি মারছে। তিনি হিত্তীনের অঞ্চলকে যুদ্ধের অঙ্গন বানানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। হিত্তীন ফিলিস্তীনের একটি অখ্যাত গাঁ। কিন্তু সুলতান আইউবী গ্রামটাকে এতোই মর্যাদা দান করেন যে, খৃষ্টজগতের সমর বিশ্লেষকগণ আজো পর্যালোচনা করে চলেছেন, ক্রুসেড যুদ্ধের এই হিরো কীরূপ কৌশল-স্ট্রাটেজি প্রয়োগ করে এমন শক্তিমান ও উন্নত অস্ত্রসজ্জিত শত্রুপক্ষকে এমন লজ্জাজনক পরাজয়ের মুখে নিপতিত করলেন, খৃষ্টানদের একজন ব্যতীত বাকি সব কজন সম্রাট যুদ্ধবন্দি হয়ে গেলেন!
