সুলতান আইউবী আর কী করতে চান? জিজ্ঞেস করে দলের এক সদস্য।
সুলতান আইউবী সালতানাতে ইসলামিয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি ক্রুশের সাম্রাজ্যে ইসলামের পতাকা উডডীন করার পরিকল্পনা তৈরী করেছেন। আমাদের যেসব গুপ্তচর সমুদ্রের ওপার থেকে এসেছিলো, তাদেরকে গ্রেফতার ও ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য আইউবী আলী বিন সুফিয়ানের তত্ত্বাবধানে বিশাল এক গ্রুপ তৈরি করেছেন। আল-বারূক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তিনি জানবাজদের একটি আলাদা বাহিনী গঠন করেছেন। তার পরিকল্পনা, তাদেরকে বিভিন্ন খৃষ্টরাজ্যে প্রেরণ করে গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতা চালাবেন। এই বাহিনীর প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। সালাহুদ্দীন আইউবীর পরিকল্পনা বড় ভয়াবহ। ক্রুসেড বিরোধী সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবেই তিনি সামরিক মহড়ার আয়োজন করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীতে সাত হাজার যুবক ভর্তি করেছেন। এখনো ভর্তি হচ্ছে। যারা ভর্তি হচ্ছে, তাদের মধ্যে সুদানীও রয়েছে। আমি উপর থেকে যে নির্দেশনা, পেয়েছি, তাহলো, আইউবীর বাহিনীতে পাপের বীজ বপণ করতে হবে। সৈন্যদের মনে নারী ও জুয়ার আসক্তি ঢুকিয়ে দিতে হবে। জবাব দেয় বৃদ্ধ।
বৃদ্ধ আরো জানায়, সুলতান আইউবীর সামরিক মহড়া সমাপ্ত হওয়ার পর পর সে সেনাদের মধ্যে নিজের লোক ঢুকিয়ে রেখেছে। তারা বড় বিচক্ষণতার সাথে সৈন্যদের মধ্যে জুয়া খেলা শুরু করিয়ে দিয়েছে। জুয়া আর নারী এমন এক বস্তু, যা মানুষকে চুরি ও খুন-খারাবিতে লিপ্ত করে। বৃদ্ধ আরো জানায়, বেশ্যা মেয়েদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আমি আইউবীর সেনা ক্যাম্পগুলোর আশপাশে ছড়িয়ে দিয়েছি। তারা এতই বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে যে, তারা যে পেশাদার পতিতা, তা কাউকে বুঝতে-ই দেয় না। সুলতান আইউবীর সৈন্যদেরকে পাপের পথে নিক্ষিপ্ত করার পাশাপাশি তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও সৃষ্টি করছে। বৃদ্ধ জানায়, ইতিমধ্যে আমার এই অভিযানের ফলও ফলতে শুরু করেছে। এই একেবারে তাজা খবর, দুজন সিপাহী রাতের আঁধারে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এসে একই সময়ে এক মেয়ের তাঁবুতে ঢুকে। মেয়েটির দখল নিয়ে তারা বিবাদে লিপ্ত হয়। সৈনিক মানুষ তো! এক কথা দু কথার পর যুদ্ধ বেঁধে যায় দুজনের মধ্যে। একজন খুন হয়ে যায় ঘটনাস্থলে-ই। অপরজনের ব্যাপারে শুনেছি, সে রক্তাক্ত অবস্থায় ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে মারা গেছে। এ রিপোর্ট চলে যায় সুলতান আইউবীর কাছে। তিনি আলী বিন সুফিয়ান ও আল-বার্ককে ডেকে ক্যাম্পে ক্যাম্পে গুপ্তচর ঢুকিয়ে এই চুরি, জুয়াবাজি ও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ উদঘাটনের নির্দেশ দেন। তাই আমাদের যে মেয়েগুলো এ কাজে নিয়োজিত আছে, আপনারা তাদের বলে দেবেন, যেন তারা ক্যাম্পের নিকটে না যায়।
বৈঠকে বৃদ্ধ আরো জানায়, আসেফা পাঁচ-ছয়দিন পর পর নতুন তথ্য জানাবার জন্য তার নিকট আসে। যে রাতে তার বাইরে বেরুবার প্রয়োজন পড়ে, সে রাতে আল-বার্ককে মদের সঙ্গে এক প্রকার নেশাকর পাউডার মিশিয়ে খাইয়ে দেয়। তার ক্রিয়ায় লোকটা ভোর পর্যন্ত অচেতন হয়ে পড়ে থাকে। বৈঠকে এ তথ্যও প্রকাশ করা হয় যে, মিশরের শহর-নগর ও গ্রাম-গঞ্জে গোপন বেশ্যালয় ও জুয়ার আডড়া প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়েছে। তার ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক। প্রশিক্ষিত সুন্দরী মেয়েরা সুশীল-সম্ভ্রান্ত পরিবারের যুবকদেরকে পাপের পথে নিক্ষেপ করে চলেছে। এখন থেকে চেষ্টা করতে হবে, মুসলিম মেয়েদের মধ্যেও কিভাবে এই অশ্লীলতা ছড়ানো যায়।
খৃষ্টান গুপ্তচরদের গোপন এই অধিবেশন সমাপ্ত হয়। তারা সকলে এক সঙ্গে বেরোয়নি। একজন বের হওয়ার দশ-পনের মিনিট পর বের হয় দ্বিতীয়জন। এভাবে একে একে সকলে চলে যায় আপন আপন ঠিকানায়। চলে যায় বৃদ্ধও। থেকে যায় শুধু আসেফা ও আরেকজন! অবশেষে আসেফাও মুখটা নেকাবে ঢেকে বেরিয়ে পড়ে লোকটার সঙ্গে।
***
আল-বার্কের ঘরে আসেফা এখনো এক রহস্যময়ী নারী। অন্যায় না হলেও আল-বারক কাউকে জানতে দেয়নি যে, সে আরেকটি মেয়েকে বৌ বানিয়ে ঘরে তুলেছে। এতকাল এক স্ত্রী নিয়ে ঘর করে চল্লিশ বছর বয়সে একটি সুন্দরী যুবতাঁকে বিয়ে করার কথা শুনলে বন্ধুরা ঠাট্টা করবে, এই তার ভয়। কিন্তু সে এ রহস্য বেশীদিন গোপন রাখতে পারেনি। শহর এবং সেনা ক্যাম্পগুলোর আশপাশে আলী বিন সুফিয়ান যে গুপ্তচরদের ছড়িয়ে রেখেছিলেন, তাদের মাধ্যমে তিনি রিপোর্ট পান, সামরিক মহড়ার পর থেকে শহরে জুয়া ও অপকর্ম বেড়ে চলেছে। একদিন এক গুপ্তচর আলী বিন সুফিয়ানকে রিপোর্ট দেয়, গত তিন মাসে সে চারবার দেখেছে, রাতে যখন সব মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে, তখন খাদেমুদ্দীন আল-বার্কের ঘর থেকে কালো চাদরে আবৃতা এক মহিলা বের হয়। ঘর থেকে বের হয়ে খানিক দূরে গেলে একজন পুরুষ তার সঙ্গ নেয়। গুপ্তচর জানায়, প্রথম দুবার সে এতটুকু-ই দেখেছে। তৃতীয়বার সে মহিলার পিছু নেয়। দেখে, মহিলাটি লোকটির সঙ্গে একটি ঘরে ঢুকে পড়েছে। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে বের হয়ে লোকটির সঙ্গে ফিরে যায়।
গুপ্তচর জানায়, গতরাতেও সে মহিলাটিকে আল-বার্কের ঘর থেকে বের হয়ে উক্ত লোকটির সঙ্গে যেতে দেখে তাদের পিছু নেয়। কিছুদূর গিয়ে তারা। আগের ঘরটিতে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসে অন্য একজনের সাথে। সেখান থেকে বেরিয়ে তারা প্রবেশ করে শহরের অপর একটি বিশাল ভবনে। গুপ্তচর ভবনটির বেশ দূরে একস্থানে অবস্থান নেয়। দীর্ঘসময় পর পনের-বিশ মিনিট অন্তর অন্তর ভবন থেকে একে একে বের হয় এগারজন লোক। সবশেষে সঙ্গী পুরুষটির সঙ্গে মহিলাটিও বের হয়। গুপ্তচর অন্ধকারে তাদের পিছু নেয়। আল-বার্কের ঘরের সামান্য দূর থেকে লোকটি চলে যায় অন্যদিকে। মহিলা ঢুকে পড়ে আল-বার্কের ঘরে।
