ফিরে এসে কুলসুম যখন তাবু এলাকায় নিজ তাঁবুর সামনে গাড়ি থেকে অবতরণ করে, তখন সে প্রিন্সেস লিলি আর বকর ইবনে মুহম্মদ সায়বাল। কুলসুম যখন গাড়ি থেকে অবতরণ করছিলো, তখন সায়বাল গাড়ির পার্শ্বে দাঁড়িয়ে গোলামের ন্যায় মাথানত করে দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটি যখন তাঁবুতে গিয়ে প্রবেশ করে, তখন প্রিন্স অর্নাত একটি মানচিত্রের উপর ঝুঁকে রয়েছেন। ঢুকেই কুলসুম বলে ওঠে- ভ্রমণে গিয়েছিলাম, শিকারও খেলেছি।
কী মেরেছ? অর্নাত মানচিত্র থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই জিজ্ঞেস করেন।
কিছুই না- কুলসুম উত্তর দেয়- সব কটা তীরই ব্যর্থ গেছে। তর্কে সত্বর শিকার মারার যোগ্যতা এসে যাবে। বলে সেও মানচিত্রের উপর ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করে- অগ্রযাত্রার চিত্র, নাকি প্রতিরক্ষার
অগ্রযাত্রা সালাহুদ্দীন আইউবী করবেন- অর্নাত অন্যমনঙ্কের ন্যায় বললেন- আর প্রতিরক্ষাও তাকেই করতে হবে। আমরা তাকে জালে টেনে আনছি। তার নিঃশ্বাস নাকের ডগায় এনেই তবে আমরা অগ্রযাত্রা করবো। তখন আমাদেরকে ঠেকাবার মতো কেউ থাকবে না। তুমি নিজ তাঁবুতে চলে যাও লিলি। আমাকে বহু কিছু ভাবতে হবে। আজ রাত আমাদের কনফারেন্স বসবে। তাতে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও মানচিত্র প্রস্তুত করা হবে। আমাকে সম্পূর্ণ ঠিক ঠিক পরামর্শ দিতে হবে। আমি এই অভিযানের হিরো হতে চাই।
***
তার নাম কুলসুম। বকর ইবনে মুহম্মদ তার সহকর্মী। সুলতান আইউবীর ইন্টেলিজেন্স বিভাগের উপ-প্রধান হাসান ইবনে আবদুল্লাহ সুলতানকে কার্কের গুপ্তচরদের প্রেরিত রিপোর্ট শোনান।
সুলতানের চোখ লাল হয়ে গেছে। তিনি বললেন- কে বলতে পারবে, আমাদের কতো কন্যা ঐ কাফেরদের কজায় আটক আছে এবং তাদের বিলাসিতার উপকরণে পরিণত হয়ে আছে। অনাতকে আমি ক্ষমা করবো না। মনে রাখবে হাসান! এই মেয়েটাকে ওখান থেকে উদ্ধার করতেই হবে। তবে এখনই নয়।
কার্কে আমাদের যে লোক আছে, তারাই উপযুক্ত সময়ে তাকে উদ্ধার করে আনবে। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন।
আক্রার পাদ্রী এবং খৃষ্টান সম্রাটগণ তিন দিন নাসেরায় অবস্থান করেন। তারা যুদ্ধের পরিকল্পনা নকশা প্রস্তুত করে ফেলেছেন। কুলসুম অর্নাত থেকে সবকিছু জ্ঞাত হয়ে বকরকে অবহিত করেছে। ক্রুসেডাররাও সুলতান আইউবীর কিছু কিছু তথ্য জেনে ফেলেছে। মসুল, হাল্ব ও দামেশক, কায়রো সব অঞ্চলে তাদের গোয়েন্দা আছে। তারা ক্রুসেডারদেরকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করছে। ক্রুসেডাররা এ-ও জেনে গেছে যে, মিসর থেকেও ফৌজ আসছে। সুলতান আইউবী খুব তাড়াতাড়ি অগ্রযাত্রা করবেন, তা-ও তারা জেনে ফেলেছে। ফলে তারা প্রতিরক্ষা যুদ্ধ লড়ে পরে আইউবীকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা ঠিক করেছে। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন স্থানে সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছে। তবে তারা এখনো জানতে পারেনি, সুলতান আইউবী কোন্ দিক থেকে আসবেন এবং যুদ্ধের অঙ্গন কোটা হবে। তারা অনুমানের ভিত্তিতে আইউবীর সেনাসংখ্যা, কতোজন আরোহী, কতোজন পদাতিক হতে পারে, ঠিক করে নিয়েছে।
হাসান ইবনে আবদুল্লাহ কার্ক থেকে আগত তার লোকদের থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট গ্রহণ করেছেন। তারাই তাকে কুলসুম ও বকর সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছে। হাসান সেই রিপোর্ট সুলতানকে অবহিত করেছেন।
এ সংবাদ সেই সকল সংবাদের সত্যতা প্রমাণ করেছে, যেগুলো অন্যান্য অঞ্চলের গোয়েন্দারা আমাদের প্রেরণ করেছে- সুলতান আইউবীর বললেন- এ তো আমি আগেই বলেছি, ক্রুসেডাররা আমাদের অপেক্ষা করছে। এবার কার্কের রিপোর্ট তার সত্যায়ন করলো। এই রিপোর্টে নতুন তথ্যটি হচ্ছে ক্রুসেডারদের সামরিক শক্তির পরিমাণ। তাদের সঙ্গে দুহাজার নাইট থাকবে। এটা নিঃসন্দেহে বিরাট শক্তি। নাইট মাথা থেকে পা পর্যন্ত বর্মপরিহিত এবং সুরক্ষিত থাকে। তাদের ঘোড়া সাধারণ জঙ্গী ঘোড়ার তুলনায় বেশি শক্তিশালী ও কর্মচঞ্চল হয়ে থাকে। রৌদ্রতাপের ব্যারোমিটার যখন উচ্চাঙ্গে থাকবে, আমি তাদেরকে তখন যুদ্ধ করতে বাধ্য করবো।
আর সেই বর্ম পরিহিত নাইটদের সঙ্গে আট হাজার অশ্বারোহী সৈনিক থাকবে- হাসান ইবনে আবদুল্লাহ বললেন- পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা ত্রিশ হাজারের বেশি জানানো হয়েছে।
আমার জন্য একটি নতুন সুসংবাদ হচ্ছে, আর্মেনিয়ার সম্রাটের বাহিনীও ক্রুসেডারদের সঙ্গে আসছে- সুলতান আইউবী বললেন- এরা ক্রুসেডারদের ত্রিশ-বত্রিশ হাজার সৈনিকের অতিরিক্ত। এদেরসহ দুশমনের সেনাসংখ্যা চল্লিশ হাজার হয়ে যাবে। কার্কের রিপোর্ট এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদিতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি, ক্রুসেডাররা প্রতিরক্ষা যুদ্ধ লড়বে এবং আমাকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করবে। সে মোতাবেক আমার এই সিদ্ধান্ত সঠিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আমি হিত্তীনের উপকণ্ঠে লড়াই করবো। আমি এই অঞ্চল সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত।
***
বন্ধুগণ! মহান আল্লাহ আমাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, সেসব পালনে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াবার সময় এসে গেছে- সুলতান আইউবী দামেশকে নিজ কক্ষে সালার ও নায়েব সালারদের উদ্দেশে বললেন- আমাদেরকে ক্ষমতার জন্য লড়াই করার এবং ক্ষমতার জন্য মৃত্যুবরণ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। তারপরও আমরা আপসে অনেক ধুনাখুনি করেছি। সেই সুযোগে দুশমন ফিলিস্তীনের মাটিতে জেঁকে বসেছে। জাতি আমাদের হাতে তরবারী তুলে দিয়েছিলো এবং এই ভরসায় সঙ্গ দিয়েছিলো যে, আমরা ইসলামের দুশমনদের নির্মূল করবো এবং আরবের পবিত্র ভূখণ্ডকে কাফেরদের নাপাক অস্তিত্ব থেকে পবিত্র করবো।
