ক্রুসেডারদের এই প্রতিজ্ঞা-পরিকল্পনার উল্লেখ ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরাও করেছেন। একবার তারা মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে পৌঁছেও গিয়েছিলো। সুলতান আইউবীর কার্ক অবরোধ করে এক মাস পরে তুলে নেয়াও এক ঐতিহাসিক ঘটনা। অর্নাত যুদ্ধ এবং ভবিষ্যতে হাজীদের কাফেলা লুণ্ঠন না করার চুক্তি করেছিলেন বলে সুলতান অবরোধ প্রত্যাহার করেছিলেন, তা নয়। সুলতানের তো জানাই ছিলো, খৃষ্টানরা চুক্তি করেই ভঙ্গ করার জন্য। অবরোধ তুলে নেয়ার আসল কারণ ছিলো, সুলতান বায়তুল মুকাদ্দাস জয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন। অর্নাত এই চুক্তির দুবছর পর আরেকটি হজ্ব কাফেলার উপর আক্রমণ করেছিলেন। চুক্তির মেয়াদ ছিলো ১১৮৮ সাল পর্যন্ত। সুলতান আইউবী ১১৮৭ সালে হিত্তীন অভিমুখে অগ্রযাত্রা করেন এবং অর্নাতকে নিজ হাতে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে দামেশক থেকে বের হয়েছিলেন।
***
কুলসুম বকর ইবনে মুহাম্মদকে নিজের ইতিবৃত্ত শোনাতে থাকে—
অর্নাতের সঙ্গে আমি হাসি-খুশিও থাকি এবং আমার হৃদয়ে প্রতিশোধের আগুনও জ্বলতে থাকে। তিনি আমাকে মাঝে-মধ্যে বলতেন, সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দারা বেশ-ভূষা বদল করে আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়ে এখানকার তথ্য নিয়ে যায়। তিনি আরো বলেছেন, অতিশয় রূপসী খৃস্টান ও ইহুদী মেয়েরা মুসলমানদের অঞ্চলে মুসলমান নাম-পরিচয় ধারণ করে তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরকে ফাঁদে ফেলে তাদেরকে ক্রুশের স্বার্থে ব্যবহার করছে। অর্নাত আমাকে ঐ মেয়েদের কাহিনী শোনাতেন। শুনে কয়েকবার আমার মাথায় চিন্তা আসে, এই মেয়েরা আপন ধর্মের জন্য নিজেদের সম্ভ্রম বিসর্জন দিচ্ছে। সম্ভ্রম তো সেই সম্পদ, যার সুরক্ষার জন্য নারীরা জীবনের ঝুঁকি বরণ করে থাকে। অথচ এই মেয়েরা কিনা ধর্মের জন্য সম্ভ্রম বিসর্জন দিচ্ছে। এ কেমন ধর্ম! এরা কেমন নারী!
আমার সম্ভ্রম সুরক্ষিত নেই- লুণ্ঠিত হয়ে গেছে। আমি মনে মনে সংকল্প করি, আমিও আমার ধর্মের জন্য কুরবানী দেবো। কিন্তু তার জন্য সুযোগের তো প্রয়োজন। আমি সুযোগ পাচ্ছিলাম না। এখন এখানে এসে অর্নাত আমাকে এমন সব মহামূল্যবান সম্পদ দান করেছেন যে, সেই সম্পদ নিয়ে আমাকে সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছুতেই হবে। বোধ হয় আল্লাহ এই পুণ্যের জন্যই আমাকে এই জাহান্নামে প্রেরণ করেছিলেন। তুমি কি বলতে পারবে, এই সংবাদে সুলতানের কোনো উপকার হবে কিনা?
অনেক- বকর বললো- কিন্তু এ সংবাদ নিয়ে তোমাকে যেতে দেবো না। তুমি যাবে না। তুমি কিংবা আমরা দুজনই নিখোঁজ হয়ে গেলে প্রিন্স অর্নাত অমনি ধরে নেবেন, আমরা গোয়েন্দা ছিলাম। ফলে তারা তাদের পরিকল্পনায় রদবদল করে ফেলবে আর আমরা সুলতান আইউবীর নিকট যে সংবাদ পৌঁছাবো, তা তাঁর পরাজয়ের সূত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তার মানে, এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সুলতানের নিকট পৌঁছুবে না! কুলসুম বললো।
পৌঁছুবে এবং অবশ্যই পৌঁছে যাবে- বকর বললো- কিন্তু ব্যবস্থাটা কার্কে গিয়ে করবো।
তুমি যাবে?- কুলসুম জিজ্ঞেস করে- আমি তো এখান থেকে পালাতেও চাই।
আমি যাবো না- বকর বললো- তুমিও যাবে না। কার্কে আমাদের সহকর্মীরা আছে। তথ্য পৌঁছানোর দায়িত্ব তাদের। আমার কাজ তথ্য সংগ্রহ করা। এখন এ কাজ তুমিও করবে। তোমার কাজ শেষ হয়নি। সবে শুরু হয়েছে মাত্র। সুলতানের জন্য কী ধরনের তথ্যের প্রয়োজন, আমি তোমাকে বলে দেবো। সেসব তথ্য তুমি আমাকে দেবে আর আমি দামেশক পৌঁছাবো।
তো এই নরকে আমাকে থাকতেই হচ্ছে, না? কুলসুম ক্ষুণ্ণমনে জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ- বকর উত্তর দেয়- তোমাকে এই নরকে আর আমাকে মৃত্যুর মুখে পড়ে থাকতে হবে- এ ত্যাগ তোমাকে দিতেই হবে কুলসুম। সুলতান আমাদেরকে বলে থাকেন, একজন গোয়েন্দা কিংবা একজন কমান্ডো তার গোটা বাহিনীর জয় কিংবা পরাজয়ের কারণ হতে পারে। কিন্তু একজন গুপ্তচর সবসময় মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। গুপ্তচর দুশমনের হাতে পড়ে গেলে তাকে তৎক্ষণাৎ খুন করে ফেলা হয় না, তাকে নির্যাতন করা হয়, কষ্ট দেয়া হয়। আপন ধর্ম ও মাতৃভূমির জন্য কাউকে না কাউকে জীবন্ত চামড়া খসানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হয়। একটি জাতির নাম-চিহ্ন তখন মুছে যেতে শুরু করে, যখন তাদের মধ্যে কুরবানীর জযবা নিঃশেষ হয়ে যায়। তুমি এখানে চারটি বছর কাটিয়ে দিয়েছে। আর চারটা মাস কাটাও। এখন আর অর্নাতকে মনিব মনে করো না। তার সঙ্গে আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসা দেখাও। মনে মনে বুঝ রাখো, তুমি এমন একটা বিষাক্ত নাগকে কজা করে রেখেছো, যে তোমার হাত থেকে ছুটে গেলে ইসলামী দুনিয়াকে দংশন করবে।
বলে যাও বকর, বলে যাও- কুলসুম বললো- আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে বলো, আমি মহান আল্লাহর দরবারে কীভাবে মুখ দেখাতে পারবো।
বকর বলতে শুরু করে। লিলিকে পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়ে বললো তোমার এবং আমার মাঝে অন্য কোনো সম্পর্ক আছে বিষয়টা কাউকে বুঝতে দেবে না। এখানে আমাদের গোয়েন্দাদের খুঁজে বের করার জন্য নানা বেশে খৃস্টান গোয়েন্দারাও ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ-ও স্মরণ রাখবে, এখানে আমরা দুজনই গোয়েন্দা নই। আমাদের আরো অনেক সহকর্মী আছে। খৃষ্টান সম্রাট ও সেনাপতিগণ যে নগরীতে অবস্থান করছেন, তারা সেখানে দায়িত্ব পালন করছে। তাদের একজন অপরজন থেকে অধিক সাহসী ও বুদ্ধিমান। অন্তরে প্রবঞ্চনা রাখবে না যে, আমরা দুজনে মিলে বিরাট কাজ করে ফেলেছি। ভাবো না আমরা আল্লাহর বিরাট উপকার করে ফেলেছি। এসব আমাদের কর্তব্য, যা আমাদেরকে পালন করতে হবে। তার জন্য যত কষ্টই করতে হয়, আমরা বরণ করে নেবো।
