হঠাৎ তোমার চিন্তাটা আসলে কোনো, সংবাদটা সুলতান আইউবীকে পৌঁছানো দরকার? বকর ইবনে মুহাম্মদ জিজ্ঞেস করে এবং বলে কুলসুম! আমি এই ময়দানের মুজাহিদ। আমি যদি বলি, তুমি অর্নাতের কথায় ভুল তথ্য পৌঁছিয়ে সুলতান আইউবীকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, তাহলে কী উত্তর দেবে?
বলবো, তুমি স্বল্প বুদ্ধির মানুষ- কুলসুম উত্তর দেয়- তুমি যদি সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা হয়ে থাকে, তাহলে তুমি নির্বোধ গোয়েন্দা। তুমি নিজ বাহিনীকে ক্রুসেডারদের হাতে খুন করিয়ে ফেলবে। অর্নাত যদি সুলতান আইউবীকে বিভ্রান্ত করতে চাইতেন, তাহলে কি অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করতে পারতেন না? যদি কাজটা আমাকে দিয়েই করাতে চাইতেন, তাহলে রাতে আমাকে গাড়িতে বসিয়ে মুসলমানদের অঞ্চলের নিকটে রেখে আসতে পারতেন না? শোনো বকর! মনোযোগ সহকারে শোনো! আমি তোমার গায়ে প্রথম যে তীরটি ছুঁড়েছিলাম, সে চিন্তাটা বিদ্যুতের ন্যায় হঠাৎ করেই আমার মাথায় এসেছিলো। আমি আসলেই শুধু ভ্রমণের জন্য বের হয়েছিলাম। তীর-ধনুক এনেছো তুমি।
এখানে এসে আমি মুসলমানদের সীমান্ত এখান থেকে কতো দূর জানবার জন্য, তোমাকে সীমান্ত ও দামেশূর্কের পথের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। তুমি যখন বললে অঞ্চলটা এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে, তখন মনে ভাবনা জাগে, কোনো প্রলোভন দেখিয়ে তোমাকে নিয়েই যাবো কিনা। কিন্তু আবার ভাবি, তুমি তো খৃস্টান, আমাকে সাহায্য করবে কিনা কীভাবে বিশ্বাস করি। পরে এই আশঙ্কাই প্রবল হয়ে দেখা দেয় যে, বললে হিতে বিপরীত হবে এবং তুমি আমাকে মুসলমানদের গুপ্তচর সাব্যস্ত করে অর্নাতের নিকট থেকে পুরস্কার লাভ করবে আর আমি ফেঁসে যাবো। আমার সামনে কোনো পথ ছিলো না। তুমি খানিক দূরে গাছের সঙ্গে ঠেদিয়ে দাঁড়িয়ে গেলে আমি গাছের উপর একটা পাখির গায়ে ছোঁড়ার জন্য ধনুকে তীর সংযোজন করি। তখন আমার দৃষ্টি তোমার পিঠের উপর নিবদ্ধ ছিলো।
তখনই মাথায় ভাবনা আসে, একটা কাজ করি না কেননা! লোকটা যখন এভো কাছাকাছি পজিশন মতো দাঁড়িয়ে আছে, তো তীরটা তাকেই বিদ্ধ করি না কেন। একটার বেশি দুটো ছুঁড়তে হবে না। তুমি মরে যাবে। আমি গাড়িতে চড়ে তোমার দেখানো পথে পালিয়ে যাবো। অন্য কোনো সমস্যার কথা আমি চিন্তাই করিনি। বোধ হয় আমার মধ্যে বিবেক কম আর আবেগ বেশি ছিলো। আর আবেগের মধ্যে প্রতিশোধের স্পৃহাই অধিক ছিলো। আমি কম্পিত হাতে তীর চালিয়ে দেই। পরে আমার মাথায় এই বুদ্ধিটুকুও আসলো না যে, বলবো, তীর ভুলবশত বেরিয়ে গেছে। বললে তো তুমি অজুহাতটা মেনে নিতে। কারণ, তোমার জানা আছে, আমি কোনোদিন ধনুক হাতে নেইনি। মোটকথা, তোমাকে হত্যা করে মুসলমানের এলাকায় পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার মুক্তির আর কোনো উপায় ছিলো না। কিন্তু আমি সফল হইনি।
এর আগে, কখনো পালাবার চিন্তা মাথায় এসেছিলো কিবকর জিজ্ঞেস করে।
প্রথম প্রথম অনেক চিন্তা করেছি- লিলি উত্তর দেয়। কিন্তু পরে বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হই যে, পালাতে পারবো না। অর্নাত আমাকে সত্যিকার অর্থেই রাজকন্যা বানিয়ে রেখেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। তিনি বলতেন, তোমার প্রতি আমার যতোটুকু ভালোবাসা জন্মে গেছে, ইতিপূর্বে অন্য কোনো মেয়েকে আমি ততোটুকু ভালোবাসিনি। আমি তার সঙ্গে মদও পান করতে থাকি। না করে উপায় ছিলো না। দৈহিকরূপে আমি তার জীবনে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। এমন রাজকীয় জীবন তো আমি কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু একাকি হলেই আমি মুসলমান হয়ে যেতাম এবং আমার মনে হতো, এই মাত্র আমি হজ্ব করে এসেছি। মাঝে মধ্যে আমি আল্লাহকে গালাগালিও করে ফেলতাম। অনেক সময় মনে হতো, আমি আল্লাহকে ভুলে যাচ্ছি।
এমনি সময়ে সুলতান আইউবী কার্ক অবরোধ করলেন এবং অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করে নগরীর বিপুল অংশ ধ্বংস করে দিলেন। আমি প্রস্তুত হয়ে যাই, আমাদের বাহিনী শহরে ঢুকে পড়বে আর আমি অর্নাতকে নিজ হাতে হত্যা করে ফেলবো। কিন্তু এক মাস পর সুলতান অবরোধ তুলে নিলেন এবং ফেরত চলে গেলেন। অর্নাত অট্টহাসি হাসতে হাসতে আমার নিকট বললো, আমি লোকটাকে আবারো বোকা ঠাওরে দিলাম। আমি তার সঙ্গে চুক্তি করেছি, আগামীতে হাজীদের কাফেলার প্রতি হাত বাড়াবো না। আমি তার সঙ্গে আর যুদ্ধ না করারও চুক্তি করেছি।
আমি খুব ব্যথা পেলাম। সুলতান আইউবীর ফেরত না যাওয়া দরকার ছিলো। আমাকে মুক্ত না করে তার অবরোধ তুলে নেয়া ঠিক হয়নি।
সুলতান আইউবীর সামনে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে আছে- বকর বললো- তাকে বরং আমাদেরকে বাইতুল মুকাদ্দাস মুক্ত করতে হবে, যা কিনা আমাদের প্রথম কেবলা। আমাদেরকে ফিলিস্তিনীনের মাটি দখলমুক্ত করতে হবে, যেটি আমাদের নবী-রাসূলগণের জন্মভূমি। সুলতান আইউবী, যদি এক একটি মুসলিম নারীর মুক্তির জন্য বেরিয়ে পড়েন, তাহলে তিনি স্বীয় পবিত্র লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাবেন এবং লড়াই করতে করতেই নিঃশেষ হয়ে যাবেন। জাতি আপন পবিত্র লক্ষ্যের খাতিরে আপন সন্তানদের কুরবান করে থাকে।
অর্নাতের একটি মন্দ স্বভাব আমাকে ভুলতে দেয়নি যে, আমি মুসলমান- কুলসুম বললো- তিনি আমাদের রাসূলে খোদার শানে গোস্তাখি করে থাকে। আরো বলেন, সালাহুদ্দীন আইউবী তার প্রথম কেবলা দখল করার জন্য হাত-পা ছুঁড়ছে আর আমরা তার খানায়ে কাবাকে নিশ্চিহ্ন করে সেখানে আমাদের উপাসনালয় গড়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছি।
