আর তুমি প্রিন্স অনাতকে বলে দিয়ে পুরস্কার গ্রহণ করবে- লিলি বললো- আর তাকে বলে দেবে, আমি পালাবার চেষ্টা করেছিলাম।
লিলি দেখতে পায়, সায়বালের গলায় একটা ফিতা ঝুলছে। সে ফিতাটা যরে টান দিলে ক্ষুদ্র একটি ক্রুশ বেরিয়ে আসে। লিলি বললো- এটা হাতে নিয়ে কসম খাও, আমাকে ধোকা দেবে না। অর্নাতকে বলবে না আমি তোমার গায়ে তীর ছুঁড়েছিলাম।
সায়বাল মেয়েটির আসল পরিচয় জেনে ফেলে। বললো- কুশ হাতে ওয়া কসম মিথ্যা হবে। সে ফিতাটা গলা থেকে খুলে ফেলে এবং ক্রুশটা। একদিকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। বলে- মুসলমান ক্রুশ হাতে কসম খায় না।
লিলি চমকে ওঠে সায়বালের দিকে তাকায়, যেনো লোকটার কথায় তার বিশ্বাস হচ্ছে না। সে দূরে মাটিতে পড়ে থাকা কুশটার প্রতি দৃষ্টিপাত করে। কোনো খৃস্টান সে যতোই পাপিষ্ঠ হোক না কেন, ক্রুশের অবমাননা করে না। সায়বাল নিশ্চিত হয়ে গেছে, লিলি কোনো মুসলমান পিতার কন্যা।
আমি তোমার কাছে আমার গোপনীয়তা ফাঁস করে দিয়েছি সায়বাল বললো- তুমি বলো, তোমাকে কখন এবং কোথা থেকে অপহরণ করা হয়েছিলো?
আমি হজ্ব করে পিতা-মাতার সঙ্গে মিসর ফিরে যাচ্ছিলাম- লিলি ভয় পাওয়া শিশুটির ন্যায় বললো- অনেক বড় কাফেলা ছিলো। তখন আমার বয়স ছিলো ষোল-সতের বছর। চার-সাড়ে বছর কেটে গেছে। কার্কের সন্নিকটে এই কাফেররা কাফেলার উপর আক্রমণ চালায় এবং মালপত্র লুটে নেয়। তারা অনেক রক্ত ঝরায়। আমি জানি না, আমার পিতা-মাতা মারা গেছেন, নাকি জীবিত আছেন। কাফেররা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। বোধ হয় আমার দুর্ভাগ্যই ছিলো, আমি এতো রূপসী ছিলাম যে, কার্কের শাসনকর্তা প্রিন্স অর্নাত আমাকে পছন্দ করেন এবং নিজের কাছে রেখে দেন।
প্রিন্স অর্নাতের সামনে আমি অনেক কান্নাকাটি করি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তিনি বললেন, আমি রাজত্ব ত্যাগ করবো তবু তোমাকে ছাড়বো না। তারপর তিনি আমাকে বিবাহ করেননি এবং নিজের ধর্মও গ্রহণ করে নিতে বলেননি। আমি তার ভোগের উপকরণ হয়ে থাকি। তার নিকট আরো কয়েকটি রূপসী মেয়ে ছিলো। তারা আমার শত্রু হয়ে যায়। কিন্তু অর্নাত শুধু আমাকেই সঙ্গে রাখেন এবং আমি যা বলি শোনেন। আমি এই অবস্থাটা মেনে নিই। এ ছাড়া আমার কোনো উপায় ছিলো না। নারীর ভাগ্যই এমন যে, যখন যার কজায় এসে পড়ে, তখন তার মালিকানা ও গোলাম হয়ে যায়।
লিলি বলতে বলতে নীরব হয়ে যায়। সায়বালকে গভীর দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে বললো- তুমি কি আমার সমস্ত কথা প্রিন্স অর্নাতকে বলে দেবে? শুনে তিনি আমাকে কী শাস্তি দেবেন?
আমি যদি সত্যি সত্যি সায়বাল হতাম, তাহলে তা-ই করতাম, তুমি যার ভয় করছো- গাড়োয়ান বললো- আমি সিরীয় মুসলমান। আমার নাম বকর ইবনে মুহম্মদ।
তুমি সেই গোয়েন্দাদের একজন তো নও, যাদের সম্পর্কে অর্নাত বলে থাকেন, আমাদের দেশে মুসলমান গোয়েন্দা লুকিয়ে আছে? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে এবং বলে- আমার নাম ছিলো কুলসুম।
আমি যা কিছু হই না কেন- বকর উত্তর দেয়- আমি মুসলমান। আমি তোমাকে ধোকা দেবো না। এটা কোনো নতুন বিষয় নয় যে, একটি অপহৃতা মুসলিম মেয়ের এমন এক মুসলমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে গেছে, যে কিনা খৃস্টান বেশে খৃস্টানদের কর্মচারি হয়ে কাজ করছে। এরূপ ঘটনা আগেও বহু ঘটেছে। এমনও হয়েছে ভাই গোয়েন্দা হয়ে খৃস্টানদের শহরে ঢুকে পড়েছে তো সেখানে তার সেই বোনের সাক্ষাৎ পেয়ে গেছে, যে বহু বছর আগে অপহৃতা হয়েছিলো। বিস্মিত হয়ো না কুলসুম। তুমি হজ্ব সম্পাদন করে ফিরে যাচ্ছিলে। আল্লাহ তোমার হজ্ব কবুল করে নিয়েছেন। আমি আলিম নই যে, তোমাকে বলবো, আল্লাহ তোমাকে এই শাস্তিটা কেন দিলেন? তবে এখন মনে হচ্ছে, আল্লাহ তোমার দ্বারা বড় কোনো মহৎ কাজ করাবার জন্যই এ জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছিলেন। তা তুমি কি শুধুই পালাতে চাও, নাকি পালাবার পেছনেও কোনো উদ্দেশ্য আছে?
অনেক বড় উদ্দেশ্য- কুলসুম বললো- তুমি বোধ হয় জানো না, আক্রার পাদ্রী এই খৃষ্টান সম্রাটদেরকে এখানে কেনো তলব করেছেন। রাতে অর্নাত যখন তার তাঁবুতে আসে, তখন তিনি নেশায় ঢুলু ঢুলু করছিলেন। তিনি আমাকে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুমি অনেক বড় একটা রাজ্যের রাণী হতে যাচ্ছো। সালাহুদ্দীন আইউবী দিন কয়েকের মেহমান মাত্র। তিনি আমাদের জালে এগিয়ে আসছেন। খুব দ্রুত আসছেন। আমি আনন্দ প্রকাশ করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের পরিকল্পনা কী? তিনি বিস্তারিত বলে শেষে বললেন, এখানে যে কজন খৃষ্টান সম্রাট এসেছেন, তারা ক্রুশের গায়ে হাত রেখে ঐক্য এবং পরস্পর অফাদারির শপথ নিয়েছেন।
তারা কি সালাহুদ্দীন আইউবীর কোনো অঞ্চলের উপর আক্রমণ করবেন? বকর জিজ্ঞেস করে।
আমার পলাবার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমি সুলতান আইউবীর নিকট সংবাদ পৌঁছাবো, ক্রুসেডারদের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা কী, তারা কী পরিমাণ সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে এবং তাদেরকে কোথায় কোথায় বণ্টন করে ছড়িয়ে রেখেছে। অর্নাত আমাকে বলেছেন, তারা আক্রমণ করতে যাবেন না। বরং সালাহুদ্দীন আইউবীকে আক্রমণ করার সুযোগ দেবেন, যাতে তিনি নিজ অবস্থান থেকে দূরে সরে যান এবং তার রসদের পথ দীর্ঘ হয়ে যায়। তাদের আরো পরিকল্পনা, আইউবী যদি সহসা আক্রমণ না করেন, তাহলে তারা তিন দিক থেকে এগিয়ে গিয়ে হামলা চালাবে।
