হ্যাঁ আছে বলে গাড়োয়ান তাকে দামেশকের পথটাও বুঝিয়ে দেয়।
***
লিলি তুনীর থেকে তীর বের করে ধনুকে সংযোজন করে গাছে পাখি দেখতে শুরু করে। ঐ এক গাছে কি একটা পাখি যেনো বসে আছে। লিলি তীর ছোঁড়ে। কিন্তু তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। লিলি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। গাড়োয়ান এগিয়ে এসে নিশানা ঠিক করার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়। লিলি এদিক-ওদিক কয়েকটা তীর ছোঁড়ে।
আরো সামনে চলো- লিলি গাড়িতে চড়ে বসতে বসতে বললো কোথায় হরিণ আছে, সেখানে, চলো। হরিণ তো মারতে পারবো।
সায়বাল লিলিকে দেড়-দুমাইল দূরে নিয়ে যায়। এক স্থানে গড়ি থামিয়ে বললো, একটু অপেক্ষা করুন, হরিণ কিংবা খরগোশ পেয়ে যাবেন। বলেই সায়বাল একদিকে চলে যায়। পা বিশেক দূরে একটা গাছ আছে। সায়বাল তার সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। সে প্রিন্সেস লিলির জন্য হরিণ-খরগোশ খুঁজতে শুরু করে। তার পিঠটা লিলির দিকে। লিলি ধনুকে তীর সংযোজন করে। সায়বালের পিঠটাকে নিশানা বানায়। কেউ দেখলে এটাই ভাবতো, সে ঠাট্টা করছে। সে ধনুক টেনে ধরে। তার হাতে ধনুকটা কাঁপছে। একটা চোখ বন্ধ করে সায়বালের পিঠটা নিশানা বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লিলি ধনুকটা আরো টেনে ধরে তীরটা ছুঁড়ে দেয়। তীর সায়বালের কাঁধ ঘেঁষে গাছটার ডালে গিয়ে গেঁথে যায়। সায়বাল হটাৎ ঘাবড়ে ওঠে মোড় ঘুরিয়ে তাকায়। প্রথমে গাছের ডালে গেঁথে যাওয়া তীরটার প্রতি এবং পরে লিলির দিকে তাকায়। লিলি হাসছে না। তার চেহারায় গাম্ভীর্য। যেমনটি সায়বাল ইতিপূর্বে কখনো দেখেনি। তবু সে হেসে বললো- আপনি বুঝি আমার উপর তীর অনুশীলন করছেন? বলেই সে লিলির দিকে এগিয়ে যেতে উদ্যত হয়।
লিলি ঝটপট তূনীর থেকে আরো একটি তীর বের করে ধনুকে সংযোজন করে বলে ওঠে- থামো, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো। এদিক ওদিক হবে না।
সায়বাল দাঁড়িয়ে যায়। লিলি ধনুকটা সামনে নিয়ে টেনে ধরে। সায়বাল চীৎকার করে বলে ওঠে- প্রিন্সেস! আপনি একী করছেন?
লিলির ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে যায়। সায়বালের দৃষ্টি তার উপর নিবদ্ধ। সে বসে পড়ে। তীরটা শা-শব্দ তুলে তার পার্শ্ব ঘেঁষে অতিক্রম করে যায়। সায়বাল লিলির মর্যাদা ও নিজের অবস্থানের কথা ভুলে যায়। লিলি তুনীর থেকে আরো একটি তীর বের করতে উদ্যত হয়। সায়বাল, অতি দ্রুততার সাথে তার দিকে ছুটে যায়। অতো তাড়াতাড়ি তীর বের করে ধনুকে সংযোজন করার অভিজ্ঞতা লিলির নেই। সায়বাল তার দিকে এগিয়ে এলে সে দৌড়ে আড়ালে চলে যায়। কিন্তু সায়বাল তো পুরুষ এবং তাগড়া যুবক। পৌঁছে গিয়ে সে লিলিকে ধরে ফেলে। লিলির হাত থেকে ধনুকটা কেড়ে নেয়। কাঁধ থেকে নীরটাও ছিনিয়ে নেয়।
আমি সেই দাস শ্রেণীর মানুষ নই, যাদের উপর তাদের মনিবরা সব রকম জুলুম করে থাকে- সায়বাল বলে এবং ধনুকে একটা তীর সংযোজন করে লিলির প্রতি তাক করে ধরে। বললো- আপনি কি আমার উপর তীর অনুশীলন করতে চাচ্ছেন? নাকি এটা আমার আন্তরিক সেবা ও আনুগত্যের প্রতিদান?
লিলির মুখে কোন উত্তর নেই। মেয়েটির ওষ্ঠাধর কাঁপছে। তার চোখে অশ্রু নেমে এসেছে। সায়বাল ধনুকটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ধীর পায়ে লিলির দিকে এগিয়ে যায়।
আমি বুঝতে পারলাম না, আপনি আমার উপর কেননা তীর চালালেন এবং কেননাই বা আপনার চোখে অশ্রু নেমে এলো? সায়বাল জিজ্ঞেস করে।
তুমি কি আমাকে সাহায্য করতে পারো? লিলি এমন এক কণ্ঠে বললো, যেটি কোন রাজকন্যার কণ্ঠ নয়। এটি একটি ভয়পাওয়া সাধারণ মেয়ের কণ্ঠ।
আপনার জন্য আমি জীবনও দিতে পারি- সায়বাল বললো- বলুন আপনার কীরূপ সাহায্যের প্রয়োজন?
পুরস্কার দিয়ে লাল করে দেবো- লিলি বললো- পুরস্কার হিসেবে আমাকে দাবি করবে, তো তাও মৈনে নেবে। তুমি আমাকে গ্যালিলি ঝিলের ওপারে মুসলমানদের অঞ্চলে গিয়ে চলো। আমাকে সামেশক দিয়ে। আসো। তারপর এই গাড়ি আর ঘোড়া দুটো তোমার হবে। পুরস্কার আলাদা পাবে।
আমার মনে হচ্ছে, আপনার মাথায় কোনো গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে সায়বাল বললো- চলুন, আমরা ফিরে যাই।
যদি আমার কথা না শোনন, তাহলে ফিরে গিয়ে প্রিন্স অর্নাতকে বলবে, এখানে তুমি আমার প্রতি হাত বাড়িয়েছে। লিলি সায়বালের কানে কানে বললো।
ভালোই হলো, কথাটা বলে ফেলেছেন- সায়বাল বললো- এখন না আপনি ফিরে যেতে পারবেন, না আমি ফিরে যাবো। হাত-পা বেঁধে আমি আপনাকে গাড়িতে করে কোন এক নগরীতে নিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রি করে ফেলবো। আচ্ছা, বলুন তো, মুসলমানদের অঞ্চলে যেতে চাচ্ছেন কেন?
এবার লিলি টের পেয়েছে, সে জালে আটকা পড়েছে। মেয়েটি বসে পড়ে এবং মাথাটা উভয় হাঁটুর মধ্যখানে গুজিয়ে কোঁকাতে শুরু করে। সায়বাল তার প্রতি তাকিয়ে আছে। লিলি তার অপরিচিত মেয়ে নয়। কিন্তু এখন তাকে গভীর চোখে দেখতে শুরু করেছে, যেনে নতুন কাউকে। দেখছে। মেয়েটার মাথার চুল, গায়ের রং, চলন-বলন কোনটিই খৃস্টান। মেয়েদের মতো নয়। তার জানা আছে, খৃস্টানদের কাছে অনেক অপহৃতা মুসলিম মেয়েও আছে। এই মেয়েটিও তেমনি অপহৃতা হতে পারে। কিন্তু কিন্তু একে তো সে আজ তিন-চার বছর যাবত হাসি-খুশিই দেখতে পাচ্ছে। সায়বাল লিলির পাশে বসে পড়ে।
যদি মুসলমান হয়ে থাকো, তো বলো- সায়বাল বললো-সম্ভবত তোমাকে অপহরণ করা হয়েছিলো।
