আমাদেরকে বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। গোয়েন্দাদের রিপোর্ট মোতাবেক সালাহুদ্দীন আইউবী জেরুজালেম অভিমুখে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেছে। এখন তোমাদেরকে দেখতে হবে, সে কোন্ পথে আসে। সোজা জেরুজালেমের দিকে আসে, না কী করে। আমাদেরকে এই বাস্তবতা স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা একাকি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পেরে ওঠবো না। এখন তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছো। বড় ক্রুশকে এখানে টেনে আনার উদ্দেশ্য হলো, তোমরা সকলে একসঙ্গে ক্রুশের উপর হাত রেখে শপথ নাও, তোমরা দুশমনের বিরুদ্ধে একপ্রাণ হয়ে যুদ্ধ করবে এবং ইসলামের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবে না।
সকলে উঠে দাঁড়ায়। ক্রুশের গায়ে হাত রাখে। আক্রার পাদ্রীর উচ্চারিত বাক্যগুলো উচ্চারণ করে শপথ গ্রহণ করে।
***
পরদিন সম্রাটগণ বেশ বেলা হলে জাগ্রত হন। রাতে পাদ্রী ছুটি দেয়ার পর তারা মদ-নাচে মগ্ন হয়ে পড়েন। প্রত্যেকে আপন আপন পছন্দের মেয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। তাদের রূপ, অর্ধনগ্ন দেহ, বিক্ষিপ্ত রেশমি চুল, হৃদয়কাড়া নাচ আর মদ এই ভূখণ্ডটাকে ভূস্বর্গে পরিণত করে ফেলেছে। পরদিন সূর্যোদয় হয়ে গেছে। কিন্তু নিদ্রা খৃষ্টানদের এই রাজকীয় ক্যাম্পে কবরের নীরবতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
প্রিন্স অর্নাতের তাবু থেকে এক তরুণী বের হয়। অতিশয় রূপসী ও দীর্ঘকায় মেয়ে। আকর্ষণীয় গাত্রবর্ণ। টানা টানা কাজলকালো চোখ দুটোয় যেনো যাদুর ক্রিয়া। এই রং আর এই চোখ খৃস্টান কিংবা ইহুদী মেয়েদের নয়। সুদান, মিসর কিংবা দামেশকের মেয়ে বলে মনে হলো। মেয়েটা অবর্ণনীয় রূপসী হওয়ার পক্ষে এ প্রমাণটাই যথেষ্ট যে, প্রিন্স অর্নাত তাকে পছন্দ করে সঙ্গে এনেছেন।
মেয়েটাকে দেখে এক বৃদ্ধা চাকরানি দৌড়ে তার নিকট চলে আসে। এখানে সম্রাটদের চাকর-চাকরানিদের সংখ্যা এখানকার সেনাসংখ্যা অপেক্ষা বেশি। অর্নাত মেয়েটাকে প্রিন্সেস লিলি বলে ডাকেন। আকারে গঠনে-উচ্চতায়-অবয়বে মেয়েটাকে রাজকন্যাই মনে হলো। সে চাকরানিকে বললো- স্রেফ আমার জন্য তাড়াতাড়ি নাস্তা নিয়ে আসো আর গাড়ি প্রস্তুত করো। আমি ভ্রমণে বের হবো।
অর্নাত গভীর ঘুম ঘুমিয়ে আছেন। জাগ্রত হতে তার কোন তাড়া নেই। শুধু পাদ্রী সকাল সকাল জাগ্রত হয়ে উপাসনা করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন। লিলির এখন কোনো কাজ নেই। নাস্তা আসতে আসতে সে প্রস্তুত হয়ে যায়। নাস্তা সারতে না সারতে গাড়িও এসে হাজির। দুই ঘোড়ার সুদৃশ্য গাড়ি। কার্ক থেকে অর্নাতের সঙ্গে সে এ গাড়িতে করেই এসেছিলো।
গাড়িতে চড়ে বসার আগে মেয়েটি গাড়োয়ানকে বললো- এই এলাকাটা খুবই সুদৃশ্য ও মনোরম লাগছে। আমি ভ্রমণে যেতে চাই। তুমি কি অঞ্চলটা চেনো?
ভালোভাবেই চিনি প্রিন্সেস- গাড়োয়ান উত্তর দেয়- আপনি যদি ভ্রমণে যেতে চান, তাহলে তীর-ধনুক-তূনীরও নিয়ে নিই। শিকারও খেলতে পারবেন। এ অঞ্চলে হরিণ বেশি নেই বটে; তবে কোথাও কোথাও দেখাও যায়। অনেক খরগোশ আছে। পাখিও আছে। ,
লিলি মুচকি হেসে বললো- তুমি কি আমাকে তীরন্দাজ মনে করছো? আচ্ছা যাও। নিয়ে আসো।
কোন সমস্যা নেই- গাড়োয়ান বললো- আপনি যুদ্ধে তো আর যাচ্ছেন না। শিকারের গায়ে তীর ছোঁড়ার পর যদি ব্যর্থ যায়, তাহলে সমস্যার তো কিছু নেই।
গাড়োয়ান ছুটে গিয়ে তীর-ধনুক-তূনীর নিয়ে আসে।
গাড়ি তাবু অঞ্চল থেকে অনেক দূরে চলে যায়। এলাকাটা সবুজ শ্যামল। গাছ-গাছালিও আছে বেশ। আছে উঁচু উঁচু টিলা-টিপি। সময়টা মার্চ-এপ্রিল। বসন্ত কাল। তাতে এলাকাটা অধিকতর সুদৃশ্য হয়ে ওঠেছে। গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। লিলির কথায় একটি ঝাড়ের নীচে গাড়ি থেমে যায়। লিলি নেমে পড়ে। গাড়োয়ানের নাম সায়বাল। ধর্মে খৃস্টান এবং উক্ত অঞ্চলেরই অধিবাসী।.বয়স ত্রিশের কিছু বেশি। সুদর্শন ও দীর্ঘকায় যুবক। এসব দেখেই অর্নাত তাকে নিজের গাড়ির গাড়োয়ান হিসেবে নির্বাচন করেছেন। লিলিরও লোকটা বেশ পছন্দ। প্রাণোচ্ছ্বল ও অনুগত লোক। লিলির অর্নাতের নিকট আসার এক বছর পর সায়বাল তাদের কাছে এসেছিলো।
আচ্ছা, মুসলমানদের সীমান্ত কোথা থেকে শুরু হয়েছে? লিলি গাড়ি থেকে নেমে গাড়োয়ানকে জিজ্ঞেস করে।
কোন ফৌজ যে স্থানে পৌঁছে ছাউনি ফেলে বসে, সেটাই তাদের সীমানা হয়ে যায়- গাড়োয়ান উত্তর দেয়- আমি আপনাকে এটুকু বলতে পিরবো, এখান থেকে আট-দশ মাইল দূরে সমুদ্রের দিকে বিস্তীর্ণ একটি ঝিল আছে। তার নাম গ্যালিলি। তারই কূলে তাবরিয়া নামক একটা পল্লী আছে। তার থেকে খানিক এদিকে হিনি নামে বিখ্যাত একটি গ্রাম আছে। ঐ ঝিলটা অতিক্রম করে গেলেই মুসলমানদের অঞ্চল শুরু হয়ে যায়।
তার মানে মুসলমানদের অঞ্চল এখান থেকে বেশি দূরে নয়- লিলি বললো- আমরা কি গাড়িতে করে ঝিল পর্যন্ত যেতে পারবো?
আমরা কার্ক থেকে ঘোড়াগাড়িতে করে এসেছি- সায়বাল বললো ঝিল অনেক কাছের এলাকা। এই ঘোড়া দুটো ক্লান্তি ছাড়াই সে পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারবে।
লিলি শিশুদের ন্যায় পথ-ঘাট জিজ্ঞেস করতে শুরু করে। গাড়োয়ান মাটিতে রেখা টেনে নকশা এঁকে তাকে রাস্তা বোঝতে শুরু করে।
এখান থেকে দামেশক যাওয়ারও তত পথ আছে, না? লিলি জিজ্ঞেস করে।
