নাসেরা নামক এক স্থানে খৃস্টান সম্রাটগণ সমবেত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গাই অফ লুজিনান, রেমন্ড অফ ত্রিপোলী, গ্র্যান্ড মাস্টার জেরাড, মাউন্ট ফেরাত, হামফ্রে অফ তুরান, এমারিক এবং প্রিন্স অর্নাত অফ কার্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কনফারেন্সে আক্রার পাদ্রী বড় ক্রুশের মোহাফেজও উপস্থিত আছেন। হলঘরটা কাপড়ের তৈরি একটি সুদৃশ্য প্রাসাদ। প্রাসাদের ন্যায় তার কক্ষ, বারান্দা, গলি। রং-বেরঙের বাতির আলো বিদ্যমান। সব মিলে হলটা মর্মর নির্মিত প্রাসাদের চেয়েও বেশি সুদৃশ্য ও মনোরম। তারই আশপাশে মেহমানদের থাকার জায়গা, নাইট ও সৈন্যদের তাঁবু। মদের মটকার সঙ্গে আছে সেসব রূপসী মেয়ে, যাদের যাদুকরী রূপ ভাইকে ভাইয়ের এবং পিতাকে পুত্রের শত্রুতে পরিণত করে থাকে।
পাকা প্রাসাদের কক্ষের ন্যায় এক শামিয়ানার নীচে বড় ক্রুশটা রাখা আছে। তার সামনে তার সম্রাটগণ, তাদের সেনাপতি ও নির্বাচিত নাইটগণ উপবিষ্ট। সকলেই জানেন, এটি একটি ঐতিহাসিক সমাবেশ এবং ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। এই অধ্যায়ের শিরোনাম হচ্ছে সালাহুদ্দীন আইউবীকে চিরতরে খতম করে দাও।
ক্রুশের মোহাফেজগণ!- আক্রার পাদ্রী বললেন- এ হচ্ছে সেই ক্রুশ, যার গায়ে হাত রেখে তোমরা সকলে শপথ নিয়েছিলে। আজ এই ক্রুশ তোমাদের সম্মুখে এ কারণে আক্রা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে, যাতে তার সঙ্গে তোমরা যে অঙ্গীকার করেছিলে, তা যেনো তাজা হয়ে যায়। আজ তোমাদেরকে এক রক্তক্ষয়ী ও সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এই যুদ্ধ তোমাদেরকে লড়তেই হবে। তোমরা সকলে যোদ্ধা, সেনাপতি। তোমাদের জীবন যুদ্ধের ময়দানে অতিবাহিত হয়েছে। আমি সেই ময়দানের লোক নই। আমি তোমাদের ধর্মের নেতা। আমি তোমাদেরকে বলতে এসেছি, সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করে আরব বিশ্বে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। জেরুজালেম আমাদের আছে এবং থাকবে। আমাদেরকে মক্কা-মদীনাও দখল করতে হবে এবং এই পবিত্র কুশকে মুসলমানদের কাবা ঘরে স্থাপন করতে হবে। তাকে ঈসা মসীহর উপাসনালয় বানাতে হবে।
মনে রেখো, তোমরা মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে পৌঁছে গিয়েছিলে। কিন্তু মুসলমানরা তোমাদেরকে আর এগুতে দেয়নি। মুসলমানরা তাদের পবিত্র ভূমির সুরক্ষার জন্য যে উন্মাদনার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলো, তোমাদেরকেও সেই উন্মাদনার সঙ্গে লড়াই করতে হবে। সালাহুদ্দীন আইউবীর দৃষ্টি জেরুজালেমের উপর নিবন্ধ হয়ে আছে। সে বলছে, এটা বাইতুল মুকাদ্দাস। এটা নাকি তাদের প্রথম কেবলা। তোমরা যদি তার থেকে জেরুজালেমকে রক্ষা করতে চাও, তাহলে মক্কার উপর দৃষ্টি রাখো। মনে এ কথাটা জাগরুক রাখো, আমাদের যুদ্ধ সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে নয়- এটা ক্রুশ ও ইসলামের লড়াই। এটা দুটি ধর্মের, দুটি বিশ্বাসের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে আমরা যদি জয়ী হতে না পারি, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম লড়াই করবে। তারাও যদি ইসলামের বিনাশ ঘটাতে না পারে, তাহলে তাদের পরের প্রজন্ম যুদ্ধ করবে। দুটি ধর্মের একটির পতন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকবে। তবে পতন ইসলামেরই হবে এবং সমগ্র পৃথিবীতে ক্রুশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
আমরা মুসলমানদের পরাজয় ঘটানোর জন্য অন্য পন্থা অবলম্বন করে রেখেছি। কিন্তু, সেটি এখনো সফল হয়নি। তোমাদের সকলেরই জানা থাকবে, সেই অভিযানে আমরা কী পরিমাণ মেয়ে নষ্ট করেছি। বিপুল সম্পদ এবং অস্ত্রও হারিয়েছি। এসব সম্পদ ও অস্ত্র আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে মুসলিম আমীরদের পেছনে ব্যয় করেছি। সেসব মেয়ে ও হীরা-জহরতের বিনিময়ে আমরা এটুকু অর্জন করেছি যে, মুসলমানদের মাঝে মদ ও বিলাসিতার স্বভাব গড়ে ওঠেছে। তারই বদৌলতে আমরা তাদেরকে ছয়-সাত বছর যাবত আপসে যুদ্ধ করিয়ে চলছি। তাদের গৃহযুদ্ধ থেকে আমরা এটুকু লাভবান অবশ্যই হয়েছি যে, মুসলমানদের সামরিক শক্তি বহুলাংশে নষ্ট হয়ে গেছে এবং আইউবীর বহু অভিজ্ঞ ও ভালো ভালো সৈনিক ও কমান্ডার মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। এই গৃহযুদ্ধ থেকে আমরা এ স্বার্থও উদ্ধার করেছি যে, সাত-আট বছর যাবত আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে নিজ অঞ্চল থেকে বের হতে দেইনি। এই সময়টায় আমরা যুদ্ধ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি এবং জেরুজালেমের প্রতিরক্ষা এতো শক্ত করে তুলেছি যে, সালাহুদ্দীন আইউবীর পক্ষে জেরুজালেমের পথে পা রাখাই অসম্ভব হয়ে গেছে।
কিন্তু গৃহযুদ্ধের আগে আইউবীর যে অবস্থাটা ছিলো, এখন সেই অবস্থা পুনরায় অর্জন করে নিয়েছে। সে হাল্ব এবং মসুলের সৈন্যদেরও পেয়ে গেছে। সকল মুসলিম আমীর তার সমর্থক হয়ে গেছে। মুজাফফর উদ্দীন ও কাকবুরীর ন্যায় সালার- যারা তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলো এবং আমাদের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো তার নিকট চলে গেছে। সে গাদ্দারদেরকে এমন দুর্বল ও অসহায় করে তুলেছে যে, এখন আর তারা আমাদের কোন কাজে আসছে না, এখন এমন কোন মুসলিম শাসক অবশিষ্ট নেই, যে সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর পেছন থেকে হামলা করবে। আমরা হাশিশিদেরকেও পরীক্ষা করে দেখেছি। চার-পাঁচটি সংহারী আক্রমণেও তারা আইউবীকে হত্যা করতে পারেনি। এখন আমাদের এ ছাড়া আর কোন গতি আর কোনো পথ নেই যে, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আইউবীর উপর আক্রমণ চালাবো। কিন্তু আমাদের সেনাপতিরা পরামর্শ দিয়েছে, আক্রমণটা তাকে যেনো আগে করতে দেই। তারা আমাকে এর দুটি কারণ বলেছে। এক হচ্ছে, তার বাহিনীকে এতো দূরে নিয়ে যাওয়া দরকার, যেখানে রসদের পদ রুদ্ধ এবং বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় কারণ, সালাহুদ্দীন আইউবী যে ধারায় যুদ্ধ করে, তাতে আমরা আমাদের সৈন্যদেরকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়ে পড়ি। এখন যেহেতু দুশমনের অঞ্চলে আমাদের কোনো সহযোগি রইলো না, তখন আক্রমণের ঝুঁকি আমাদেরকে বুঝে-শুনে নিতে হবে।
