আজ চার বছর পর সুলতান আইউবী যখন খৃস্টানদের বিরুদ্ধে সেনাভিযানের জন্য সালারদের দিক-নির্দেশনা প্রদান করছেন, তখন তাদের উক্ত ঘটনাটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন- ঐ হতভাগ্য কাফেরটা থেকে আমাকে নিজ হাতে প্রতিশোধ নিতে হবে। আল্লাহ আমাকে আমার রাসূলের অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার সাহস ও সুযোগ দান করুন। তিনি সালারদেরকে আরো দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে বললেন- আমি আশা, করছি, আমরা তিন মাস পর সেই মওসুমে হিত্তিনের অঞ্চলে গিয়ে উপনীত হবো, যখন সূর্যের কিরণ পানির ফোঁটাকে বালিকণায় পরিণত করে দেয় এবং যখন বালির সেই জ্বলন্ত কণাগুলো মানুষকে সিদ্ধ করে ফেলে এবং বালুকাময় প্রান্তরে মরিচিকা আর আকাশে উড়ন্ত বালুকণা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আমি ক্রুসেডারদেরকে সেই সময় যুদ্ধ করতে বাধ্য করবো, যখন সূর্যটা মাথার উপর থাকবে। ক্রুসেডাররা লোহার বর্ম ও শিরস্ত্রাণে ঝলসে যাবে। তারা আমাদের তীর-তরবারী-বর্শার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে লোহার পোশাকটা পরিধান করে থাকে, তা প্রত্যেক ক্রুসেডারের জন্য জাহান্নামে পরিণত হয়ে যাবে। • ••
যুদ্ধের জন্য সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী জুন-জুলাই মাসকে নির্বাচন করেছেন। ইতিহাসবিদ এবং ইউরোপীয় যুদ্ধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকগণ সুলতান আইউবীর এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। এই সময়টায় মরুভূমি চুল্লি থেকে বের করা লোহার ন্যায় গরম থাকে। ক্রুসেডার সৈন্যরা লোহার পোশাকের নীচে সংরক্ষিত থাকে। তাদের নাইটরা মাথা থেকে পা পর্যন্ত বর্মপরিহিত থাকে। তীর-তরবারী তাদের উপর কোন ক্রিয়া করতে পারে না। কিন্তু সুলতান আইউবী তাদের এই নিরাপত্তা পোশাকটাকে তাদের বিরাট এক দুর্বলতায় পরিণত করে দেন। একে তো তিনি গেরিলা ধরনের যুদ্ধ করতেন। স্বল্পসংখ্যক সৈন্য দ্বারা দুশমনের পার্শ্বের উপর বিদ্যুতিতে আক্রমণ চালাতেন। তারা কাজ সেরে চোখের পলকে উধাও হয়ে যেতো। তার এই কৌশলের কারণে দুশমনকে ছড়িয়ে যেতে হতো এবং চলার গতিবেগ বাড়িয়ে দিতে হতো। কিন্তু এ বর্ম-শিরস্ত্রাণের কারণে তারা প্রয়োজন অনুপাতে দ্রুত দৌড়াতে পারতো না। বিপরীতে সুলতান আইউবীর সৈন্যদের এ সমস্যাটা ছিলো না।
সুলতান আইউবী আরেকটি কৌশল এই অবলম্বন করেছিলেন যে, তিনি যুদ্ধ তখন শুরু করবেন, যখন সূর্য মাথার উপর থাকবে এবং মরুভূমি স্ফুলিঙ্গে পরিণত হবে। এ সময়টায় বর্ম চুলার ন্যায় উত্তপ্ত হয়ে যায়। পিপাসায় দেহ শুকিয়ে যায়। অথচ পানি থাকবে সুলতান আইউবীর দখলে। মরুভূমির ঝলসানো উত্তাপ ইসলামী বাহিনীর জন্যও সমস্যা সৃষ্টি করতো। কিন্তু তাদের পোশাক হতো হাল্কা-পাতলা। তাছাড়া সুলতান আইউবীর প্রশিক্ষণ ছিলো অত্যন্ত কঠিন। তিনি উট-ঘোড়া এবং সমস্ত বাহিনেিক দীর্ঘ সময়ের জন্য মরুভূমিতে রেখে দিতেন এবং নিজেও তাদের সঙ্গে অবস্থান করতেন। তিনি তার ফৌজকে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকারও প্রশিক্ষণ দিয়ে রেখেছেন। তিনি রমযান মাসে প্রশিক্ষণ ও মহড়া বেশি কাতেন এবং বলতেন- এই পবিত্র মাসে মহান আল্লাহ আপন হাতে আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।
দৈহিক প্রশিক্ষণ ছাড়াও তিনি সৈনিকদের মানসিক বরং আত্মিক প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। তিনি সৈনিকদেরকে বুঝ প্রদান করতেন, তোমরা আল্লাহর সৈনিক এবং ইসলামের সংরক্ষক। তোমরা কোনো রাজা কিংবা সুলতানের কর্মচারি নও। তিনি গনীমতের সম্পদ সৈনিকদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন। কিন্তু বুঝ দিতেন, যুদ্ধ গনীমতের জন্য লড়া হয় না এবং গনীমত জিহাদের পুরস্কারও নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা ছিলো আত্মমর্যাদাবোধ, যা তিনি সমগ্র বাহিনীর মধ্যে সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। যেসব মুসলিম মেয়েকে খৃস্টানরা তুলে নিয়ে যেতো, সুলতান আইউবী তাদের কথা বেশি বেশি স্মরণ করতেন এবং সেই মুসলিম নারীদেরও, যারা খৃস্টান অধিকৃত অঞ্চলে তাদের হিংস্রতার শিকার হয়ে জীবন অতিবাহিত করছিলো।
যে জাতি জাতির শহীদ ও মজলুম কন্যাদেরকে ভুলে যায়, সে জাতির ভাগ্যে কাফেরদের গোলামি লিপিবদ্ধ হয়ে যায়- কথাটা সুলতান আইউবী সব সময় মুখে আওড়াতেন। তিনি সৈনিকদের মাঝে ঘোরাফেরা করতেন, তাদের গল্প-গুজব ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করতেন। তাদেরকে বলতেন প্রতিশোধ সৈন্যরাই নিয়ে থাকে। ফৌজ যদি দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে তাদের জন্য এ জগতেও অপমান, পরজগতেও অপমান।
***
বড় ক্রুশটা সম্মুখে রাখা। পার্শ্বে দণ্ডায়মান ক্রুশের মোহাফেজ, যিনি আক্রার পাদ্রী। খৃষ্টানদের বিশ্বাস মোতাবেক এটি সেই আসল ক্রুশ, যার উপর হযরত ঈসাকে (আ.) শূলি দেয়া হয়েছিলো। তারা মনে করে, এ কুশটার গায়ে এখনো হযরত ঈসা (আ.)-এর রক্তের দাগ বিদ্যমান। একে বড় কুশ বলা হয়। এ কারণেই আক্রার পাদ্রীকে বড় ক্রুশের মোহাফেজ বলা হয়ে থাকে এবং তার আদেশ-নিষেধ সম্রাটদের আদেশ-নিষেধ অপেক্ষা বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। খৃস্টান সম্রাটগণও তার আদেশ-নিষেধ মান্য করে থাকেন। খৃস্টান ও ইহুদী মেয়েদেরকে তারই অনুমতিক্রমে মুসলমানদের অঞ্চলে গুপ্তচরবৃত্তি, চরিত্র হনন ইত্যাদি কাজের জন্য প্রেরণ করা হতো। যে মেয়ে এ কাজের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে দায়িত্ব পালনে রওনা হতো, তাকে ক্রুশের মহান মোহাফেজ দুআ দিয়ে বিদায় জানাতেন। সেই মেয়েদের থেকে বড় ক্রুশের উপর হাত রাখিয়ে অফাদারি এবং ক্রুশকে ধোকা না দেয়ার প্রতিজ্ঞা নেয়া হতো। এরূপ প্রতিজ্ঞা খৃস্টান ফৌজের প্রতিজন অফিসার ও সৈনিকের থেকেও নেয়া হতো। শেষে এমনি ছোট্ট একটি ক্রুশ তাদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হতো।
