আমি আপনাদেরকে এ কথাটাই বলার জন্য তলব করেছি- সুলতান আইউবী বললেন- আমি অগ্রযাত্রা ও যুদ্ধের পরিকল্পনা আপনাদের পরামর্শেই প্রস্তুত করেছি। আর আমি কয়েক রাত ভাবনা-চিন্তার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, আমাদের প্রথম মনজিল হবে হিত্তিন। আপনারা সকলে হিত্তিনের সামরিক গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত আছেন। সেখানে সেই ভূখণ্ড পেয়ে যাবো, যেই ভূখণ্ডে আমি ক্রুসেডারদের লড়াই চাই। যুদ্ধে; আপনাদের উত্তম বন্ধু সেই ভূখণ্ড, আপনারা যেখানে দুশমনকে টেনে এনে যুদ্ধ করিয়ে থাকেন। এ কথা আমি আপনাদের আগেও বহুবার বলেছি। কথাটা আপনারা হৃদয়ে অংকন করে নিন। যুদ্ধের জন্য এমন অঙ্গন বেছে নিন, যা আপনাদেরকে উপকার দেবে এবং শত্রুর ক্ষতি করবে। এ অঙ্গন আমরা হিত্তিনের অঞ্চলে পেয়ে যাবো। শর্ত হলো, আমাদেরকে গোপনীয়তা বজায় রেখে দ্রুত গতিতে আগে-ভাগে সেখানে পৌঁছে যেতে হবে এবং দুমশনকে সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে ফেলতে হবে।
হিত্তিনের অঞ্চলে উঁচু ভূমি আছে, পানিও আছে। আপনারা যদি উঁচু পাহাড় এবং পানির উৎসগুলো দখল করে নিতে পারেন, তাহলে ভাবতে পারেন আপনারা অর্ধেক যুদ্ধ জিতে গেছেন। তবে দুশমনকে সেখানে টেনে নেয়া সহজ হবে না। আমাদের পরিকল্পনার একটি অংশও যদি অবাস্তবায়িত থাকে, তাহলে গোটা পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যাবে এবং ধ্বংস আমাদেরকে যে পর্যন্ত নিয়ে যাবে, সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা অসম্ভব হবে। আমার ইচ্ছা, এ মাসের মাঝামাঝি নাগাদ আমরা দামেশক থেকে রওনা হবো। আমি হাল্ব ও মিসরে দূত পাঠিয়ে দিয়েছি। তারা দ্রুততার সঙ্গে যথাসম্ভব কম বিরতি দিয়ে পৌঁছে ফৌজ প্রেরণ করবে, যাদের সঙ্গে আমাদের পথে দেখা মিলবে। আমাদের সকল সৈন্যকে একস্থানে সমবেত করতে হবে। বাইরে থেকে আসা এবং এখানকার সৈন্যদের একত্রিত করে এবং তাদের সালারদেরকে পরিপূর্ণ পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিয়ে বণ্টন করতে হবে। আমাদের অগ্রযাত্রা বিভিন্ন অংশের অগ্রযাত্রা হবে। প্রতিটি অংশের পথ আলাদা হবে।
আমি যথারীতি গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যবস্থা করে রেখেছি। আপনাদের ব্যতীত অন্য কারো কোনো কমান্ডার বা সৈনিকের জানবার প্রয়োজন নেই, আমরা কোথায় যাচ্ছি। দুশমনের অঞ্চলে আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছে। তারা দুশমনের খুঁটিনাটি সকল গতিবিধি ও সিদ্ধান্তের সংবাদ আমাদের পৌঁছিয়ে দিচ্ছে। এখন আবশ্যক হলো, আমাদের অঞ্চলে শত্রুর যেসব গোয়েন্দা আছে, তাদেরকে অন্ধ, বধির ও বিভ্রান্ত বানিয়ে ফেলতে হবে। হাসান ইবনে আবদুল্লাহ তারও ব্যবস্থা করে রেখেছে। আমি আপনাদেরকে আরো একটি বিষয় বলে দিতে চাই। তা হচ্ছে, ফৌজের একটি অংশ আমার সঙ্গে থাকবে। আমি তাদের কার্ক নিয়ে যাবো।
সুলতান আইউবী হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যান। তার মাথাটা নুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর মাথাটা ঝটকা দিয়ে উপরে তুলে বললেন- চার বছর কেটে গেছে আমি একটি কসম খেয়েছিলাম, আমাকে সেই কসম পূরণ করতে হবে।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সেই কসম ছিলো এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তিনি কনফারেন্সে চার বছর আগের সেই ঘটনাটি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন। আপনারা পড়ে এসেছেন, খৃস্টান শাসকগণ এমনই চরিত্রহীন মানুষ ছিলেন যে, তারা মুসলমানদের কাফেলা লুণ্ঠন করতেন। তারা কাজটা সৈন্যদের দ্বারা করাতেন। হজ্ব যাত্রীদের কাফেলা হেজাজ যাওয়া এবং আসার সময় তারা পথে পথে ওঁৎ পেতে বসে থাকতো। এক খৃস্টান ম্রাট প্রিন্স অর্নাত- যিনি সে সময় কার্কের শাসক ছিলেন। নিজ আদেশে এবং নিজের বিশেষ বাহিনী দ্বারা এ কাজ করাতেন। এই অপকর্মের জন্য তিনি গর্ব করে বেড়াতেন। কোন হজ্ব কাফেলা লুণ্ঠন করাতে পারলে তিনি এমনভাবে উল্লাস প্রকাশ করতেন, যেনো বড় ধরনের বিজয় করে ফেলেছেন। শুধু মুসলমান ঐতিহাসিকগণই নন- ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিকগণও তার এই দস্যুবৃত্তির কাহিনী বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।
১১৮৩ অথবা ১১৮৪ সালের ঘটনা। অর্নাতের বাহিনী হেজাজ থেকে মিসরগামী একটি হজ্ব কাফেলার উপর আক্রমণ চালায় এবং কাফেলা লুণ্ঠন করে। মিসরী কাহিনীকার মুহাম্মদ ফরিদ আবু হাদীদ লিখেছেন, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর এক কন্যাও উক্ত কাফেলায় ছিলো। তবে আর কোন ঐতিহাসিক উক্ত কাফেলার সুলতান আইউবীর কন্যা থাকার কথা উল্লেখ করেননি। একজন ঐতিহাসিক শুধু এটুকু লিখেছেন যে, সুলতান আইউবী যখন অর্নাতের বাহিনীর হজ্ব কাফেলা লুণ্ঠনের এবং কয়েকটি মেয়ের অপহরনের সংবাদ পান, তখন তিনি গর্জে ওঠে বলেছিলেন- ওরা আমার কন্যা। আমি এর প্রতিশোধ নেবো।
কাফেলায় কয়েকটি যুবতী মেয়ে ছিলো। খৃস্টানরা তাদেরকে তুলে নিয়ে যায়। তখনই সুলতান আইউবী কসম খেয়েছিলেন- অর্নাতকে আজ থেকে আমি আমার ব্যক্তিগত শত্রু মনে করছি। আমি কসম খাচ্ছি, তার থেকে আমি নিজ হাতে এর প্রতিশোধ নেবো।
সকলে জানেন, তাদের সুলতান এই ধারায় এবং এই ভঙ্গিতে কখনো। কথা বলেননি। তিনি উত্তেজিত হয়ে কথা বলা এবং আবেগ পছন্দ করেন না। তাঁর প্রতিটি উক্তি সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে। আজ যখন তিনি প্রতিশোধের কসম খেলেন, সকলে বুঝে ফেললেন, এটা সুলতানের প্রত্যয় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এমনিতে প্রত্যেক খৃস্টান সম্রাটই ইসলামের দুশমন। কিন্তু অর্নাতের অতিরিক্ত একটি অপরাধ হলো, তিনি ইসলাম ও রাসূলে পাক (সা.) সম্পর্কে অপমানজনক উক্তি করে থাকেন। মুসলিম বন্দিদের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে রাসূলে আকরামকে (সা.) গালাগাল করেন এবং বলেন ডাকো তোদের কাবার প্রভূকে, এসে তোদের সাহায্য করুক। পাঠ করো তোদের রাসূলের কালেমা, তোমরা মুক্ত হয়ে যাও। তারপর তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন। তার এই চরিত্র সম্পর্কে সুলতান আইউবী অবহিত ছিলেন। তাই যখনই তিনি অর্নাতের নামোচ্চারণ করতেন, তার প্রতি মন ভরে ঘৃণা প্রকাশ করতেন।
