আক্রমণের ষষ্ঠ দিন। সুলতান আইউবী জয়ের আনন্দে উফুল্ল। এমন সময় সংবাদ আসে, স্বীয় ভাই তাজুল মুলক- যিনি এই যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন- শাহাদাতবরণ করেছেন। সুলতানের আনন্দ বেদনায় পরিণত হয়ে যায়। তাজুল মুলুকের জানাযায় ইমাদুদ্দীনও অংশগ্রহণ করেন। তারপর তিনি হাব থেকে বেরিয়ে যান। সুলতান আইউবী হালবের শাসন ক্ষমতা বুঝে নেন। বাহাউদ্দীন শাদ্দাদের ভাষ্যমতে, যেসব সৈন্য দীর্ঘদিন যাবত লাগাতার যুদ্ধ করে আসছিলো, সুলতান তাদেরকে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। নিজে হাবের প্রশাসনিক কার্যক্রম গোছানোর কাজে আত্মনিয়োগ করেন। গন্তব্য তার বাইতুল মুকাদ্দাস।
৮.৩ হিত্তীন
হিত্তীন
৫৩৮ হিজরীর মহররম মাস। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী দামেশকে অবস্থান করছেন। আজ তার চেহারাটা উজ্জ্বল। চোখে আনন্দের ঝিলিক বিরাজ করছে। তার চেহারার এই ঔজ্জ্বল্য আর চোখের এই ঝিলিক তার হাইকমান্ডের সালার ও ঘনিষ্ঠজনরা ভালোভাবে জানেন। তিনি যখন কোনো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন তার চোখে-মুখে এই ভাবটা ফুটে ওঠে। যেসব মুসলিম আমীর, শাসক ও দুর্গপতি ক্রুসেডারদের বন্ধু হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, সুলতান তাদের প্রত্যেককে নিজের অনুগত ও পক্ষভুক্ত করে নিয়ে ফেলেছেন। তাদের মধ্যে সবচে গুরুত্বপূর্ণ হলেন হাব ও মসুলের গবর্নর ইযযুদ্দীন ও ইমাদুদ্দীন। তারা কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে সুলতান আইউবীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন। তাদের বাহিনী এখন আইউবীর যৌথ বাহিনীর অধীন।
সুলতান আইউবী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ফিলিস্তীন অভিমুখে যাত্রা করার আগে তিনি ঈমান বিক্রেতা মুসলিম আমীর-শাসকদের পদানত করবেন, যাতে তারা তার ও প্রথম কেবলার মাঝে প্রতিবন্ধক হতে না পারে। এই প্রতিজ্ঞা পালন করে এখন তিনি দামেশকে অবস্থান করছেন। তিনি তরবারীর জোরে গাদ্দারদের সোজা পথে এনে বলেননি আমি বিজয়ী। বরং তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, ইসলামের ইতিহাসের এই অধ্যায়টি খুবই লজ্জাজনক বিবেচিত হবে, যাতে বর্ণনা করা হবে সালাহুদ্দীনের শাসনামল কালো যুগ ছিলো। সে যুগে ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করেছিলো আর মুসলমানরা আপসে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো। অবশ্য সুলতান বলতেন, গাদ্দারদেরকে পক্ষভুক্ত করে আমি ক্রুসেডারদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছি।
আজ যখন তিনি দামেশকে তার হাইকমান্ডের সালার-উপদেষ্টা এবং অসামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে তলব করেন, তখন সকলে তার চেহারায় বিশেষ এক দীপ্তি ও চোখে সেই ঝিলিক দেখতে পান, যা মাঝে-মধ্যে দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। সকলে বুঝে ফেলে, সুলতান তার গন্তব্য অভিমুখে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেছেন। আর সকলের জানা, সুলতানের গন্তব্য বাইতুল মুকাদ্দাস। এখন তাদেরকে তার মুখ থেকে শুনতে হবে, কবে কোন্ সময় যাত্রা শুরু হবে, বিন্যাস কীরূপ হবে এবং পথ কোন্টা হবে।
আমার বন্ধুগণ!- সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ভাষণ শুরু করেন আপনারা প্রত্যেকে নিশ্চয়ই এ কথা বলে আমাকে সমর্থন যোগাবেন যে, আমরা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা করতে প্রস্তুত আছি। আজ আমি আপনাদের উদ্দেশে যে বক্তব্য দান করবো, সন্দেহ নিরসনের লক্ষ্যে। আপনারা আমাকে যেসব প্রশ্ন করবেন, আপত্তি উত্থাপন করবেন, সব আমাদের ইতিহাস হয়ে থাকবে। আমাদের শব্দ-ভাষা, আমাদের অঙ্গীকার ইতিহাসের লিপিতে পরিণত হবে। এই লিপি আমাদের সর্বশেষ প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আমরা জগতে এই ইতিহাসের লেখা রেখে যাবো আর মহান আল্লাহর সমীপে নিজেদের আমল নিয়ে উপস্থিত হবো। আমরা আমাদের অনাগত প্রজন্ম এবং মহান আল্লাহর সমীপে লজ্জিত হবো, নাকি সম্মানিত সে সিদ্ধান্ত আমাদেরকেই নিতে হবে। বিজয়ের গ্যারান্টি আমরা কেউ দিতে পারবো না। তবে আমরা প্রত্যেকে এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতে পারি যে, আমরা লড়াই করবো, জীবন দেবো- ফিরে আসবো না।
সুলতান আইউবী সকলের প্রতি তাকান। তার ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে ওঠেছে। তিনি বললেন- আমি আপনাদেরকে আত্মপ্রবঞ্চনায় লিপ্ত করবো না। আপনাদের কারো কারো মনে ভয় থাকতে পারে, আমাদের সৈন্য সংখ্যা ক্রুসেডারদের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া আমরা নিজ ভূমি থেকে বহু দূরে যুদ্ধে যাচ্ছি। আমি আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা সব সময় অল্প কম নয়- অনেক কম সৈন্য দ্বারা কয়েকগুণ বেশি দুশমনের সঙ্গে লড়াই করেছি ও বিজয় অর্জন করেছি। যুদ্ধ সংখ্যা দ্বারা নয়- চেতনা ও বুদ্ধি দ্বারা লড়া হয়। ঈমান শক্ত হলে বাহু, তরবারী এবং মনও শক্ত হয়ে যায়। আমাদের কাছে ঈমানের কমতি নেই। বুদ্ধির অভাব নেই। আপনারা ঈমান অটুট রাখুন। শক্তিকে ব্যবহার করুন।
আমাদের একজনও নিজেদের ও দুশমনের সামরিক শক্তির তুলনা করছি না- কমান্ডো বাহিনীর সালার সারেম মিসরী দাঁড়িয়ে বললেন। তিনি সঙ্গীদের উপর দৃষ্টি বুলান। এক এক করে সকলের প্রতি তাকান। প্রত্যেকে তাকে সমর্থন জ্ঞাপন করেন। তিনি বললেন- তবে দেখা আবশ্যক, আমরা বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত কোন দিক থেকে এবং কোন্ ধারায় পৌঁছবো। সাবধানতা অবশ্যম্ভাবী। আত্মম্ভরিকতা পরিহার করে আমাদেরকে বাস্তবতাকে স্বীকার করে কাজ করতে হবে।
