আলী বিন সুফিয়ানকে যদি হত্যা করা যায়, তাহলে আইউবী এমনিতেই অন্ধ ও বধির হয়ে যাবে। বললো আরেকজন।
আমি সেই চোখগুলোকে হাত করে ফেলেছি, যারা সুলতান আইউবীর বুকের প্রতিটি গোপন রহস্য স্পষ্ট দেখতে পায়। বলে বৃদ্ধ তার সঙ্গে আসা মেয়েটির পিঠে হাত রেখে বললো–এই সেই চোখ। দেখে নাও, এই চোখ দুটোতে কেমন যাদু! তোমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর পদস্থ এক কর্মকর্তা খাদেমুদ্দীন আল-বারকের নাম অবশ্যই শুনেছো। কেউ হয়তো তাকে দেখেছেনও। সালাহুদ্দীন আইউবীর একান্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি দুজন। আলী ও আল-বারূক। আলী বিন সুফিয়ানকে হত্যা করা বোকামী হবে। আমি আল-বারককে যেভাবে কজা করেছি, আলীকেও সেভাবে হাত করতে হবে।
কী বললেন, আল-বার্ক আপনার কজায় এসে গেছে? উদ্দীপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে একজন।
হ্যাঁ–মেয়েটির রেশমী চুলে আঙ্গুল বুলিয়ে বৃদ্ধ বললো–আমি তাকে এই শিকলে আটক করেছি। আজ বিশেষ করে এ সুসংবাদটি শুনানোর জন্যই আপনাদের এখানে তলব করেছি। আমাদের দ্রুত এ বৈঠক মুলতবী করতে হবে। কারণ, এভাবে একত্রে এক স্থানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা ঠিক নয়। এ মেয়েটিকে বোধ হয় আপনারা সকলেই চিনবেন। এ যে এতো বিচক্ষণতার সাথে নাটক মঞ্চস্থ করতে পারবে, আমি তা কল্পনাও করিনি। বয়সে কচি হলে কি হবে, মেয়েটা কাজে বড় পাকা। গত একটি বছর আমি এমন একটি সুযোগের সন্ধান। করে ফিরছিলাম, যাতে আলী ও আল-বার্ককে অন্তত একজনকে ফাঁদে ফেলতে পারি। তাদের সঙ্গে আমরা কখনো সাক্ষাৎ করিনি। তার কারণ, আমি তাদের কাছে পরিচিত হতে চাইনি। সুলতান আইউবী সামরিক কর্মকর্তাদের শহর থেকে দূরে রাখেন। অবশেষে তিনি সামরিক মহড়া ও মেলার ঘোষণা দেন। আমি জানতে পারলাম, তিনি সেনা কমাণ্ডার ও সালারদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন মেলায় এসে তারা আম-জনতার সঙ্গে বসে, তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং ভীতি ছড়ানোর পরিবর্তে জনমনে আস্থা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। আমি তন্ন তন্ন করে
জেও আলী বিন সুফিয়ানকে কোথাও পেলাম না। এই মেয়েটিকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। খুঁজে পেলাম আল-বার্ককে। তার এক পাশে দুটি শূন্য চেয়ার পেলাম। কাছেরটিতে মেয়েটিকে বসিয়ে অপরটিতে আমি বসে পড়লাম। একে আট মাস ধরে আমি ওস্তাদী কায়দা শিখিয়ে আসছি। আমাকে নিজের বৃদ্ধ স্বামী এবং নিজেকে খরিদকৃত মজলুম নারী পরিচয় দিয়ে আল-বার্কের ন্যায় ঈমানদার লোকটাকে নিজের রূপের ফাঁদে বন্দি করে মেয়েটি। অন্যত্র সাক্ষাতের সময় ও স্থান ঠিক করে নেয় দুজনে। পতিত জীর্ণ ভবনটিতে নিয়ে এসে তার সঙ্গে কি ড্রামা খেলতে হবে, তা শিখিয়ে দিলাম। মেয়েটি যথাসময়ে ভবনটিতে চলে যায়। আল-বার্কও চলে আসে। চারজন লোক নিয়ে আমি পূর্ব থেকেই সেখানে লুকিয়ে ছিলাম। সেই চারজনের দুজন এখানে উপস্থিত আছে। আপনারা সকলে হয়তো তাদেরকে চিনেন না। তারা আমাদের দলের লোক। মেয়েটি আল-বার্কের কাছে প্রমাণ করে যে, তার খাতিরে সে নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত। আমাদের চার সঙ্গী আর-বারূক ও মেয়েটির উপর তরবারী দ্বারা আক্রমণ করে বসে।মেয়েটি বর্শা দ্বারা আক্রমণের মোকাবেলা করে । নাটকটিকে এমন সুনিপুণভাবে মঞ্চস্থ করা হলো যে, আল-বারূকের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ জাগলো না। অভাগার মাথায় এ বুঝটুকুও আসলো না যে, তরবারী ও শার এমন ঘোরতর লড়াই হলো, অথচ একটা লোকের গায়েও সামান্য আঁচড় লাগলো না; এমনকি তার নিজের গায়েও একটি খোঁচা লাগলো না। আমি এই বলে নাটকটির ইতি টানলাম যে, মেয়েটি এত দুঃসাহসী আমি আগে জানতাম না। এমন সাহসী মেয়ে কোন বীর পুরুষের পাশেই মানাবে ভালো। এই বলে সন্তুষ্টচিত্তে মেয়েটিকে আল-বার্কের হাতে তুলে দিলাম। মানদীপ্ত দাস্তান এমন পরিণত বয়সের একজন অভিজ্ঞ শাসক এতো সহজে আমার ফাঁদে আটকে গেলো, আমি ভেবে বিস্মিত হই। আমি তাকে সুরায় অভ্যস্ত করে তুলেছি, যা পূর্বে কখনো সে পান করেনি। তার প্রথমা স্ত্রী আমার সঙ্গে একই ঘরে বাস করে। তার ছেলে-মেয়েও আছে। কিন্তু আমাকে পেয়ে লোকটা সবাইকে ভুলে গেছে। বললো মেয়েটি।
মেয়েটি কী কী পদ্ধতিতে সুলতান আইউবীর এমন একজন নির্ভরযোগ্য ও ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিত্বের বিবেক-বুদ্ধিকে নিজের মুঠিতে নিয়ে রেখেছে, সে সভাসদদের সামনে তার বিবরণ তুলে ধরে।
এই তিন মাসে মেয়েটি আমাকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কয়েকটি মূল্যবান তথ্য প্রদান করেছে। সুলতান আইউবী বিশাল সেনাবাহিনী গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এই বাহিনীর অর্ধেক থাকবে মিসরে। বাকি অর্ধেককে তিনি নিজের কমাণ্ডে খৃষ্টান রাজাদের বিরুদ্ধে লড়াবার জন্য নিয়ে যাবেন। দৃষ্টি তার জেরুজালেমের উপর। কিন্তু আমার মেয়েটি আল-বার্ক থেকে যে তথ্য সংগ্রহ করেছে, তাহলো, সুলতান সর্বপ্রথম নিজের মুসলিম প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আপনজনদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। কিন্তু ক্রুশের অনুসারীরা তাদের ঐক্যকে সেই পদ্ধতিতে বিনষ্ট করে দিয়েছে, যে পদ্ধতিতে আমরা আল-বার্ককে নিজেদের কজায় এনেছি। বললো বৃদ্ধ।
তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি, আল-বারক এখন আমাদের-ই লোক? জানতে চাইল একজন।
না। আল-বার্ক এখনো একনিষ্ঠভাবে-ই আইউবীর ওফাদার। পাশাপাশি ততটুকু ওফাদার আমাদের এই মেয়েটির। মেয়েটি বড় বিচক্ষণতা ও আবেগের সাথে নিজেকে এমনভাবে সুলতান আইউবী, জাতি ও ইসলামের জন্য উৎসর্গিত বলে প্রকাশ করে যে, আল-বার্ক একে স্বজাতির একটি জানবাজ কন্যা মনে, করে। এর রূপ-যৌবন ও প্রেম-ভালবাসার ক্রিয়া-ই আলাদা। আল-বার্ককে আমরা আমাদের দলে ভেড়াতে পারবো না। তার প্রয়োজন-ই বা কি। সে আমাদের হাতের পুতুল হয়েই তো কাজ করছে। জবাব দেয় বৃদ্ধ।
